Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সৌরশক্তি: নীতির অগ্রগতি, বাস্তবতার পরীক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন পথ

Advertisement

Icon

ওমর ফারুক খান

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪০ পিএম

বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সৌরশক্তি: নীতির অগ্রগতি, বাস্তবতার পরীক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন পথ

Advertisement

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকটের আলোচনায় এখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি কীভাবে জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি কমিয়ে সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়? আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং দেশীয় গ্যাসের সীমাবদ্ধতার মধ্যে এই প্রশ্নের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। সৌরবিদ্যুৎকে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ধারায় পরিণত করার সাম্প্রতিক সরকারি উদ্যোগ তাই সময়োপযোগী আলোচনার দাবি রাখে।

তবে সংকটের প্রকৃতি বুঝতে হলে আবেগের পরিবর্তে পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো জরুরি। ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর সংবাদমাধ্যমে জ্বালানি স্বল্পতার কারণে প্রায় ২,৫০০ মেগাওয়াট লোডশেডিংয়ের খবর প্রকাশিত হয়। অথচ পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫,০১৩ মেগাওয়াট, সরবরাহ ছিল ১৪,৮৪৬ মেগাওয়াট এবং ঘাটতি ছিল ১৬৭ মেগাওয়াট। এই দুই পরিসংখ্যানের পার্থক্যই দেখায় যে বিদ্যুৎ সংকটের তীব্রতা সময়, জ্বালানির প্রাপ্যতা ও উৎপাদন পরিস্থিতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের সমস্যা কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানোর নয়; উৎপাদন ক্ষমতাকে বাস্তব সরবরাহে রূপান্তর করা, জ্বালানি সংগ্রহের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক বাজারের ধাক্কা থেকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

স্থাপিত সক্ষমতা বাড়লেই কি সংকট মেটে?

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের পরিসংখ্যান এ প্রশ্নের তাৎপর্য স্পষ্ট করে। ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৩২,৩৩২ মেগাওয়াট; এর মধ্যে গ্রিডভিত্তিক উৎপাদন ক্ষমতা ২৮,৯১৯ মেগাওয়াট। একই তথ্যে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে দৈনিক গড় উৎপাদন প্রায় ১৪,৫০০ থেকে ১৫,০০০ মেগাওয়াট বলে উল্লেখ করা হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী তখন চাহিদার তুলনায় সামগ্রিক ঘাটতি না থাকার কথা জানালেও গ্রীষ্মকালে জ্বালানির সীমাবদ্ধতা, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রাকৃতিক কারণে সাময়িক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি স্বীকার করেন।

এই তথ্যের তাৎপর্য হলো, স্থাপিত উৎপাদন ক্ষমতা এবং নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবে উৎপাদনযোগ্য বিদ্যুৎ এক বিষয় নয়। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকলে কিংবা আমদানিকৃত জ্বালানি কেনার অর্থের সংকট দেখা দিলে স্থাপিত সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যায় না। একইভাবে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে সব গ্রাহকের কাছে নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছানোও কঠিন হতে পারে।

৮ অক্টোবরের সংকট সম্পর্কে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট প্রায় ২৫ টাকা, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ১৩–১৪ টাকা এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রে প্রায় ৭ টাকা। এগুলো সংশ্লিষ্ট সময়ের প্রতিবেদনে উল্লিখিত ব্যয়, সর্বজনীন বা স্থায়ী উৎপাদন মূল্য নয়। তবু পার্থক্যটি বোঝায়, সাশ্রয়ী জ্বালানির সরবরাহ ব্যাহত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কতটা বেড়ে যেতে পারে।

সৌরবিদ্যুৎ: বিকল্প নয়, জাতীয় শক্তির পরিপূরক উৎস

এই বাস্তবতায় সৌরবিদ্যুৎকে আর কেবল গ্রামীণ বাড়ি, বিচ্ছিন্ন স্থাপনা কিংবা ব্যক্তিগত উদ্যোগের প্রযুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের শিল্প কারখানা, সরকারি ভবন, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান এবং আবাসিক ভবনের ছাটে (ছাদে) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে। এসব ছাদ ব্যবহার করতে পারলে নতুন জমির ওপর চাপ না বাড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫-এ ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচিতে ২,০০০–৩,০০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যও উল্লেখ রয়েছে।

এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে দিনের বেলায় শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ সৌরশক্তি থেকে পূরণ করা সম্ভব হবে। এতে গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়ার পরিমাণ কমতে পারে, জ্বালানির ওপর চাপ হ্রাস পেতে পারে এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ব্যয় আরও পূর্বানুমানযোগ্য হতে পারে।

তবে সৌরবিদ্যুৎ রাতের বেলা উৎপাদিত হয় না এবং মেঘলা আবহাওয়ায় এর উৎপাদন কমে যেতে পারে। তাই সৌরবিদ্যুৎকে জাতীয় গ্রিডের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং গ্যাস, কয়লা, জলবিদ্যুৎ, আমদানিকৃত বিদ্যুৎ এবং প্রয়োজনীয় সংরক্ষণ প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বিত একটি পরিপূরক উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

অতীতের বাধা কাটাতে নীতিগত পরিবর্তন

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। কিন্তু প্রাথমিক বিনিয়োগের উচ্চ ব্যয়, আমদানি ও করসংক্রান্ত জটিলতা, ব্যাংক ঋণের সীমাবদ্ধতা, গ্রিডে সংযোগের দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং নেট মিটারিংয়ের সুবিধা পাওয়ার অনিশ্চয়তা এর প্রসারকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

অনেক গ্রাহকের জন্য সমস্যা ছিল অর্থনৈতিক: সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হতে পারে, কিন্তু প্রাথমিক ব্যয় একসঙ্গে বহন করা কঠিন। অন্যদিকে, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা ভবনের মালিক নিজস্ব অর্থে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করলেও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের আর্থিক সুবিধা, বিল সমন্বয় এবং মিটারিংয়ের প্রক্রিয়া স্পষ্ট না হলে বিনিয়োগে আগ্রহ কমে যায়।

বিদ্যুৎ বিভাগের সরকারি নীতিমালা তালিকায় এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫, নেট মিটারিং নির্দেশিকা ২০২৫, জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি বাস্তবায়ন নির্দেশিকা এবং ২০২৬ সালের নতুন নীতিগত দলিল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব উদ্যোগ নীতিগত কাঠামোকে আরও বিস্তৃত করেছে।

তবে নীতির সাফল্য বিচার করতে হবে বাস্তবায়নের ফল দিয়ে। কতটি প্রকল্প অনুমোদিত হলো, কতটি চালু হলো, প্রকৃতপক্ষে কত বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলো এবং গ্রাহক কত সাশ্রয় পেলেন - এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন।

প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সার প্রণোদনা: সুযোগ ও শর্ত

সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর কার্যকর হওয়া ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রণোদনা। বিদ্যুৎ বিভাগের প্রজ্ঞাপন সম্পর্কে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিট সর্বোচ্চ ৮ টাকা ধরে অতিরিক্ত প্রণোদনাংসহ (প্রণোদনা ও) গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের মূল্য প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই সুবিধা পেতে নির্দিষ্ট সময়সীমা ও শর্ত রয়েছে:

  • সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
  • নিজস্ব চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে হবে।
  • যোগ্য প্রকল্পের জন্য প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সার প্রণোদনা ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত প্রযোজ্য বলে ঘোষণায় উল্লেখ রয়েছে।
  • প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার, মিটারসহ ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিকে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (SREDA) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মান পূরণ করতে হবে।
  • বিতরণ কোম্পানি গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণ ও সংশ্লিষ্ট হিসাব সংরক্ষণ করবে; প্রণোদনার অর্থ নগদে নয়, ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক সেবার হিসাবে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রণোদনার আর্থিক কাঠামো বোঝার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা জরুরি। প্রকাশিত সরকারি ঘোষণার সংবাদ বিবরণ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ৮ টাকা উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১.২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করে ১০ টাকা ৫০ পয়সার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ হিসাবটি মূল ব্যয়ের ওপর দুটি অংশ যোগ করার ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণকারীদের তাই চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপনের পূর্ণ পাঠ, যোগ্যতার শর্ত এবং বিল সমন্বয়ের পদ্ধতি যাচাই করে বিনিয়োগ করা উচিত।

