একচালা ঘরের পাঠশালার সেই বিনা বেতনের শিক্ষক পেলেন রাষ্ট্রীয় সম্মাননা
Advertisement
আগৈলঝাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৩৮ পিএম
বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে রমণী কান্ত বেপারীর গলায় মেডেল পরিয়ে দেওয়া হয় এবং নগদ দুই লাখ টাকার চেক ও সম্মাননা সনদ তুলে দেওয়া হয়।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তিন প্রজন্মের শিক্ষার্থীর হাতেখড়ি একই শিক্ষকের কাছে। বয়সের ভারে শরীর ন্যুজ হলেও শিক্ষা দেওয়ার নেশায় এখনো ক্লান্ত হননি তিনি। নেই আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চ কিংবা কোনো বেতনভুক্ত শিক্ষক। মন্দিরের আঙিনায় টিনের একচালা ছোট্ট ঘরই তার পাঠশালা। সরকারি কোনো অনুদানও পাননি। তবুও প্রায় ৬০ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে গ্রামের শিশুদের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের রাংতা গ্রামের রমণী কান্ত বেপারী।
দীর্ঘ সময় পর হলেও শিক্ষা ক্ষেত্রে তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার। সোমবার (৫ অক্টোবর) ঢাকার আব্দুল গনি রোডের ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাকে সম্মাননা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে রমণী কান্ত বেপারীর গলায় মেডেল পরিয়ে দেওয়া হয় এবং নগদ দুই লাখ টাকার চেক ও সম্মাননা সনদ তুলে দেওয়া হয়।
রমণী কান্ত বেপারী জীবনের দীর্ঘ সময় উৎসর্গ করেছেন গ্রামের দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের শিশুদের পড়াশোনা শেখাতে। রাংতা গ্রামের রাখাল বেপারীর ছেলে রমণী কান্ত ছাত্রজীবনেই এলাকার দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পড়ানো শুরু করেন। সময়টা ছিল স্বাধীনতারও আগে। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের পড়ানোর যে পথচলা শুরু করেছিলেন, বয়স ৭০ পেরিয়ে গেলেও তা থামেনি।
১৯৭৩ সালে চাঁদশী ঈশ্বরচন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক (এসএসসি) পাস করে সরকারি গৌরনদী কলেজে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। মেধাবী হওয়ায় সে সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরির সুযোগ পেলেও তা গ্রহণ করেননি। গ্রামের শিশুদের প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকে চাকরির পরিবর্তে তাদের পড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। এরপর কেটে গেছে প্রায় ছয় দশক।
রাজিহার-চাঁদশী সড়কের পাশে রাংতা সার্বজনীন দুর্গা মন্দিরের আঙিনাই হয়ে উঠেছে তার পাঠশালা। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘রমণী কান্তের পাঠশালা’ নামে পরিচিত। শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত চলে পাঠদান। বর্তমানে ২০ থেকে ২৫ জন শিশু নিয়মিত তার কাছে পড়াশোনা করছে। পাঠদান শেষে তিনি নিজেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেন।
দীর্ঘ এই সময়ে তার কাছে পড়াশোনা করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এলাকার অসংখ্য শিক্ষার্থী। তাদের কেউ দেশের বিভিন্ন স্থানে চাকরি করছেন, কেউ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। একসময় যেসব শিক্ষার্থীর বাবা রমণী কান্তের কাছে পড়েছেন, পরবর্তী সময়ে তাদের সন্তানরাও একই পাঠশালায় পড়েছে। এখন সেই পরিবারের নাতি-নাতনিরাও তার কাছে হাতেখড়ি নিচ্ছে।
এই পাঠশালায় পড়াশোনার জন্য কোনো মাসিক বেতন দিতে হয় না। শিক্ষার বিনিময়ে অর্থ নেন না রমণী কান্ত। গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যাতে অর্থের অভাবে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যেই বছরের পর বছর ধরে শিশুদের পড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।
রমণী কান্তের ব্যক্তিগত জীবনও অত্যন্ত সাদামাটা। স্ত্রী রুম্পাকে নিয়ে টিনের দোচালা ঘরে বসবাস করেন। একমাত্র ছেলে তাপস বেপারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। নিজের কিছু কৃষিজমিও রয়েছে। সরকারি তেমন কোনো সহায়তা না পেলেও তার নামে রয়েছে বয়স্ক ভাতার কার্ড। অভাব-অনটনের মধ্যেও শিশুদের পড়ানোর আনন্দই তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
রমণী কান্ত বেপারী বলেন, স্বাধীনতার আগে থেকেই এখানে বসে এলাকার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের পাঠদান করে আসছি। যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন যেন এভাবেই শিশুদের কিছু শিক্ষা দিয়ে যেতে পারি। প্রধানমন্ত্রী আমাকে যে সম্মান ও সম্মাননা দিয়েছেন, এতে আমার শিক্ষকজীবন সার্থক হয়েছে। বাকি জীবনটাও মন্দিরের আঙিনায় শিশুদের শিক্ষাদান করেই কাটাতে চাই।
রাংতা সার্বজনীন দুর্গা মন্দির কমিটির সভাপতি রনজিত বৈদ্য বলেন, স্বাধীনতার আগে থেকেই রমণী কান্ত এখানে শিশুদের পাঠদান করে আসছেন। তার কারণে এলাকার অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের ছেলে-মেয়েরা বিনা খরচে পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে।
রমণী কান্তের কাছে পড়তে আসা শিক্ষার্থী সমৃদ্ধি, অর্ক, বিক্রম, নির্জয় ও তাবাসুম জানায়, এই পাঠশালায় পড়তে তাদের ভালো লাগে। স্যার পড়াশোনার পাশাপাশি ছড়া ও গল্প বলেন এবং তাদের অনেক আদর করেন।
অভিভাবক শ্যামল বেপারী, মালা বালা ও রেনুকা বেপারী বলেন, আমাদের বাবা-মা রমণী স্যারের কাছে পড়েছেন, আমরাও পড়েছি, এখন আমাদের সন্তানরাও তার কাছে পড়ছে। তিনি অত্যন্ত যত্ন নিয়ে শিশুদের পড়ান। এক-দুই দিন কোনো শিশু পাঠশালায় না এলে তিনি খোঁজ নিতে বাড়িতে চলে যান।
আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিরুপম মজুমদার বলেন, বরিশাল জেলা প্রশাসকের নির্দেশে রমণী কান্তের পাঠশালায় সরেজমিনে গিয়েছিলাম। শিশুদের পাঠদান দেখে আমার খুব ভালো লেগেছে। রমণী কান্ত বেপারী একজন ভালো মানুষ। তার মতো মানুষ সমাজে আছেন বলেই আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

-6ac50d4d49263.jpg)
-6ac4e7a571a69.jpg)