অবশেষে সেই মায়ের দায়িত্ব নিলেন ছেলে
Advertisement
সাঁথিয়া (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বৃদ্ধা মাকে নিজের সঙ্গে রাখতে অস্বীকৃতি জানানো পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার সেই গ্রামপুলিশ সদস্য সাগর হোসেন অবশেষে মায়ের দায়িত্ব নিতে রাজি হয়েছেন।
আদালত ও সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) যৌথ উদ্যোগে মায়ের ভরণপোষণসহ সব দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন তিনি। একই সঙ্গে নিজের ভুল বুঝতে পেরে মা ও দেশবাসীর কাছে প্রকাশ্য ক্ষমা চেয়েছেন সাগর।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সেলিম আহমেদের উপস্থিতিতে তার কার্যালয়ে সাগর হোসেন ও তার মা মুন্নি খাতুনের মধ্যকার বিরোধের আনুষ্ঠানিক সমাধান করা হয়।
সমাধান শেষে মা ও ছেলে একে অপরকে মিষ্টিমুখ করান। এ সময় সাগরের মামা জাকির হোসেন ও খালু মাসুদ রানা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে রোববার (১১ অক্টোবর) দৈনিক যুগান্তরের প্রথম পাতায় ‘টাকা চাই না, তোর সঙ্গে রাখ বাবা’ শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সংবাদটি প্রকাশের পরই বিষয়টি আদালতের নজরে আসে।
প্রতিবেদনটি দেখে আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে রোববার বিকালেই সাঁথিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আনিসুর রহমানকে অভিযুক্ত ছেলে ও তার মাকে নিয়ে পাবনা আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশ পেয়ে ওসি নিজে গাড়িতে করে মা ও ছেলেকে পাবনা আদালতে নিয়ে যান।
পাবনা চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সাঁথিয়া থানার আমলি আদালতে মা ও ছেলের বক্তব্য শোনার পর বিচারক তাদের মধ্যকার পারিবারিক বিরোধের সুষ্ঠু সমাধান করে দেন।
আদালতে নিজের ভুল বুঝতে পেরে মায়ের সঙ্গে করা পূর্বের আচরণের জন্য গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করেন সাগর। পরে তিনি মায়ের যাবতীয় ভরণপোষণের দায়িত্ব নিতে সম্মত হন এবং ভবিষ্যতে কখনো মায়ের সঙ্গে এমন দুর্ব্যবহার করবেন না বলে আদালতকে প্রতিশ্রুতি দেন। একই সঙ্গে নিজের মা ও দেশবাসীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তিনি।
অভিযুক্ত সাগর হোসেন সাঁথিয়া উপজেলার নাগডেমরা ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামের প্রয়াত সিরাজুল ইসলামের ছেলে। তিনি নাগডেমরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) গ্রামপুলিশ সদস্য হিসেবে কর্মরত আছেন।
এর আগে গত ৮ অক্টোবর সাগর ও তার মায়ের মধ্যকার বিরোধ ও ভরণপোষণসংক্রান্ত একটি শুনানিতে ইউএনও কার্যালয়ে উপস্থিত ছিলেন উভয়পক্ষ। সেখানে ইউএনও সেলিম আহমেদ তাকে মায়ের দায়িত্ব নেওয়ার নির্দেশ দিলে তিনি মাকে সঙ্গে না রাখার বিষয়ে অনড় থাকেন।
একপর্যায়ে তিনি ইউএনওকে বলেন, মাকে আমার সঙ্গে দিলে আমি সুইসাইড করব। আমি মাকে সঙ্গে রাখতে পারব না। স্যার, আপনি বলে দেন আমি মাকে মাসে কত টাকা দেব।
এ নিয়ে সেখানে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং ঘটনার ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
অবশেষে ছেলের কাছে আশ্রয় পেয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সাগরের মা বৃদ্ধা মুন্নি খাতুন বলেন, আমার ছেলে ভুল বুঝে আমাকে অনেক কথা বলেছিল। এখন সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে। আমি শুধু আমার ছেলেকে কাছে চেয়েছিলাম, ছেলেকে পেয়েছি—আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। ছেলের সব ভুল আমি মাফ করে দিয়েছি। দেশবাসীও যেন আমার ছেলেকে ক্ষমা করে দেন। এখন আমি ছেলের বাড়িতে ফিরে এসেছি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ওর কাছেই থাকতে চাই। মা হিসেবে এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া।
অনুতপ্ত সাগর হোসেন বলেন, মা ইউএনও স্যারের কাছে ভরণপোষণের অভিযোগ করায় ক্ষোভ, অভিমান ও আবেগপ্রবণ হয়ে আমি অনেক কথা বলে ফেলেছিলাম। স্যারের কথা না শুনে মাকে টাকা দিতে চাইলেও সঙ্গে রাখতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম, এমনকি সুইসাইড করার কথাও বলেছিলাম। পরে ওসি স্যার আমাদের আদালতে নিয়ে যান। আদালতের বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। আমি অত্যন্ত অনুতপ্ত। এখন থেকে মাকে নিজের কাছে রেখেই সেবাযত্ন ও ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করব। আমি আমার মা ও দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাই।
এ বিষয়ে সাঁথিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আনিসুর রহমান বলেন, আদালতের নির্দেশে মা ও ছেলেকে গাড়িতে করে আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের বিচারক উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনে সুন্দরভাবে বিষয়টি মীমাংসা করে দেন। এরপর বৃদ্ধা মা ও ছেলেকে নিরাপদে তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তাদের বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।
সাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার সেলিম আহমেদ বলেন, বিজ্ঞ আদালত ও আমাদের যৌথ প্রচেষ্টায় সাগর হোসেন ও তার মা মুন্নি খাতুনের মধ্যকার বিরোধের অবসান হয়েছে। সাগর নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চেয়েছেন। এখন থেকে তারা একসঙ্গেই থাকবেন এবং ছেলে তার মায়ের সার্বিক ভরণপোষণ করবেন। আশা করছি তারা মিলেমিশে শান্তিতে থাকবেন। এই মানবিক কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরে ভালো লাগছে। এজন্য আদালতকে ধন্যবাদ জানাই এবং বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরার জন্য সাংবাদিকদেরও সাধুবাদ জানাই।
