ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পৃথক প্রশ্নপত্র, সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি কী?
Advertisement
আবদুল্লাহ জামান
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৫:০১ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ভর্তি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিগত বিষয় নয়; বরং তা সমগ্র জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। সেই কারণেই ইংরেজি মাধ্যম ও বাংলা মাধ্যম শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক প্রশ্নপত্র প্রণয়নের উদ্যোগ অত্যন্ত গভীর উদ্বেগের বিষয়।
একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা হওয়া উচিত একটি অভিন্ন মানদণ্ডের ভিত্তিতে, যেখানে সকল আবেদনকারীকে একই একাডেমিক সক্ষমতা, বিশ্লেষণী দক্ষতা এবং উচ্চশিক্ষার উপযোগিতা অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হবে। শিক্ষাধারাভিত্তিক পৃথক প্রশ্নপত্র এই মৌলিক নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। এটি ভবিষ্যতে আরও বিভিন্ন শিক্ষাধারার জন্য পৃথক প্রশ্নপত্রের দাবি উত্থাপনের পথ খুলে দিতে পারে, যা জাতীয় মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে আরও বিভক্ত করবে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের সিদ্ধান্তের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো উন্মুক্ত বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, সাইকোমেট্রিক বিশ্লেষণ, তুলনামূলক গবেষণা বা জনসম্মুখে প্রকাশিত প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। একটি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ (High-Stakes) ভর্তি পরীক্ষায় বৈধতা (Validity), নির্ভরযোগ্যতা (Reliability), ন্যায্যতা (Fairness), তুলনাযোগ্যতা (Comparability), Measurement Invariance, Differential Item Functioning (DIF), Equating এবং Standard Setting-এর মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিশ্চিত না করে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো,যদি ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক প্রশ্নপত্র প্রয়োজন হয়, তাহলে একই যুক্তিতে কি মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্যও পৃথক প্রশ্নপত্র দিতে হবে না? বা অন্যান্য শিক্ষাধারাও একই দাবি তুলবে না? এ ধরনের নীতি শেষ পর্যন্ত একটি অভিন্ন জাতীয় ভর্তি ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
এ সিদ্ধান্ত জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার জন্যও একটি নেতিবাচক বার্তা বহন করে। এটি এমন ধারণা তৈরি করতে পারে যে, জাতীয় শিক্ষাক্রমকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরিবর্তে বিভিন্ন শিক্ষাধারার জন্য আলাদা মূল্যায়ন কাঠামোই সমাধান।
অথচ একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রকৃত অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জাতীয় পাঠ্যক্রম, শিক্ষক উন্নয়ন, মূল্যায়নব্যবস্থা এবং শিক্ষার মান উন্নয়নে বিনিয়োগ করা।
এমন একটি নীতিগত পরিবর্তনের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত পূর্ণাঙ্গ গবেষণা, স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনা, অংশীজনের মতামত এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডভিত্তিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ প্রকাশ করা। কারণ একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি দেশের শিক্ষানীতি, সামাজিক আস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
একই সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও জনমনে স্বাভাবিকভাবেই উঠে আসে ,এ ধরনের বড় নীতিগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা কীভাবে নির্ধারিত হলো এবং এর পেছনে কী ধরনের গবেষণা, পরামর্শ ও সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে?
জনস্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা, যাতে কোনো ধরনের স্বার্থের সংঘাত, বা বিশেষ গোষ্ঠীর সুবিধা নিয়ে জনমনে কোনো সন্দেহের অবকাশ না থাকে। নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিই একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা অটুট রাখার একমাত্র পথ।
যদি এই সিদ্ধান্ত সত্যিই শিক্ষার্থীদের স্বার্থে হয়ে থাকে, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত এর পক্ষে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা, পরিসংখ্যান, সাইকোমেট্রিক বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডভিত্তিক প্রমাণ প্রকাশ করা। কেন একটি অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষার পরিবর্তে পৃথক প্রশ্নপত্র প্রয়োজন হলো,তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা জাতির সামনে তুলে ধরা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিক দায়িত্ব।
কিন্তু যদি কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি, উন্মুক্ত গবেষণা বা স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মতামত ছাড়াই এমন একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—এই সিদ্ধান্তের পেছনে প্রকৃত প্রেরণা কী? কারা এর সুবিধাভোগী? কোন স্বার্থগোষ্ঠী এ থেকে লাভবান হবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি কখনোই এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে জনগণের মনে এই ধারণা জন্মায় যে সিদ্ধান্তটি কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা বাণিজ্যিক স্বার্থকে সুবিধা দিতে নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা একটি জাতীয় সম্পদ; এর নীতিনির্ধারণ হতে হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন, বৈজ্ঞানিক এবং সর্বোপরি জাতীয় স্বার্থনির্ভর।
আরও একটি গভীর জাতীয় প্রশ্ন এখানে অনিবার্যভাবে সামনে আসে। আমরা কি ধীরে ধীরে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, যেখানে জাতীয় শিক্ষাক্রমের পরিবর্তে বিদেশি শিক্ষাধারাই নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে?
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শিক্ষা নীতির ভিত্তি হওয়া উচিত তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, নিজস্ব শিক্ষাদর্শন এবং নিজস্ব মানবসম্পদ উন্নয়নের কৌশল। কিন্তু যদি একের পর এক নীতিগত সিদ্ধান্ত এমনভাবে গৃহীত হয়, যা আন্তর্জাতিক বা ব্রিটিশ শিক্ষাধারাকে ক্রমাগত বিশেষ সুবিধা দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ একটি নতুন ধরনের শিক্ষাগত উপনিবেশবাদের (Educational Colonialism) ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ঔপনিবেশিক যুগে রাজনৈতিক শাসনের মাধ্যমে যে প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হতো, আধুনিক বিশ্বে তা অনেক সময় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। যদি একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই এমন বার্তা দেয় যে বিভিন্ন শিক্ষাধারার জন্য ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োজন, তবে এটি ধীরে ধীরে জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থা দুর্বল করতে পারে এবং বিদেশি কারিকুলামের সামাজিক মর্যাদা আরও বৃদ্ধি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি জাতীয় শিক্ষা নীতির ভারসাম্যকে প্রভাবিত করার আশঙ্কা সৃষ্টি করে।
এ ধরনের সিদ্ধান্ত আরেকটি সামাজিক বাস্তবতাকেও আরও দৃশ্যমান করতে পারে—সমাজে একটি সুবিধাপ্রাপ্ত বা অভিজাত (bourgeois) শিক্ষাগত শ্রেণি এবং একটি সাধারণ জাতীয় শিক্ষাধারার শ্রেণির মধ্যে বিভাজন আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকি।
যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নীতিগতভাবে এমন বার্তা দেয় যে একদল শিক্ষার্থীর জন্য পৃথক মূল্যায়ন কাঠামো প্রয়োজন, তবে তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমান নাগরিকত্ব ও সমান প্রতিযোগিতার ধারণাকে দুর্বল করতে পারে। একটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা হওয়া উচিত এই বিভাজন কমানো, নতুন বিভাজন সৃষ্টি করা নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের চেতনা, জাতীয় শিক্ষা নীতি এবং স্বাধীনতার আদর্শ আমাদের একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কিন্তু অভিন্ন জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানায়। সেই কারণে আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন পৃথক প্রশ্নপত্র নয়; বরং জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন, শিক্ষক উন্নয়ন, আধুনিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা, গবেষণাভিত্তিক নীতিনির্ধারণ এবং এমন একটি ভর্তি পরীক্ষা, যা সকল শিক্ষার্থীর জন্য একই মানদণ্ডে ন্যায়সংগত, বৈজ্ঞানিক ও বিশ্বাসযোগ্য হবে।

লেখক: প্রিন্সিপাল, উইটন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (WIS) ও গাইডেন্স ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (GIS)