এই প্রণোদনা একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংকেত দেয়: সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে শুধু নিজের বিদ্যুৎ বিল কমানো নয়, উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের মাধ্যমেও আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে ব্যবস্থার স্থাপন ব্যয়, ব্যাটারির আয়ুষ্কাল, রক্ষণাবেক্ষণ, নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ এবং গ্রিডে সরবরাহযোগ্য উদ্বৃত্ত বিদ্যুতের ওপর।

সরকারের জন্যও একটি প্রশ্ন থেকে যায়: প্রণোদনার ব্যয় কীভাবে হিসাব করা হবে এবং ২০৩০ সালে নির্ধারিত সুবিধার মেয়াদ শেষ হলে বিনিয়োগকারীরা কীভাবে পরিচালন ও প্রতিস্থাপন ব্যয় সামলাবেন? তাই প্রণোদনার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক মূল্যায়ন ও পরবর্তী নীতির রূপরেখা থাকা উচিত।

১৯ অক্টোবরের সৌরবিদ্যুৎ অধ্যাদেশ: নতুন সম্ভাবনা, নতুন দায়িত্ব

সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে আরেকটি সাম্প্রতিক পদক্ষেপ হলো Special Solar Power Installation Ordinance, 2026। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ২০ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধ্যাদেশটির গেজেট ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত হয়েছে। এতে সর্বোচ্চ ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। ছাদ, আঙিনা, অব্যবহৃত জমি, চা-বাগান, ভাসমান সৌরব্যবস্থা এবং কৃষির সঙ্গে সমন্বিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এর আওতায় আসতে পারে। বৃহৎ ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র অবশ্য এই বিশেষ ব্যবস্থার আওতার বাইরে থাকবে।

অধ্যাদেশে গ্রাহক, সেবা প্রদানকারী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির বিধান রয়েছে। চুক্তিতে স্থান ব্যবহারের অধিকার, যন্ত্রপাতির মান, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ফেরত নেওয়ার ব্যবস্থা, বিদ্যুতের মূল্য এবং নেট মিটারিংয়ের সুবিধা নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া জাতীয় পর্যায়ে নীতি সমন্বয়ের জন্য একটি কাউন্সিল এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কারিগরি ও সমন্বয় কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। এসব কমিটির নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়ার ব্যবস্থাও উল্লেখ করা হয়েছে।

এই কাঠামোর সম্ভাব্য সুফল হলো, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন ও বাস্তবায়নে সমন্বয় বাড়িয়ে এবং স্থানীয় পর্যায়ে বাধা শনাক্ত করা। কিন্তু প্রশাসনিক কাঠামো যত বিস্তৃতই হোক, প্রকল্প অনুমোদনের সময়সীমা, দায়িত্বের স্পষ্টতা এবং বিনিয়োগকারীর অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যকর না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

অধ্যাদেশে যন্ত্রপাতির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতকারকের ফেরত নেওয়ার দায়িত্বের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো প্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারির নিরাপদ সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় আজকের জ্বালানি সমাধান ভবিষ্যতে পরিবেশগত সমস্যা তৈরি করতে পারে।

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য আর কী করতে হবে?

সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু শুধু প্যানেল স্থাপন করলেই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত হবে না। এর জন্য অন্তত পাঁচটি ক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার।

প্রথমত, সরকারি ভবন, শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক ভবনের ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। নতুন জমি ব্যবহারের আগে বিদ্যমান অবকাঠামোর অব্যবহৃত স্থান কাজে লাগানো উচিত।

দ্বিতীয়ত, নেট মিটারিংয়ের আবেদন, অনুমোদন, মিটার স্থাপন এবং বিল সমন্বয়ের জন্য সময়সীমাবদ্ধ ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। গ্রাহককে জানতে হবে কখন তাঁর আবেদন অনুমোদিত হবে এবং গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের হিসাব কীভাবে সমন্বয় করা হবে।

তৃতীয়ত, ব্যাটারি সংরক্ষণ ও গ্রিড আধুনিকীকরণে বিনিয়োগ করতে হবে। দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বেশি হলেও সন্ধ্যায় চাহিদা বাড়তে পারে। ব্যাটারি, উন্নত সঞ্চালন ব্যবস্থা, স্মার্ট মিটার এবং বিদ্যুৎ চাহিদার পূর্বাভাসের সমন্বয় এই ব্যবধান মোকাবিলায় সহায়তা করবে।

