খালাস পেলেন সেই মা-মেয়ে, বললেন ‘আমাদের ইফতারের পানিটুকুও দেয়নি’
কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬, ০৭:০২ পিএম
রেহেনা মোস্তফা রানু এবং তার মেয়ে জুবাইদা বেগম। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কক্সবাজারের পেকুয়ায় ঘুসের টাকা ফেরত চাওয়ায় এক কলেজছাত্রী ও তার মাকে থানায় মারধর এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে দেওয়া সাজার রায় বাতিল করে খালাস দিয়েছেন আদালত।
শনিবার (৭ মার্চ) কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শাহিদুল আলম এ আদেশ দেন। কারাগার থেকে মুক্তির পর একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন মা-মেয়ে। বুধবার (৪ মার্চ) বিকালে পেকুয়া থানা পুলিশ তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
খালাস পাওয়া মা মেয়ে হলেন— রেহেনা মোস্তফা রানু (৪২) এবং তার মেয়ে জুবাইদা বেগম (২১)। জুবাইদা চকরিয়া সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তাদের বাড়ি পেকুয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের সরকারি ঘোনা এলাকায়।
কারাগার থেকে মুক্তির পর রেহেনা মোস্তফা সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘুসের টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে পুলিশ আমাদের থানায় ডেকে নিয়ে ইচ্ছেমতো মারধর করেছে। থানার একটি রুমে আটকে লাথি ও ঘুসি মারেন উপ-পরিদর্শক (এসআই) পল্লবসহ আরও কয়েক পুলিশ সদস্য। এতে আমরা মা-মেয়ে রক্তাক্ত হয়ে যাই।’
‘মারধরের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম থানায় আসেন। আমরা পুলিশের নির্যাতনের কথা জানাই। ভেবেছিলাম, তিনি আমাদের রক্ষা করবেন। কিন্তু আমাদের রক্তাক্ত অবস্থায় দেখেও কিছু না বলে উপরের কক্ষে চলে যান। দেড় ঘণ্টা পর সবাই চলে যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরে পুলিশ আমাদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হচ্ছে বলে একটি কালো গাড়িতে তুলে নেয়। পথে ইফতারের সময় হলেও আমাদের পানিটুকুও দেয়নি। অথচ তাদের হাতে তখন জুস ও অন্য পানীয় ছিল।’
রেহেনা বলেন, আমাদের সামনে কোনো বিচারিক কার্যক্রম হয়নি। আমরা জানতামই না সাজা হয়েছে। কারাগারে প্রবেশের পরদিন জানতে পেরেছি।
কারাগারে নেওয়ার পর তাদের শারীরিক আঘাত দেখে কর্তৃপক্ষ প্রথমে গ্রহণ করতে চাননি। পরে ইউএনওর সঙ্গে যোগাযোগ ও কাগজপত্র পাঠানোর পর তাদের গ্রহণ করা হয়। পরদিন মা-মেয়ে জানতে পারেন, তাদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে এক মাসের সাজা দেওয়া হয়েছে।
জুবাইদার জন্মের পর রেহেনা ও তার স্বামীর মধ্যে বিচ্ছেদ ঘটে। ২০১৩ সালে জুবাইদার বাবার মৃত্যু হয়। সম্পত্তির ভাগ নিয়ে চাচা ও ফুফুদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করার পর তারা জুবাইদাকে অস্বীকার করেন। আদালতের মাধ্যমে জুবাইদা মামলা করেন। মামলার তদন্তভার পেকুয়া থানাকে দেওয়া হয়।
পেকুয়া থানার এসআই পল্লব কুমার ঘোষের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তদন্ত প্রতিবেদন দিতে রেহেনা ও জুবাইদার কাছে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে ২০ হাজার টাকা নেন। ঘুস নেওয়ার পরও আদালতে জুবাইদার বিপক্ষে মিথ্যা প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে মা-মেয়ের সঙ্গে পুলিশের বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে পুলিশ মারধর করে। পরে ইউএনওকে ডেকে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মা-মেয়েকে এক মাসের সাজা দেওয়া হয়।
স্থানীয়রা বলছেন, যদি পুলিশের ওপর হামলা সত্য হতো, ফৌজদারি আইনে মামলা করা যেত। কিন্তু তা না করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ, ঘুস আদায় এবং মা-মেয়েকে থানায় নির্যাতনের আড়াল করতে ইউএনওকে ব্যবহার করা হয়েছে। স্থানীয়রা দাবি করেছেন, বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে ইউএনও, ওসি ও সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এদিকে মুক্তির পর মা-মেয়েকে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শারীরিক আঘাতের পাশাপাশি মানসিকভাবে দুজনই বিপর্যস্ত। বিশেষ করে জুবাইদা মানসিক ধাক্কায় ঠিকমতো কথা বলতে পারছেন না। কারাগার থেকে মুক্তির পর তাদের শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
পেকুয়া থানার ওসি এবং ইউএনও মাহবুব আলম কোনো নতুন বক্তব্য দেননি। যদিও এর আগে দুইজনের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগ তুলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের পক্ষে যুক্তি দেখানো হয়েছিল।
কক্সবাজার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল সাকিব বলেন, আমাকে জানানো হয়েছিল মা-মেয়ে মিলে পুলিশের ওপর হামলা করেছে। এখন মা-মেয়ের যে আঘাতের চিহ্ন তা কীভাবে হলো, তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
