মেয়াদ শেষ রাকসুর, নতুন নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা
Advertisement
ইরফানুর রহমান, রাবি
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাড়ে তিন দশকের দীর্ঘ অচলায়তন ভেঙে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে গত বছরের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) নির্বাচন।
গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) এক বছর মেয়াদি হল সংসদ ও কেন্দ্রীয় সংসদের মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো প্রস্তুতি এখনও দৃশ্যমান নয়। এতে দীর্ঘ বিরতির পর প্রাণ ফিরে পাওয়া ছাত্র সংসদের কার্যক্রমে আবারও ভাটা পড়তে চলেছে।
নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অভিযোগ, 'গ্রিন সিগন্যাল' না থাকায় উপাচার্য নির্বাচন আয়োজনে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। অন্যদিকে উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানাচ্ছে, অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
প্রসঙ্গত, ৩৫ বছর পর গত বছরের ১৬ অক্টোবর রাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২৩টি পদের বিপরীতে মোট ৯টি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’ সহ-সভাপতি ও সহ-সাধারণ সম্পাদকসহ ২০টি পদে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। হল সংসদগুলোতেও শীর্ষ ৫১ পদে (ভিপি-জিএস-এজিএস) শিবিরের একক আধিপত্য দেখা যায়।
গত বছর অনুষ্ঠিত রাকসু নির্বাচনের প্রথম ঘোষিত তারিখ ছিল ১৫ সেপ্টেম্বর। এর প্রায় ৫০ দিন আগে ২৮ জুলাই তফসিল ঘোষণা করেছিল নির্বাচন কমিশন। যদিও নানা জটিলতায় তিন দফায় নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে চূড়ান্তভাবে ১৬ অক্টোবর ভোট গ্রহণ করা হয়েছিল এবং ২৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নিয়েছিল নির্বাচিত সদস্যরা। শপথ গ্রহণের দিন থেকে নির্বাচিত সংসদের মেয়াদ এক বছর। সেই হিসাবে বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হলো সোমবার। কিন্তু বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হলেও নতুন নির্বাচন নিয়ে কোনো তোড়জোড় দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাকসু কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক সেতাউর রহমান বলেন, রাকসু নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো বার্তা উপাচার্য থেকে পাইনি। রাকসুর গঠনতন্ত্রে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরুর সময়সীমা নিয়ে স্পষ্ট উল্লেখ নেই। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এতদিন তফসিল ঘোষণা করার কথা ছিল। নির্বাচন আয়োজন করার জন্য যে প্রস্তুতি দরকার সেটা এই মুহূর্তে নেই।
অনিয়মিত রাকসুর ইতিহাস
রাকসু নির্বাচন দীর্ঘ বিরতি ও অনিয়মিত হওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। ১৯৫৭ সালে ‘রাসু’ নামে যাত্রা শুরু করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্র সংসদটি। ১৯৫৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তানের জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারির কারণে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত এর কার্যক্রম বন্ধ থাকে। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নাম পরিবর্তন করে ‘রাকসু’ নামে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দেয়।
এরপর থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ১৪ বার রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মাঝে মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল ১৯৭০-১৯৭২, সামরিক শাসন ১৯৭৫-১৯৮০ এবং ১৯৮১-১৯৮৮ সাল পর্যন্ত একাধিকবার নির্বাচন স্থগিত ছিল। সর্বশেষ ১৯৮৯ সালের নির্বাচনের পর দীর্ঘ ৩৫ বছর রাকসুর কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল।
দাবি ও বাস্তবতা
দায়িত্ব পালনের শেষপর্যায়ে রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ দাবি করেছেন, কেন্দ্রীয় ও হল সংসদ মিলিয়ে ইশতেহারে উল্লেখ করা ১০৭টি কাজের প্রায় ৭৩ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে এই হিসাবের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতার পুরোপুরি মিল পাওয়া যাচ্ছে না। আবাসন সংকট, অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের ভাতা, মেডিকেল সেন্টারের সংস্কার, পূর্ণাঙ্গ টিএসসিসি এবং শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে।
রাকসুর নেতারা এসব উদ্যোগের কিছু বাস্তবায়নাধীন থাকার কথা স্বীকার করেছেন।
তাদের দাবি, কয়েকটি বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়ায় অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। রাকসুর কার্যক্রমের মধ্যে ছিল বিভিন্ন আয়োজন, মতবিনিময়, স্মারকলিপি প্রদান, সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কর্মসূচি এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে তৎপরতা। তবে এসব আয়োজনের কতটা দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন এনেছে, তা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে।
ছাত্রনেতাদের অভিযোগ, দৃশ্যমান কর্মসূচি থাকলেও আবাসন, চিকিৎসা ও পরিবহণের মতো মৌলিক সংকট নিরসনে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। ফলে কর্মসূচির সংখ্যা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের জীবনে তার বাস্তব প্রভাব দিয়েই রাকসুর সাফল্য বিচার করার দাবি উঠেছে।
যা বলছেন ছাত্রনেতারা
এদিকে রাকসু নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল তা বর্তমান শিবির সমর্থিত প্যানেলের কার্যক্রমে হতাশার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন ইশতেহার বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি বলেও অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। আবার রাকসু বন্ধ হলে ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের দখলদারিত্ব সৃষ্টি হবে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, প্রশাসন যদি রাকসু নির্বাচন নিয়ে গড়িমসি করে তবে ধরে নিতে হবে তারা ক্যাম্পাসে ক্ষমতার বণ্টন রুখে দিতে চায়। এতে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠন নিজেদের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে দখলদারিত্ব চালু করবে। শিবির প্যানেলের ব্যর্থতার কারণে রাকসু নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে হতাশা জন্ম নিয়েছে, তার একমাত্র নিরাময় আগামী নির্বাচনের ব্যালট বাক্সে এসব প্রতারণার জবাব দেওয়া।
শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি হাফেজ মেহেদী হাসান বলেন, রাকসু নির্বাচন হওয়াটা অপরিহার্য। আমরা আমাদের জায়গায় অনড়। আমরা প্রশাসনকে বারবার পরবর্তী নির্বাচনের বিষয়ে জানিয়েছি। স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩-এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী রাকসু নির্বাচন দিতে হবে। পরবর্তী নির্বাচনের জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।
শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মাহমুদুল হাসান মিঠু বলেন, আমরা চাই ছাত্রসংসদ সচল থাকুক। আমরা প্রশাসনের পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছি। প্রশাসন যদি কোনো পদক্ষেপ না নেয় ও টালবাহানা করে তবে আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে রাকসুর নির্বাচন নিয়ে দাবি জানাব।
তবে রাকসু নির্বাচনকে ক্যালেন্ডারভুক্ত করার ইশতেহার দিয়েছিল ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট’। রাকসুর সহ-সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সালমান সাব্বির বলেন, আমরা নির্বাচনের জন্য প্রশাসনকে দ্বিতীয় অধিবেশন থেকে নিয়মিত চাপ দিচ্ছি। শেষ অধিবেশনেও এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পরবর্তী রাকসু নির্বাচন কবে হবে তা উপাচার্য সিনেটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে এখন পর্যন্ত যা মনে হচ্ছে এ বছর আর রাকসু নির্বাচন হচ্ছে না।
রাকসু সহ-সভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, নির্বাচন নিয়ে পূর্ববর্তী প্রশাসনের আগ্রহ যতটুকু দেখেছি এই প্রশাসনের তেমন আগ্রহই দেখতে পাই না। এই প্রশাসন কোনো ‘গ্রিন সিগন্যাল’-এর অপেক্ষায় আছে এটা স্পষ্ট। সরকারের থেকে এমন ‘গ্রিন সিগন্যাল’-এর অপেক্ষায় থাকবে এমন মনোভাব থাকলে বিষয়টি হতাশার। রাকসু নিয়ে দায়সারা প্রশাসনের মনোভাব দেখতে পেয়েছি। দুটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন ক্ষমতাসীন দল আসার পর স্থগিত হয়েছে। সেখানে রাকসু নির্বাচন বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।
রাকসু নির্বাচন কবে হবে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম বলেন, রাকসুর বিষয়ে প্রশাসন অত্যন্ত আন্তরিক। যখন রাকসুর নির্বাচন পরিবেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে সৃষ্টি হবে তখনই নির্বাচন আয়োজন করা হবে। আমার কাছে পরিবেশটা প্রাধান্য পাবে। রাকসু নির্বাচনকে ঘিরে যেন কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে, পড়ালেখার পরিবেশ বিঘ্নিত না হয় এমন পরিবেশ ছাড়া নির্বাচন আয়োজন করা হবে না।
নির্বাচনে উপরের কোনো চাপ আছে কিনা তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাকসুর বিষয়ে উপরমহলের কোনো চাপ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একদম স্বাধীনভাবে কাজ করবে।
