বিয়েতে প্রতিযোগিতা নয়, চাই দায়িত্বশীলতা ও সহমর্মিতা
Advertisement
মুহাম্মদ ইকরামুল হক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিয়ের ক্ষেত্রে যৌতুকের দাবি বন্ধ করার পাশাপাশি অতিরিক্ত দেনমোহর, আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে প্রত্যাশা এবং সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা থেকেও আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ এসব প্রবণতা শুধু মেয়ের বিয়েতে বাধা সৃষ্টি করে না; অনেক যোগ্য, সৎ ও দায়িত্বশীল পুরুষকেও বিয়ে করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে।
একটি মেয়ের অভিভাবক যখন পাত্রের আর্থিক অবস্থা, বাড়ি-গাড়ি, জমিজমা কিংবা পারিবারিক সম্পদকে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখেন, তখন সীমিত আয়ের কিন্তু সৎ ও দায়িত্বশীল পাত্রটি উপেক্ষিত হতে পারেন।
অন্যদিকে, কোনো পুরুষের আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ দেনমোহর ও অন্যান্য প্রত্যাশা যুক্ত হলে তার পক্ষেও বিয়ে করা কঠিন হয়ে ওঠে। এভাবে উভয় পক্ষের অযৌক্তিক প্রত্যাশা পরস্পরের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। অবশ্য নারীর আর্থিক নিরাপত্তা, সম্মতি ও দেনমোহরের অধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সমস্যার সমাধান দেনমোহর বাতিল করা কিংবা নারীর অধিকার খর্ব করা নয়; বরং দেনমোহর বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ, পরিশোধের দায় আন্তরিকভাবে গ্রহণ এবং বিয়েকে অপ্রয়োজনীয় শর্তমুক্ত করা।
ইসলাম বিয়েকে একটি মর্যাদাপূর্ণ বন্ধন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নূরের ৩২ নম্বর আয়াতে অবিবাহিত নারী-পুরুষের বিয়ের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই আয়াতে অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে সচ্ছলতা দান করতে পারেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হে যুবসমাজ! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে। কারণ, তা দৃষ্টিকে অধিক সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থানের অধিক হেফাজত করে। (সহিহ আল-বুখারি, ৫০৬৬; সহিহ মুসলিম, ১৪০০)।
ইসলামে বিয়ের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মতি, অধিকার, দায়িত্ব, সদাচরণ ও পারিবারিক স্থিতিশীলতা। দেনমোহর স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার। এটি যৌতুকের বিকল্প নয়, আবার যৌতুকের নামে কনের পরিবার থেকে সম্পদ দাবি করারও কোনো বৈধতা তৈরি করে না।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নিসার ৪ নম্বর আয়াতে নারীদের সন্তুষ্টচিত্তে দেনমোহর প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশনার তাৎপর্য হলো, দেনমোহরকে নিছক আনুষ্ঠানিক অঙ্ক হিসেবে না দেখে স্ত্রীর অধিকার হিসেবে সম্মান করতে হবে।
অন্যদিকে, বিয়েকে অযৌক্তিকভাবে কঠিন করে তোলা, আর্থিক সামর্থ্যের বাইরে প্রতিশ্রুতি দেওয়া কিংবা মানুষের কাছে মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য বিপুল ব্যয়ের বোঝা চাপানো ইসলামের ন্যায়সংগত ও দায়িত্বশীল জীবনযাপনের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এখানে সামর্থ্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে বিয়ের দায়িত্ব গ্রহণের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে; কিন্তু বিয়ের জন্য বাড়ি, গাড়ি, বিপুল সম্পদ কিংবা সামাজিকভাবে নির্ধারিত কোনো উচ্চমানের জীবনযাপনকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক শর্ত করা হয়নি। একইভাবে, দেনমোহর স্ত্রীর অধিকার।
পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নিসার ৪ নম্বর আয়াতে নারীদের সন্তুষ্টচিত্তে দেনমোহর দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে। অতএব, দেনমোহর নির্ধারণ করতে হবে স্ত্রীর অধিকার ও উভয় পক্ষের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে। বড় অঙ্ক নির্ধারণ করে তা পরিশোধের আন্তরিকতা না থাকা যেমন দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়, তেমনি সামর্থ্যের অজুহাতে স্ত্রীর প্রাপ্য অধিকার অস্বীকার করাও গ্রহণযোগ্য নয়।
বিয়েতে প্রতিযোগিতা নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল সমঝোতা। আমাদের সমাজে অনেক সময় বিয়ের জন্য এমন সব শর্ত আরোপ করা হয়, যেগুলো ইসলামের মৌলিক শর্ত নয়। যেমন অবশ্যই নিজস্ব বাড়ি থাকতে হবে, নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় থাকতে হবে, বিপুল আয়োজন করতে হবে কিংবা দেনমোহর এমন অঙ্কে নির্ধারণ করতে হবে, যা বাস্তবে পরিশোধ করা কঠিন। অথচ বিয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো বৈধ দাম্পত্য সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, পারস্পরিক অধিকার রক্ষা এবং পরিবার গঠন। এজন্য প্রয়োজন উপযুক্ত জীবনসঙ্গী নির্বাচন, পারস্পরিক সম্মতি, দায়িত্বশীলতা এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা।
