আয়ের উৎস নেই, কিন্তু রাজকীয় জীবনযাপন তাদের
Advertisement
মো. সাহীন ইসলাম, লালপুর (নাটোর)
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নাটোরের লালপুর উপজেলাটি এখন দেশজুড়ে ইমো, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাকিংসহ অনলাইন প্রতারণার এক নীরব ও ভয়ঙ্কর ট্রেন্ডিং জোনে পরিণত হয়েছে। পড়াশোনার প্রাথমিকের গণ্ডিও না পেরোনো শত শত তরুণ ও যুবক এখন এ প্রতারণার সঙ্গে জড়িত হয়ে রাজকীয় জীবনযাপন।
সরজমিনে জানা গেছে, এই অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িত তরুণদের সিংহভাগেরই দৃশ্যমান কোনো আয়ের উৎস নেই। কিন্তু তাদের লাইফস্টাইল দেখলে যে কারো চোখ কপালে উঠবে। গ্রামের মেঠোপথের ধারে তারা তৈরি করেছেন আধুনিক স্থাপত্যের চোখ ধাঁধানো আলিশান বাড়ি আর প্রশাসনের ওপর নজরদারি রাখতে এসব বাড়ির বিভিন্ন সাইটে বসানো হয়েছে একাধিক সিসি ক্যামেরা।
শুধু তাই নয়, এই তরুণদের প্রায় সবার কাছেই রয়েছে নামী ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল, মোবাইল ফোন ও স্টাইলিশ পোশাক জুতা। কোনো পরিশ্রম ছাড়া, রাতারাতি ধনী হওয়ার এই অন্ধ জগতের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছে স্থানীয় কিশোর ও যুবকদের একটা বড় অংশ। আর তাদের এই রাজকীয় জীবনযাপনের পেছনের বিপুল অর্থের জোগান আসছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে থাকা লাখ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশিদের রক্ত পানি করা রেমিট্যান্সের টাকা থেকে। প্রবাসীদের টাকাতেই মূলত গড়ে উঠছে হ্যাকারদের এই বিলাসবহুল অট্টালিকা।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, রাতারাতি ধনী হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতাকে ইতিবাচক কাজে না লাগিয়ে অপরাধে রূপ দেওয়ার মানসিকতাই এর জন্য দায়ী। অল্প বয়সে বিপুল অর্থের মালিক হয়ে যাওয়ার কারণে এই হ্যাকারদের অনেকেই মাদক কারবার এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা হয় একজন অনলাইন প্রতারকের (ইমো হ্যাকার) সঙ্গে। তিনি জানান, এই ডিজিটাল অপরাধী চক্রের মূল টার্গেট প্রবাসীরা। তারা মূলত কয়েকটি ধাপে এই প্রতারণা চালায়। চক্রের তরুণ সদস্যরা সুন্দর কোনো মেয়ের ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ফেসবুক বা ইমো অ্যাকাউন্ট খোলে। এরপর টার্গেট করা প্রবাসীকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে শুরু হয় মিষ্টি আলাপ ও প্রেমের অভিনয়। গভীর সম্পর্কের একপর্যায়ে ভিডিও কলে কথা বলার লোভ দেখিয়ে কিংবা কোনো অ্যাপ ইন্সটল করার অজুহাতে কৌশলে প্রবাসীর মোবাইলে একটি কোড পাঠানো হয়।
ইমো অ্যাকাউন্ট সচল করার সেই ওটিপি কোডটি প্রবাসীর কাছ থেকে কৌশলে জেনে নিলেই তার ইমো অ্যাকাউন্টের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় হ্যাকারদের হাতে। এরপর শুরু হয় তাদের অর্থ হাতানো প্রবাসীর ইমো আইডি হ্যাক করার পর হ্যাকাররা তার বাংলাদেশে থাকা মা, বাবা, স্ত্রী বা ভাইয়ের আইডিতে মেসেজ পাঠায়।
প্রবাসীর কণ্ঠ বা বাচনভঙ্গি নকল করে তারা বলে— ‘আমি খুব বিপদে পড়েছি, পুলিশ ধরেছে’ কিংবা ‘হাসপাতালে আছি, জরুরি অপারেশন লাগবে, এখনই এই বিকাশ নম্বরে টাকা দাও।’ দেশের মাটিতে থাকা স্বজনরা প্রবাসীর বিপদের কথা শুনে মুহূর্তের মধ্যে হ্যাকারদের দেওয়া বিকাশ বা নগদ নাম্বারে হাজার হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন।
বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের সাইফুল ইসলাম বলেন লালপুর উপজেলার লালপুর সদর, বিলমাড়িয়া, দুড়দুড়িয়া, পার্শ্ববর্তী বাঘা উপজেলার বেশ কিছু এলাকা এসব প্রতারকদের ভয়ঙ্কর ট্রেন্ডিং জোনে পরিণত হয়েছে।
দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের লালন আলী বলেন, এই প্রতারকদের সিংহভাগ মাদকাসক্ত, এবং এদের কেন্দ্র করে এই এলাকাগুলোতে গড়ে উঠছে মাদক ক্রয় বিক্রয়সহ বিভিন্ন অসামাজিক অপরাধের সিন্ডিকেট।
উপজেলা নওপাড়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, যেসব ছেলেদের বাবা কৃষিকাজ বা দিনমজুরি না দিলে এক বেলা ভাত জুটত না সেসব ছেলেদের এখন রাজকীয় বাড়ি গাড়ি খাওয়া দাওয়া এবং চলাফেরা দেখলে চোখ কপালে ওঠার মতো।
তবে একাধিক এলাকাবাসী বলেছেন, বর্তমান ওসি আসার পর তাদের দৌরাত্ম্য কিছুটা কমেছে। তাদের কাছে ওসি এখন আতংক।
লালপুর থানার ওসি মো. শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, গত ছয় মাসে লালপুর থানা পুলিশ ধারাবাহিকভাবে সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত প্রায় ৫০টি অভিযান চালিয়ে ৭৬ জন হ্যাকার ও প্রতারককে গ্রেফতার করেছে এবং সাইবার সুরক্ষা আইনে ২৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, উদ্ধার করা হয়েছে বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের ডজন ডজন ভুয়া বা বেনামি সিম কার্ড এবং অপরাধে ব্যবহৃত আধুনিক অ্যান্ড্রয়েড ফোন।
তিনি আরও বলেন, কেবল পুলিশি অভিযান দিয়ে এই সাইবার অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ। বিশেষ করে প্রবাসীদের ইমো বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো অজানা লিংকে ক্লিক না করা এবং ওটিপি কোড বা পাসওয়ার্ড কারো সঙ্গে শেয়ার না করার বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।