চতুর্থত, প্রণোদনা ও অর্থায়নকে লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষক এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহজ ঋণ ও উপযুক্ত অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য স্বচ্ছ চুক্তি, দ্রুত অনুমোদন এবং নির্ভরযোগ্য গ্রিড সংযোগ বিনিয়োগে সহায়ক হতে পারে।

পঞ্চমত, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করতে হবে। উৎপাদন বাড়ার পরও যদি গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছাতে না পারে, তাহলে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাব্য সুফল পুরোপুরি অর্জিত হবে না।

এসব উদ্যোগের অগ্রগতি পরিমাপের জন্য সরকারকে নিয়মিতভাবে প্রকৃত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, নতুন স্থাপিত সক্ষমতা, বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়, প্রণোদনার আর্থিক দায় এবং লোডশেডিংয়ের তথ্য প্রকাশ করতে হবে। শুধু ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা নয়, বাস্তব ফলাফল ই হওয়া উচিত নীতির সাফল্য মূল্যায়নের ভিত্তি।

শেষকথা

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় সৌরবিদ্যুৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক প্রণোদনা, নেট মিটারিং নির্দেশিকা, জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি এবং নতুন অধ্যাদেশ নীতিগতভাবে সৌরবিদ্যুতের বিস্তারের পথ প্রশস্ত করতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দক্ষতা, আর্থিক স্থায়িত্ব, গ্রিডের সক্ষমতা এবং বিনিয়োগকারীর আস্থার ওপর।

লেখক পরিচিতি: সফটওয়্যার প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওমর ফারুক খান পেশাগত জীবনে একজন যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন। প্রযুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রকৌশলভিত্তিক বিষয়ে অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বর্তমানে ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল ও জ্বালানি খাতের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ এবং টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে অনুসন্ধান ও গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখি করছেন।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

গ্রীষ্মের আগেই চার হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব: বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী

গ্রীষ্মের আগেই চার হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব: বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী

সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশ ভাঙচুর ও চুরির কী শাস্তি

অধ্যাদেশ জারি সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশ ভাঙচুর ও চুরির কী শাস্তি

সৌরবিদ্যুতের পরিকল্পনায় যাচ্ছে নোবিপ্রবি

সৌরবিদ্যুতের পরিকল্পনায় যাচ্ছে নোবিপ্রবি

ধূলি জমে দেশে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন কমছে ১৫ শতাংশ: গবেষণা

ধূলি জমে দেশে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন কমছে ১৫ শতাংশ: গবেষণা

ছাদভিত্তিক সর্ববৃহৎ সোলার প্ল্যান্ট স্থাপনে চুক্তি করল যমুনা গ্রুপ

প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া ছাদভিত্তিক সর্ববৃহৎ সোলার প্ল্যান্ট স্থাপনে চুক্তি করল যমুনা গ্রুপ

আরও পড়ুন

বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সৌরশক্তি: নীতির অগ্রগতি, বাস্তবতার পরীক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন পথ

বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে সৌরশক্তি: নীতির অগ্রগতি, বাস্তবতার পরীক্ষা ও জ্বালানি নিরাপত্তার নতুন পথ

শিশুদের পাঠ্যবইয়ে নৌকা-দাঁড়িপাল্লার ছবি কেন?

শিশুদের পাঠ্যবইয়ে নৌকা-দাঁড়িপাল্লার ছবি কেন?

বিয়েতে প্রতিযোগিতা নয়, চাই দায়িত্বশীলতা ও সহমর্মিতা

বিয়েতে প্রতিযোগিতা নয়, চাই দায়িত্বশীলতা ও সহমর্মিতা

অর্থনৈতিক বেইনসাফি, শিশু সুরক্ষা ও আলেম সমাজ: সংকট ও উত্তরণের উপায়

অর্থনৈতিক বেইনসাফি, শিশু সুরক্ষা ও আলেম সমাজ: সংকট ও উত্তরণের উপায়

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম