Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

হাওড়ের ধান ক্ষেতে কৃষকের হাহাকার: এখনই পাশে দাঁড়ানো দরকার

Advertisement

Icon

মো. বায়েজিদ সরোয়ার

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০২:১৪ পিএম

হাওড়ের ধান ক্ষেতে কৃষকের হাহাকার: এখনই পাশে দাঁড়ানো দরকার

Advertisement

বাংলাদেশের বোরো ধান কাটার মৌসুম এখন প্রায় শেষের পথে। দেশের অনেক অঞ্চলে এ সময় কৃষকের মুখে থাকে প্রশান্তির হাসি। নড়াইল, চলনবিল, বরেন্দ্র অঞ্চল কিংবা রংপুরের কাউনিয়ায় ধান কাটার উৎসবের ছবি আমরা পত্রিকার পাতায় দেখেছি। কোথাও মাঠজুড়ে সোনালি ধানের শিষ, কোথাও দলবেঁধে গানে গানে ধান কাটছেন কৃষক। এ দৃশ্য বাংলাদেশের কৃষিজীবনের চিরচেনা আনন্দময় ছবি। কিন্তু একই সময়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওড় এলাকায় দেখা গেছে একেবারেই ভিন্ন এক বাস্তবতা। সেখানে কৃষকের কণ্ঠে গান নেই, মুখে হাসি নেই; আছে বোবা কান্না, দীর্ঘশ্বাস আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়।

এপ্রিলের শেষ দিকে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট ও কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওড়াঞ্চলের আধাপাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। বোরো ধান হাওড়ের কৃষকের জন্য শুধু একটি ফসল নয়; এটি বছরের প্রধান, অনেক ক্ষেত্রে একমাত্র আয়ের উৎস। তাই ধান ক্ষেত তলিয়ে যাওয়া মানে শুধু জমির ক্ষতি নয়, একটি পরিবারের সারা বছরের খাদ্য, ঋণ পরিশোধ, সন্তানদের পড়াশোনা এবং বেঁচে থাকার স্বপ্ন তলিয়ে যাওয়া।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, ১৫ মে পর্যন্ত সাতটি হাওড় জেলায় প্রায় এক হাজার ১১০ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ কৃষক। সরকারি হিসাবে প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে, যা হাওড়ের মোট জমির প্রায় ১১ শতাংশ। চালের হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দুই লাখ ১৪ হাজার টন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সুনামগঞ্জে, এরপর নেত্রকোনায়। এই ক্ষতি শুধু স্থানীয় কৃষকের নয়, জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও একটি সতর্কবার্তা। কারণ দেশের মোট বোরো উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আসে হাওড়াঞ্চল থেকে।

হাওড় বাংলাদেশের এক বিশেষ ভৌগোলিক ও জলবৈচিত্র্যময় অঞ্চল। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় ছড়িয়ে থাকা শত শত হাওড় বর্ষায় বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়, আবার শুকনো মৌসুমে সেগুলো ফসলি জমি হয়ে ওঠে। এখানে ধান ও মাছ— দুটিই জীবন ও জীবিকার প্রধান ভিত্তি। হাওড় শুধু কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; মাছ, গবাদিপশু, জীববৈচিত্র্য এবং পর্যটনের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব বাড়ছে। কিন্তু এই অঞ্চল প্রকৃতিনির্ভর হওয়ায় ঝুঁকিও অনেক বেশি। অকাল বন্যা, অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, জলাবদ্ধতা এবং নদী-খাল ভরাটের কারণে হাওড়ের কৃষক প্রতি বছরই বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকেন।

প্রশ্ন হলো— এই বিপর্যয় কি শুধুই প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার ফল? আংশিকভাবে তা সত্য হলেও পুরো সত্য নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে—এ কথা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের পরিকল্পনার ঘাটতি, পানি নিষ্কাশনের দুর্বলতা, বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম, অপরিকল্পিত রাস্তা ও অবকাঠামো নির্মাণ, নদী ও বিল ভরাট এবং স্থানীয় বাস্তবতা উপেক্ষা করাও এই সংকটকে আরও কঠিন করে তুলেছে। হাওড়ের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে সাধারণ উন্নয়ন মডেল প্রয়োগ করলে তা অনেক সময় উন্নয়নের বদলে বিপর্যয় তৈরি করে।

হাওড়ের কৃষকের সমস্যা শুধু বন্যা নয়। শ্রমিক সংকট, ধান কাটার সময় হারভেস্টরের অপ্রতুলতা, ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, মহাজনি ঋণের চাপ, উন্নতমানের বীজের ঘাটতি এবং আগাম সতর্কবার্তার দুর্বল ব্যবস্থাও তাদের ভোগান্তি বাড়ায়। পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে ঘরে তুলতে গিয়ে অনেক কৃষক শ্রমিক পাচ্ছেন না। কেউ কেউ অতিরিক্ত মজুরি দিয়েও শ্রমিক জোগাড় করতে পারছেন না। ফলে ক্ষতি আরও বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঋণ পরিশোধের চাপ। যে কৃষক সার, বীজ, শ্রম ও সেচের খরচ ঋণ করে জোগাড় করেছিলেন, তিনি এখন ফসল হারিয়ে দ্বিগুণ বিপদে পড়েছেন।

