ক্যানসারের বিরুদ্ধে আশার আলো দেখাচ্ছে যে ভিটামিন
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভিটামিন বি৩ শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি পরিচিত পুষ্টি উপাদান। কিন্তু এই সাধারণ ভিটামিনই এবার নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে মস্তিষ্কের অন্যতম ভয়ংকর ক্যানসার গ্লিওব্লাস্টোমার চিকিৎসায়।
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির গবেষকদের প্রাথমিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত চিকিৎসার সঙ্গে উচ্চমাত্রার ভিটামিন বি৩ বা নিয়াসিন যুক্ত করলে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ক্যানসার কিছু সময় নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে। ছোট পরিসরের একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ছয় মাস পর ৮২ শতাংশ রোগীর ক্যানসার নতুন করে বাড়েনি।
তবে গবেষকেরাই বলছেন, এই ফলাফল এখনো প্রাথমিক। চিকিৎসায় ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে আরও বড় পরিসরে গবেষণা ও নিরাপত্তা যাচাই প্রয়োজন।
যে ক্যানসারের চিকিৎসা কঠিন
গ্লিওব্লাস্টোমা প্রাপ্তবয়স্কদের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক মস্তিষ্কের ক্যানসারগুলোর একটি। সাধারণত অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির সমন্বয়ে এর চিকিৎসা করা হয়। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে যতটা সম্ভব টিউমার অপসারণের চেষ্টা করা হলেও ক্যানসার কোষ আশপাশের সুস্থ মস্তিষ্কের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে পুরোপুরি অপসারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। চিকিৎসার পরও অনেক ক্ষেত্রে ক্যানসার আবার ফিরে আসে। দীর্ঘদিন ধরে এই ক্যানসারের রোগীদের বেঁচে থাকার হারেও বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি।
কেন ভিটামিন বি৩?
গবেষকদের ধারণা, গ্লিওব্লাস্টোমা শুধু মস্তিষ্কের টিউমার তৈরি করে না, শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে দিতে পারে। ফলে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করার কথা যেসব প্রতিরোধী কোষের, সেগুলোও ঠিকমতো কাজ করতে পারে না।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির গবেষকেরা পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছেন, উচ্চমাত্রার নিয়াসিন এসব দুর্বল হয়ে পড়া রোগপ্রতিরোধী কোষকে আবার সক্রিয় করতে পারে কি-না।
গবেষক উই ইয়ংয়ের নেতৃত্বে ইঁদুরের ওপর করা আগের পরীক্ষায় নিয়াসিন ব্যবহারে প্রাণীদের বেঁচে থাকার সময় বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেই ফলাফলের ভিত্তিতেই মানুষের ওপর সম্মিলিত ফেজ-১ ও ফেজ-২ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করা হয়।
২৪ রোগীর ফলাফলে আশার ইঙ্গিত
বর্তমান গবেষণায় প্রচলিত কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির পাশাপাশি নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় নিয়াসিন দেওয়া হচ্ছে। গবেষণার একটি লক্ষ্য হলো কতটা মাত্রা নিরাপদে ব্যবহার করা যায়, তা নির্ধারণ করা। একই সঙ্গে দেখা হচ্ছে, নিয়াসিন যুক্ত করলে রোগের অগ্রগতি ঠেকিয়ে রাখার সময় বাড়ে কি-না।
এই সময়কে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘প্রগ্রেশন-ফ্রি সারভাইভাল’। গবেষণা শুরুর আগে বিজ্ঞানীরা একটি সীমা নির্ধারণ করেছিলেন। পুরোনো গবেষণার তুলনায় ছয় মাসে ক্যানসারের অগ্রগতি ঠেকিয়ে রাখার হার অন্তত ২০ শতাংশ উন্নত না হলে ট্রায়াল বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
তবে প্রথম ২৪ রোগীর ফল সেই সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ছয় মাস পর ৮২ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে ক্যানসারের অগ্রগতি দেখা যায়নি। গবেষকদের হিসাবে, আগের গবেষণার তুলনায় এটি ২৮ শতাংশ বেশি।
‘যতটা সম্ভব সাহায্য করা উচিত’
গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ক্যানসার বিশেষজ্ঞ গ্লোরিয়া রোলদান উর্গোইতি বলেন, গ্লিওব্লাস্টোমা প্রাপ্তবয়স্কদের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক মস্তিষ্কের ক্যানসারগুলোর একটি। দীর্ঘ সময় ধরে এর চিকিৎসার ফলাফলে বড় পরিবর্তন আসেনি। তাই সম্ভাবনাময় যেকোনো চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন, তবে তা অবশ্যই কঠোর প্রটোকল ও নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে করতে হবে।
গবেষণায় অংশ নেওয়া ৫৫ বছর বয়সী এডওয়ার্ড ওয়াল্ডনারের ক্ষেত্রেও এই পরীক্ষাটি নতুন আশার সুযোগ তৈরি করেছে। দীর্ঘদিন ক্লান্তি ও হাঁটার ধরনে পরিবর্তন দেখা দেওয়ার পর পরীক্ষা করে তার মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ে। পরে জানা যায়, সেটি গ্লিওব্লাস্টোমা।
অস্ত্রোপচারের পর ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান তিনি। এখন নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসকেরা যখন তার স্ক্যানের ফলকে ‘স্থিতিশীল’ বলেন, সেটিই তার জন্য স্বস্তির খবর।
ভিটামিন বলেই ঝুঁকিমুক্ত নয়
গবেষকেরা বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন, ভিটামিন বি৩ সাধারণভাবে পরিচিত ও সহজলভ্য হলেও উচ্চমাত্রায় এটি নিজের ইচ্ছায় গ্রহণ করা নিরাপদ নয়। বেশি পরিমাণ নিয়াসিন শরীরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিষক্রিয়ার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে তাই চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট মাত্রায় ও নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে নিয়াসিন দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষকে গবেষণার ফল দেখে নিজে থেকে উচ্চমাত্রার ভিটামিন বি৩ সেবন না করার পরামর্শই দেওয়া হচ্ছে।
গবেষকেরা মোট ৪৮ জন রোগীকে এই ট্রায়ালে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করেছেন। ২০২৬ সালের শেষ দিকে অথবা ২০২৭ সালের শুরুর দিকে গবেষণার চূড়ান্ত বিশ্লেষণ করার কথা রয়েছে।


-6ac0cc8945e25.jpg)