ঘুসের টাকা ফেরত চাওয়ায় মা-মেয়েকে মারধর এসআইয়ের, এক মাসের কারাদণ্ড
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬, ০৪:০৫ পিএম
কারাগারে মা-মেয়ে। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিচার চাইতে গিয়ে থানার ভেতরেই রক্তাক্ত হলেন এক কলেজছাত্রী ও তার মা। অভিযোগ উঠেছে—মামলার তদন্তে নেওয়া ঘুসের টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে তাদের একটি কক্ষে আটকে রেখে বেধড়ক মারধর করেন পুলিশের এক উপ-পরিদর্শক (এসআই) ও তার সহযোগীরা। পরে ঘটনাটি আড়াল করতে দ্রুত ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মা–মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
বুধবার (৪ মার্চ) বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে কক্সবাজারের পেকুয়া থানায় চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এলাকায় আলোচনা শুরু হয়।
অভিযোগ রয়েছে, মারধরের পরও তাদের কোনো চিকিৎসা না দিয়ে সরাসরি কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
মারধরের শিকার দুই নারী হলেন- রেহেনা মোস্তফা রানু (৪২) এবং তার মেয়ে জুবাইদা বেগম (২১)। জুবাইদা চকরিয়া সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাদের বাড়ি পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের সরকারি ঘোনা এলাকায়।
ঘটনার সময় থানায় উপস্থিত ছিলেন মনজিলা বেগম (৬০)। তিনি বলেন, আমি জুবাইদা ও তার মায়ের সঙ্গে থানায় গিয়েছিলাম। মামলার তদন্ত নিয়ে তাদের কথা বলতে শুনছিলাম। তখন শুনি, মামলার পক্ষে রিপোর্ট দেওয়ার কথা বলে এসআই পল্লব ২০ হাজার টাকা নিয়েছেন। কিন্তু পরে উলটো রিপোর্ট দিয়েছেন। তাই জুবাইদা টাকা ফেরত চাইছিল।
তিনি আরও বলেন, হঠাৎ পল্লব খুব রেগে গিয়ে মা–মেয়েকে চড়-থাপ্পড় মারতে শুরু করেন। পরে মহিলা পুলিশ এসে তাদের মারতে মারতে থানার গেট পর্যন্ত নিয়ে যায়। এরপর থানার ভেতর থেকে অন্য সবাইকে বের করে দেওয়া হয় এবং তাদের বেধড়ক মারধর করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কলেজছাত্রী জুবাইদার আচরণও কিছুটা আক্রমণাত্মক ছিল। দীর্ঘদিনের হতাশায় ন্যায় বিচার চাওয়ার সময়ে তার আচরণ উগ্র হয়ে উঠেছিল।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থেকেই মূলত ঘটনার সূত্রপাত। জুবাইদার বাবা নুরুল আবছার মারা যান ২০১৩ সালের ২৩ মে। আইন অনুযায়ী জুবাইদা তার বাবার স্থাবর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী। সম্পত্তির অংশ চাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে জুবাইদার দাদার বাড়ির লোকজন তার পিতৃপরিচয় অস্বীকার করে আসছে বলে অভিযোগ পরিবারের।
ফলে ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও তাকে ওয়ারিশ সনদ দেওয়া হয়নি। পরিবারের দাবি, স্থানীয় এক নারী ইউপি সদস্য বিজু (জুবাইদার ফুফু) এক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছেন। সম্পত্তির অধিকার ফিরে পেতে আইনের আশ্রয় নেন জুবাইদা। মামলার তদন্ত পান পেকুয়া থানার এসআই পল্লব কুমার ঘোষ।
অভিযোগ, তদন্ত প্রতিবেদনে তাদের পক্ষে মত দিতে ২০ হাজার টাকা ঘুস নেন পল্লব। কিন্তু পরে প্রতিবেদন বিপক্ষে জমা দেন।
ভুক্তভোগীর খালা আমেনা বেগম বলেন, সোনার গয়না বন্ধক রেখে ২০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। তারপরও উলটো রিপোর্ট দেওয়া হল। টাকা ফেরত চাইতে আমার বোন ও ভাগনি থানায় যান। থানায় এসআই পল্লব ক্ষিপ্ত হয়ে মা–মেয়েকে মারধর করেন। এতে তারা গুরুতর আহত হন। পরে বিষয়টি আড়াল করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) ডেকে এনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মা–মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজার জেলা কারাগারে বোন ও ভাগনির সঙ্গে দেখা করেন আমেনা বেগম। তিনি জানান, রেহেনা মোস্তফার মুখ ও চোখে গভীর জখমের চিহ্ন রয়েছে। জুবাইদার বাহু, থুতনি ও বুকেও স্পষ্ট আঘাতের দাগ দেখা গেছে।
কারাগারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, পুলিশ মা–মেয়েকে কারাগারে আনার সময় তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। প্রথমে গ্রহণ না করে চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়, পরে ম্যাজিস্ট্রেটের সাক্ষ্য ও সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্রের ভিত্তিতে কারাগারে নেওয়া হয়।
এদিকে এসআই পল্লব কুমার মারধর ও ঘুস নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পেকুয়া থানার ওসি খাইরুল আলম ফোনে প্রসঙ্গ তুলতেই লাইন কেটে দেন।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল সাকিব জানান, মা–মেয়েসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে মারধর করেছে বলে জানানো হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুল আলম বলেন, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মা–মেয়েকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
জুবাইদার ছোট ভাই রুবেল বলেন, টাকা দিয়ে প্রতিবেদন উলটো জমা, টাকা ফেরত চাইতে মারধর ও সাজা—এটা কী আইন? আমরা সুষ্ঠু বিচার চাই।
