দিনমজুরির কাজ করেও জিপিএ-৫, সবাইকে চমকে দিয়েছে পলাশ
আহসান হাবীব নীলু, কুড়িগ্রাম
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দিনমজুর বাবার সঙ্গে কৃষিজমিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে অভাব-অনটনের মধ্যেই জিপিএ-৫ পেয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের পূর্ব ধণিরাম গ্রামের পলাশ চন্দ্র রায় নামে এক মেধাবী শিক্ষার্থী।
ভূমিহীন বাবা সুধাংশু চন্দ্র রায় তার পিতার রেখে যাওয়া ৫ শতক জমিতে অপর তিন ভাইয়ের সঙ্গে ঠাসাঠাসি করে টিনের চালা তৈরি করে মাথা গোঁজার ঠাঁই গড়ে তুলেছেন।
প্রতিদিনের দিনমজুরির ওপর চলে এক ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে ৪ জনের সংসার। কাজ থাকলে পেটে খাবার জোটে। কাজ না থাকলে অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়।
এমন অভাব-অনটনের সংসারে যেখানে দু-মুঠো খাবার জোটাতে হিমশিম অবস্থা, সেখানে সেই পরিবারের দিনমজুর সন্তানের জিপিএ-৫ পাওয়া অলিক স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। সেই অসম্ভব ও অলিক স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে মেধাবী পলাশ চন্দ্র রায়।
চলতি এসএসসি পরীক্ষায় কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নে অবস্থিত বড়ভিটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সাফল্যের সঙ্গে জিপিএ-৫ পেয়েছে পলাশ। এই বিদ্যালয় থেকে এবার ৭২ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। কৃতকার্য হয়েছে ৫৫ জন। এর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৩ জন শিক্ষার্থী। তবে দারিদ্র্যতার কারণে তার আগামী দিনের উচ্চশিক্ষার খরচ চালানো নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেশী বীথি রানী বলেন, পলাশ আমাদের প্রতিবেশী। তাদের আর্থিক অবস্থা খুবই শোচনীয়। সে ভালোমতো পড়তে পারেনি, খেতে পারেনি। তার ঠিকমতো কাপড়-চোপড় ছিল না। স্কুলে প্রাইভেটের কোনো সুযোগ পায়নি। অথচ ওর রেজাল্ট খুব ভালো হয়েছে। ও যে ভবিষ্যতে কলেজে ভর্তি হবে সেই অর্থ দিতে পারবে না তার পরিবার। এখন কেউ যদি ওকে সাহায্য করে তাহলে তার ভবিষ্যৎ জীবনটা সুন্দর হবে।
প্রতিবেশী মকবুল হোসেন বলেন, আমাদের এখান থেকে প্রায় ২৫ জন পরীক্ষা দিয়েছে। সবার অবস্থা মোটামুটি সচ্ছল। পলাশের পারিবারিক অবস্থা খুবই নাজুক। এ পরিস্থিতিতে সে কিভাবে জিপিএ-৫ পেল এটাই অবাক করার বিষয়। তবে পলাশ নিজে চেষ্টা করে গেছে। তার রেজাল্টে আমরা সবাই খুশি কিন্তু খুশি হয়ে লাভ কী? ও যে পরবর্তীতে কলেজে যাবে সেখানে পড়ার মতো সামর্থ্য তাদের নাই। তার পাশে কে দাঁড়াবে। সরকার থেকে যদি সাহায্য করা হয় তাহলে হয়তো পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারবে সে।
পলাশ চন্দ্র রায় জানায়, আমার এ পর্যন্ত আসার পথটা সহজ ছিল না। অভাবের সংসারে বাবা-মায়ের পক্ষে আমার পড়ালেখার খরচ জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। আমি যখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র, তখনই টাকার অভাবে আমার লেখাপড়া বন্ধ হওয়ায় উপক্রম হয়েছিল। আমি বাবার সঙ্গে কখনো অন্যের জমিতে ও রাস্তায় দিনমজুরি করে টাকা রোজগার করতাম। আমার রোজগারের কিছু টাকা সংসারের কাজে খরচের পাশাপাশি নিজের লেখাপড়ার জন্য জমা করতাম। এভাবেই আমি চালিয়ে যাই পড়ালেখা। বাবা-মা ও স্যাররা আমাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছেন। আমার স্বপ্ন আমি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে চাই। আমি চাই লেখাপড়া শেষ করে মানুষের সেবা করতে। সবাই আমার জন্য আশীর্বাদ করবেন।
পলাশের মা পূর্ণিমা রাণী ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে রয়েছেন চরম উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগে। তিনি বলেন, প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনদের কাছ থেকে হাত পেতে সাহায্য নিয়ে ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছি। অভাবের কারণে ওর বাবা লেখাপড়া করাতে ইচ্ছুক নয়। তার চেয়ে দিনমজুরি করে পরিবারকে সাহায্য করতে বলে সে। ছেলে পড়তে চায় আমিও ছেলেকে পড়াতে চাই কিন্তু একদিকে সংসারের অভাব-অনটন, অপরদিকে ছেলের পড়ালেখা, দুই দিক সামাল দিতে পারছি না। সহায়তা না পেলে ছেলেটার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যাবে, এটা ভাবলেই বুকটা ফেটে যায়।
পলাশের বাবা সুধাংশু চন্দ্র রায় জানান, আমি দিন আনি দিন খাই, আমার কোনো সামর্থ্য নাই। তারপরও আমার ছেলেটা খুব কষ্ট করে লেখাপড়া করেছে। আমি বাদ দিতে বলছি, সে বাদ দেয় নাই। অনেক কষ্টে ছেলেটা লেখাপড়া করে পরীক্ষায় পাশ করছে। আমি সবার কাছে সাহায্য চাই ছেলেটা যেন লেখাপড়া করতে পারে।
বড়ভিটা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শরীফ উদ্দিন বলেন, পলাশ চন্দ্র রায় অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের মেধাবী সন্তান। তার বাবা দিনমজুর। পলাশের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং শিক্ষকদের সহযোগিতায় সে এবার জিপিএ-৫ পেয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তার ভবিষ্যৎ লেখাপড়া চালিয়ে যেতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও বৃত্তবানরা পাশে দাঁড়ালে তার পড়াশোনার পথ সুগম হবে।
