চট্টগ্রামে গ্রেফতার বিদেশি প্রতারক চক্রের আস্তানা ছিল কক্সবাজারেও
Advertisement
আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩৫ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শুধু চট্টগ্রামে নয়, চট্টগ্রামে গ্রেফতার আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের সদস্যদের কক্সবাজারেও একটি আস্তানা ছিল। দুই জায়গায় বসেই তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত।
এই অপকর্মের তদন্ত করতে গিয়ে ‘কেঁচো খুঁড়তে যেন সাপ বের হয়ে আসছে।’ এটি কোকেন মামলার তদন্ত করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক এই প্রতারক চক্রের সন্ধান পায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর চক্রের সদস্যদের গ্রেফতারে অভিযানে নামে পুলিশের বিশেষ টিম কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট (সিটিইউ) ও খুলশি থানা পুলিশ।
কেবল বিদেশি নাগরিকরা নয়; এই চক্রের মূল হোতা বাংলাদেশেরই একজন নাগরিক। তার নাম মোহাম্মদ মহসিন। শনিবার রাতে খুলশি এলাকা থেকে পুলিশের একটি টিম তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
মহসিনের পেছনে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা সেটিও তদন্ত করছে পুলিশ।
মহসিনের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। তিনি চট্টগ্রাম নগরীর কর্ণফুলী এলাকায় একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেন। ৬৩ বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে তার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। এই মহসিনের মাধ্যমেই খুলশিতে আটতলা ভবনটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্টও তার কাছে জমা ছিল। তাকে ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে খুলশি থেকে ৬৩ বিদেশি নাগরিকের কাছ থেকে যেসব ডিভাইস উদ্ধার করা হয়েছিল সেসব ডিভাইস ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য সিআইডির ল্যাবে পাঠানো হয়েছে।
খুলশি থানা পুলিশ জানায়, মহসিনের বিরুদ্ধে ১১৮ গ্রাম কোকেন সংক্রান্ত একটি মামলা ছিল। ওই মামলা তদন্ত করতে গিয়ে চক্রের সন্ধান মেলে। গ্রেফতার মহসিনকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে চালান দেওয়া হয়েছে। তাকে ৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়েছে। রিমান্ডে ৬৩ বিদেশি নাগরিকের ব্যাপারেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। মহসিনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে ৮-৯ জন বিদেশি নাগরিকের পাসপোর্টের ছবি পাওয়া গেছে। সেই ৬৩ বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায়ও মহসিনকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন জানানো হবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে বিদেশিরা দেশে বৈধভাবে প্রবেশ করে অবৈধভাবে বসবাস করতেন শুধু ঢাকা ও তার আশপাশে। কিন্তু ঢাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপর থাকায় তারা চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে আস্তানা গাড়েন। কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে ঢাকার তুলনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কিছুটা কম। এছাড়া এই দুই শহরে যোগাযোগের সুবিধা রয়েছে। পাশাপাশি নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাও শক্তিশালী।
গত ২৫ আগস্ট কক্সবাজারের রামুর হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট থেকে চীনের পাঁচজন এবং তাইওয়ানের এক নাগরিককে গ্রেফতার করে পুলিশ। তারাও সংঘবদ্ধ অনলাইন প্রতারক চক্রের সদস্য। তাদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি পুরোনো মডেলের আইফোন, ৫০টি মনিটর, ৪৪টি সিপিইউসহ বিভিন্ন ডিভাইস এবং চীনা পুলিশের দুটি র্যাংক ব্যাজ, পুলিশের লোগোযুক্ত টাই এবং চীনের দুটি জাতীয় পতাকা উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় রামু থানা পুলিশ মামলা দায়ের করে। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে- অভিযানের বিষয়টি টের পেয়ে সেখানে থাকা চীনা ও তাইওয়ানের আরও অনেক নাগরিক রিসোর্টের পেছনের খোলা সৈকত এলাকা দিয়ে পালিয়ে যান। ওই রিসোর্ট থেকে উদ্ধার করা সরঞ্জামগুলোর মধ্যে ছয়টি ‘সাউন্ডপ্রুফ’ কক্ষও রয়েছে।
এ ঘটনায় রামু থানার পুলিশ পরিদর্শক মিন্টু দত্ত বাদী হয়ে গ্রেফতার ছয়জনসহ ২৫০ থেকে ৩০০ জনের বিরুদ্ধে সাইবার আইনে মামলা দায়ের করেন।
এরপর শুক্রবার খুলশির কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের একটি আটতলা ভবনে অভিযান চালায় সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও খুলশি থানা পুলিশ। অভিযানে ৬৩ বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে লাওসের ৩৫ জন, চীনের ৫ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, নেপাল ও ভিয়েতনামের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। তাদের কাছ থেকে ১৩৪টি মোবাইল ফোন ও ৫৭টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকৃত ডিভাইসগুলো ফরেনসিক পরীক্ষায়: চট্টগ্রামে বিদেশি নাগরিক কাছ থেকে উদ্ধার ডিভাইসগুলো অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে। এসব মোবাইল থেকে কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, কী কী তথ্য আদান প্রদান করা হয়েছে, কোন কোন ধরনের তথ্য আদান প্রদান করা হয়েছে তা বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া এসব ডিভাইস ব্যবহার করে সোশ্যাল মিডিয়া ও অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, আইডি হ্যাকিং ও অর্থ দাবি, বিনিয়োগ ও লটারি প্রতারণা, ফেক ইনভেস্টমেন্ট স্ক্যাম, চাকরি ও প্রবাস বা কাজের প্রলোভনে ভুয়া চাকরির অফার এবং রোমান্স স্ক্যাম ও হানি ট্র্যাপের মাধ্যমে প্রেমের ফাঁদ পাতা হয়েছিল কিনা তা শনাক্ত করা হচ্ছে।
খুলশি থানার ওসি আবদুর রহিম যুগান্তরকে জানান, দেশীয় মূলহোতা মহসিনকে একটি মাদক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। আদালত রিমান্ড মঞ্জুর করলে তাকে বিদেশি নাগরিকের বাংলাদেশে অবস্থান করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে তার পরিচয় কিভাবে, তারা কী কী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে সে ব্যাপারেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। দেশীয় আর কেউ জড়িত রয়েছে কিনা সেই ব্যাপারটিও রয়েছে।