একজন পুরুষের বর্তমান আয় কম হলেও তিনি সৎ, পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল হতে পারেন। আবার উচ্চ আয় বা বিপুল সম্পদ থাকলেই কেউ উত্তম জীবনসঙ্গী হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। একইভাবে, মেয়ের পরিবার আর্থিকভাবে দুর্বল হলেও তার মর্যাদা বা উপযুক্ত জীবনসঙ্গী পাওয়ার অধিকার কমে যায় না। তবে বিয়েকে সহজ করার অর্থ দায়িত্বহীনভাবে বিয়ে করা নয়। সম্ভাব্য দাম্পত্য জীবনের মৌলিক ব্যয়, বাসস্থান, পারস্পরিক সম্মতি ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে বাস্তব আলোচনা থাকা প্রয়োজন।
চট্টগ্রামে বিয়ে সহজ করতে করণীয়
চট্টগ্রাম শহর ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পরিবার, মসজিদ, মাদ্রাসা, কলেজ, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় নেতৃত্ব যৌথভাবে বিয়েকে সহজ করার বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে পারে।
১. যৌতুক সম্পূর্ণ বর্জন: বিয়ের শর্ত হিসেবে নগদ অর্থ, মোটরসাইকেল, আসবাবপত্র কিংবা অন্য কোনো সম্পদ দাবি করা যাবে না।
২. দেনমোহরে দায়িত্বশীলতা: স্ত্রীর অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে পারস্পরিক আলোচনায় দেনমোহর নির্ধারণ করতে হবে এবং পরিশোধের শর্ত স্পষ্ট করতে হবে।
৩. আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী আয়োজন: সামাজিক প্রতিযোগিতা, লোকদেখানো অনুষ্ঠান কিংবা ঋণ করে বিয়ের আয়োজন থেকে বিরত থাকতে হবে।
৪. চরিত্র ও দায়িত্ববোধকে গুরুত্ব: পাত্রের সম্পদ ও আয়ের পাশাপাশি সততা, কর্মপ্রচেষ্টা, আচরণ এবং দায়িত্ব পালনের মানসিকতা বিবেচনা করতে হবে।
৫. অভিভাবকদের মানসিকতার পরিবর্তন: মেয়ের জন্য সচ্ছল পরিবার খোঁজার পাশাপাশি নিরাপদ, সম্মানজনক ও শান্তিপূর্ণ দাম্পত্য পরিবেশকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ছেলের পরিবারকেও বিয়েকে সম্পদ অর্জনের সুযোগ হিসেবে দেখা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৬. সামাজিকভাবে সহজ বিয়েকে উৎসাহিত করা: মসজিদ ও সামাজিক সংগঠনগুলো এমন উদ্যোগ নিতে পারে, যেখানে অপ্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা ও আর্থিক প্রতিযোগিতা ছাড়াই বিয়ের আয়োজন করা হবে। তবে কোনো উদ্যোগেই নারী বা পুরুষের সম্মতি ও আইনগত অধিকার উপেক্ষা করা যাবে না।
বিয়েতে বড় অনুষ্ঠান, দামি পোশাক, স্বর্ণালংকার, আলোকসজ্জা, কমিউনিটি সেন্টার, একাধিক আয়োজন ও অতিথি আপ্যায়নের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রবণতা অনেক পরিবারকে আর্থিক চাপে ফেলে। কেউ আত্মীয়স্বজনের সমালোচনার ভয়ে, কেউ প্রতিবেশীর আয়োজনের সঙ্গে পাল্লা দিতে, আবার কেউ সামাজিক অবস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় করেন। অথচ সেই অর্থ দিয়ে নতুন দম্পতির বাসস্থান, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা ভবিষ্যৎ সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল।
চট্টগ্রাম শহর কিংবা উপজেলার কোনো পরিবারের জন্যই একই ধরনের আয়োজনের ব্যয় বহন করা বাস্তবসম্মত নয়। কারও সামর্থ্য বেশি, কারও কম। সুতরাং বিয়ের আয়োজনের মাপকাঠি হওয়া উচিত পরিবারের প্রকৃত সামর্থ্য, অন্যের আয়োজন নয়। একটি বিয়েতে তিনটি নীতি অনুসরণ করা যেতে পারে।
প্রথমত, ঋণ করে লোকদেখানো আয়োজন না করা। দ্বিতীয়ত, উপহারকে সামাজিক বাধ্যবাধকতায় পরিণত না করা। তৃতীয়ত, বিয়ের খরচের পাশাপাশি দাম্পত্য জীবনের প্রাথমিক আর্থিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া।
বিয়েকে এমন কঠিন ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়ায় পরিণত করা উচিত নয়, যেখানে মেয়ের পরিবার উপযুক্ত পাত্র খুঁজে পেতে অসহায় হয়ে পড়ে, আর একজন সৎ ও দায়িত্বশীল পুরুষ কেবল আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে সংসার গড়ার সুযোগ হারান। ইসলামি শরিয়াহর মূলনীতি অনুসারে বিয়েকে সহজ করা, যৌতুক পরিহার করা, দেনমোহরের অধিকার রক্ষা করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী জীবন শুরু করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, বিয়ের সিদ্ধান্তে নারী ও পুরুষ উভয়ের স্বাধীন সম্মতি অপরিহার্য। বিয়ের মর্যাদা কাবিনের অঙ্কে নয়, পারস্পরিক দায়িত্ব পালনে; মানুষের মূল্য সম্পদে নয়, চরিত্রে; আর দাম্পত্যের সৌন্দর্য আয়োজনের জাঁকজমকে নয়, অধিকার রক্ষা ও ভালোবাসায়।
আসুন, আমরা এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে বিয়ে হবে সহজ, যৌতুক হবে পরিত্যাজ্য, দেনমোহর হবে স্ত্রীর সম্মানিত অধিকার এবং পরিবার গঠনের পথে অযৌক্তিক আর্থিক শর্তের পরিবর্তে প্রাধান্য পাবে ধর্মীয় মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্মতি ও দায়িত্বশীলতা।
লেখক: শিক্ষার্থী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