সরকার ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার কথা জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে বলেছেন, হাওড়াঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী তিন মাস সরকারিভাবে সহযোগিতা করা হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করছে। কোথাও কোথাও খাদ্যসহায়তা শুরু হয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো— ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত, স্বচ্ছ ও যথাযথ সহায়তা পৌঁছানোই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। জরুরি সহায়তার মধ্যে খাদ্য সহায়তা, নগদ অর্থ, কৃষিঋণ মওকুফ বা পুনঃতফসিল, বিনামূল্যে বীজ ও সার এবং পরবর্তী মৌসুমে পুনরায় চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা থাকতে হবে। কৃষক যেন নতুন ঋণের ফাঁদে পড়ে আরও বিপর্যস্ত না হন, সে বিষয়েও নজর দিতে হবে।

তবে শুধু সাময়িক সহায়তা দিয়ে হাওড়ের সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, গবেষণাভিত্তিক এবং হাওড়বাসীর অভিজ্ঞতানির্ভর পরিকল্পনা। হাওড়ের জন্য আলাদা কৃষিনীতি প্রণয়ন করা জরুরি। এমন ধানের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ করতে হবে, যা কম সময়ে পাকে এবং আগাম বন্যার আগেই ঘরে তোলা যায়। কৃষিযান্ত্রিকীকরণ আরও বাড়াতে হবে, বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমে পর্যাপ্ত হারভেস্টর নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি কার্যকর আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে কৃষক সম্ভাব্য বৃষ্টি, ঢল বা জলাবদ্ধতার বিষয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারেন।

হাওড়ের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় ধরনের পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। বাঁধ নির্মাণ, সংস্কার ও তদারকিতে স্থানীয় কৃষক, জনপ্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ এবং প্রশাসনের সমন্বয় থাকতে হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। নদী, খাল ও বিলের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, জলাবদ্ধতা দূর করা এবং হাওড়ের বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। হাওড়কে শুধু প্রকৌশলগত সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না; এটি একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র, যেখানে কৃষি, পানি, মাছ, মানুষ ও প্রকৃতি একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখার পেছনে কৃষক, গার্মেন্টস শ্রমিক ও প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান সবচেয়ে বেশি। অথচ এই তিন শ্রেণিই বহু ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম সম্মান ও সহায়তা পায়। কৃষক রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে আমাদের খাদ্য উৎপাদন করেন। তাদের ঘামেই শহরের বাজার ভরে, আমাদের ঘরে ভাত ওঠে। তাই হাওড়ের কৃষকের দুর্দশাকে দূরের কোনো আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জাতীয় সমস্যা, মানবিক সমস্যা এবং খাদ্য নিরাপত্তার সমস্যা।

এখন সময় হাওড়ের কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর। সরকারকে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে, সমাজকেও সহমর্মিতার হাত বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে হাওড় উন্নয়নের নামে হাওড়ের ক্ষতি করা যাবে না। উন্নয়ন হতে হবে প্রকৃতিবান্ধব, কৃষকবান্ধব ও জীবনমুখী। হাওড়বাসীর কণ্ঠস্বর শুনে, তাদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে এবং বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে এগোতে হবে। তাহলেই হয়তো আগামী দিনে ভাটি অঞ্চলের কৃষক আবার হাসিমুখে ধান ঘরে তুলবেন, আবার গান ফিরবে ধানক্ষেতে, আর হাওড়ের বুক থেকে হাহাকারের বদলে ভেসে আসবে জীবনের সুর।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

হাওরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থায় পৃথক পরিকল্পনা করছে সরকার: ববি হাজ্জাজ

হাওরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থায় পৃথক পরিকল্পনা করছে সরকার: ববি হাজ্জাজ

হাওড়-কন্যার প্রেমের টানে চীনা পুলিশ কিশোরগঞ্জে

হাওড়-কন্যার প্রেমের টানে চীনা পুলিশ কিশোরগঞ্জে

হাওড়ের সমস্যা চিহিৃত করতে স্পেশাল ট্রাস্কর্ফোস গঠনের আহ্বান ডেপুটি স্পিকারের

হাওড়ের সমস্যা চিহিৃত করতে স্পেশাল ট্রাস্কর্ফোস গঠনের আহ্বান ডেপুটি স্পিকারের

হাওড়ে ৮৪ শতাংশ বোরো ধান কাটা সম্পন্ন: জাহেদ উর রহমান

হাওড়ে ৮৪ শতাংশ বোরো ধান কাটা সম্পন্ন: জাহেদ উর রহমান

আরও কমছে কিশোরগঞ্জের নদ-নদীর পানি, হাওড়ে ফিরছে স্বস্তি

আরও কমছে কিশোরগঞ্জের নদ-নদীর পানি, হাওড়ে ফিরছে স্বস্তি

হাওড়ে স্বপ্নের অবশিষ্ট সোনালি ফসল রক্ষার প্রাণপণ সংগ্রাম

হাওড়ে স্বপ্নের অবশিষ্ট সোনালি ফসল রক্ষার প্রাণপণ সংগ্রাম

আরও পড়ুন

অন্যমত দেশের জ্বালানি খাত শক্তিশালী করতে হবে

দেশের জ্বালানি খাত শক্তিশালী করতে হবে

র-মোসাদ আঁতাত : বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর করণীয়

র-মোসাদ আঁতাত : বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর করণীয়

সাইবার নিরাপত্তা নাকি সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা

সাইবার নিরাপত্তা নাকি সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা

ক্ষমতার রাজনীতি নয়, প্রয়োজন শিক্ষা-সংস্কৃতি ও মানবিকতার সমন্বয়

ক্ষমতার রাজনীতি নয়, প্রয়োজন শিক্ষা-সংস্কৃতি ও মানবিকতার সমন্বয়

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম