দুর্গম পাহাড়ে আছোমং মারমার বেকারত্ব জয়
সুশীল প্রসাদ চাকমা, রাঙামাটি
প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ০৮:৫২ পিএম
দুর্গম পাহাড়ে আছোমং মারমার বেকারত্ব জয়
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বেকারত্ব জয় করে এখন সফল উদ্যোক্তা হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছেন রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার বাঙালহালিয়া ইউনিয়নের কুদুমছড়া গ্রামের বাসিন্দা আছোমং মারমা। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় গবাদিপশু পালন করে হয়েছেন একজন সফল খামারি।
মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বেকারত্ব দূর করে বর্তমানে অর্ধ কোটি টাকার খামারের মালিক তিনি, যা এলাকার তরুণদের জন্য অনুকরণীয়।
জানা যায়, আছোমং মারমা বর্তমানে গবাদিপশু (গরু) পালনের পাশাপাশি খামার পরিচালনা করছেন। এক সময়ের বেকার জীবন থেকে কঠোর পরিশ্রম ও মেধার মাধ্যমে তিনি সফল খামারি হয়েছেন। তার এ উদ্যোগ বর্তমানে রাজস্থলী এলাকায় কৃষি ও গবাদিপশু উৎপাদন বাড়ানোর ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় পর্যায়ে তিনি সফল উদ্যোক্তা হিসাবে পরিচিতি পেয়েছেন এবং গবাদিপশু পালনের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাঙামাটির রাজস্থলী উপজেলার বাঙালহালিয়া ইউনিয়নের কুদুমছড়া গ্রামে গড়ে তোলা আছোমং মারমার গরুর খামারটি আজ তার লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
আছোমং জানান, ২০১৮ সালে মাত্র তিনটি গরু দিয়ে গবাদিপশু পালনের যাত্রা শুরু তার। তখন পর্যাপ্ত পুঁজি বা আধুনিক অবকাঠামো- কোনোটিই তার ছিল না। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পশুখাদ্য সংগ্রহ ও চিকিৎসাসেবা পাওয়া ছিল অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকে তখন তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন কিন্তু হাল ছাড়েননি। ইউটিউব দেখে এবং অভিজ্ঞ খামারিদের পরামর্শের অভিজ্ঞতা নিয়ে এগিয়ে যান তিনি।
আছোমং বলেন, ২০২০ সালে প্রায় ১১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ১৩টি গরু কেনেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে তার খামারে গরুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮টিতে, যার বাজারমূল্য প্রায় অর্ধ কোটি টাকা। পাশাপাশি তিনি বাণিজ্যিকভাবে শূকর পালনও করছেন। প্রায় ২৫ শতক জমির ওপর গড়ে তোলা তার খামারে এখন আলাদা শেড, খাবার সংরক্ষণের স্থান এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিটি গরু অত্যন্ত যত্নসহকারে পালন করে আসছি। এখন অন্যদেরও কর্মসংস্থান হচ্ছে। তা দেখে খুব ভালো লাগে। ভবিষ্যতে খামারটিকে আরও আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উন্নয়ন করতে চাই।
দেখা যায়, আছোমং মারমার খামারটিতে বর্তমানে পাঁচজন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। প্রতিদিন গরুর সুষম খাদ্য তৈরি, ভ্যাকসিন প্রয়োগ এবং শেড পরিষ্কারের মতো কাজগুলো তারা তদারকি করেন। বর্তমানে তার খামার থেকে আছোমং মারমার বার্ষিক আয় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। এছাড়া খামারের গোবর স্থানীয় কৃষকদের কাছে জৈবসার হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে, যা পরিবেশবান্ধব কৃষিতে সহায়তা করছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়রা বলেন, আছোমং মারমার খামার শুধু মাংসের চাহিদা পূরণ করছে না, এলাকায় বেকারদের কর্মসংস্থান তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে। তার খামারে পাঁচজন শ্রমিকের নিয়মিত আয় নিশ্চিত হয়েছে। এছাড়া পশুখাদ্য সরবরাহ, পরিবহণ ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকজন পরোক্ষভাবে উপকৃত হচ্ছেন।
রাজস্থলী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা প্রিয়রতন চাকমা বলেন, বর্তমান সময়ে আত্মকর্মসংস্থানই তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। সরকারি চাকরির সীমাবদ্ধতার কারণে যুবকদের বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে হবে। সেটা আছোমং মারমা নজির দেখাচ্ছেন। তার সাহস, পরিকল্পনা ও অধ্যবসায় পাহাড়ি এলাকাতেও সফলতা এনেছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর তরুণদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও সহজ ঋণ সুবিধার মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরির কাজ করছে।
রাজস্থলী উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. মো. নোমান বলেন, পাহাড়ি এলাকায় সঠিক পরিচর্যা, নিয়মিত টিকাদান ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করলে খামারিরা ভালো লাভবান হতে পারবেন। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সব সময় খামারিদের প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
