Logo
Logo
×

Advertisement

ডাক্তার আছেন

কথার সময় বাবা-মায়ের মুখ স্পর্শ শিশুর, এর পেছনে থাকতে পারে যে কারণ

Advertisement

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৬ পিএম

কথার সময় বাবা-মায়ের মুখ স্পর্শ শিশুর, এর পেছনে থাকতে পারে যে কারণ

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

শিশু বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলার সময় বারবার তাদের মুখে হাত দেয়, গালে হাত রাখে, ভ্রু স্পর্শ করে, থুতনি ধরে বা নাকে আলতো করে টোকা দেয়। অনেক বাবা-মা এটিকে শিশুর দুষ্টুমি বা অস্থিরতা হিসেবে দেখেন। তবে মনোবিজ্ঞান ও শিশুর বিকাশ নিয়ে গবেষণা বলছে, এমন আচরণের পেছনে যোগাযোগ, ঘনিষ্ঠতা, নিরাপত্তা কিংবা মনোযোগ ধরে রাখার মতো কারণ থাকতে পারে।

তবে গবেষণায় এমন কোনো প্রমাণ নেই যে বাবা-মায়ের মুখ স্পর্শ করা প্রতিটি শিশুর একই ধরনের অনুভূতি প্রকাশ করে। আচরণটির অর্থ নির্ভর করে পরিস্থিতি ও শিশু-পিতামাতার পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর।


কথা ও স্পর্শ একই যোগাযোগ

সাইন্স ডিরেক্ট জার্নালে প্রকাশিত ‘রিভিউ অব রিসার্চ অন স্যোসাল টাচ অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট’ নিবন্ধে বলা হয়েছে, ছোট শিশুদের যোগাযোগ শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কথা বলার সময় তারা বাবা-মায়ের গায়ে হেলান দিতে পারে, হাত ধরে রাখতে পারে, কাছে বসতে পারে কিংবা চুল নিয়ে খেলতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে স্পর্শও যোগাযোগের স্বাভাবিক অংশ হয়ে ওঠে।

সামাজিক স্পর্শ ও মানব বিকাশ নিয়ে গবেষণার একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, স্পর্শ মানুষের সংযুক্তি, যোগাযোগ, সামাজিক শেখা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে শৈশবের প্রথম দিকে শিশুর মস্তিষ্ক ও সামাজিক সম্পর্ক দ্রুত বিকশিত হওয়ার সময়ে এর গুরুত্ব বেশি।

তাই কথা বলার সময় কোনো শিশু বাবা-মায়ের মুখে হাত দিলে একটি সম্ভাবনা হলো, সে স্পর্শের মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগের ঘনিষ্ঠতা ধরে রাখতে চাইছে।

মুখ কেন গুরুত্বপূর্ণ

শিশুর কাছে বাবা-মায়ের মুখ সামাজিক তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। মা হাসছেন কি-না, বাবা বিরক্ত কি-না, তার কথা শুনছেন কি-না কিংবা তার বলা গল্পে আনন্দ পাচ্ছেন কি-না, এসব বোঝার জন্য শিশু মুখের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে।

একটি গবেষণায় ৪ থেকে ৬ বছর বয়সি ৩৯ শিশু ও তাদের মায়ের খেলাধুলার সময় পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, মায়ের বেশি স্পর্শের সঙ্গে শিশুদের সামাজিক তথ্য, বিশেষ করে মুখের দিকে মনোযোগ দেওয়ার প্রবণতার সম্পর্ক রয়েছে।

তবে গবেষণাটি শিশুদের বাবা-মায়ের মুখ স্পর্শ করা নিয়ে ছিল না। ফলে এর ভিত্তিতে বলা যায় না যে মুখে হাত দেওয়ার অর্থ নির্দিষ্ট কোনো অনুভূতি। তবে এটি ইঙ্গিত করে, পরিচর্যাকারীর স্পর্শ শিশুর সামাজিক সংকেতের প্রতি মনোযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।


‘তুমি কি এখনো আমার সঙ্গে আছ?’

শিশু যখন গল্প বলছে, তখন বাবা-মা হয়তো রান্না করছেন, ফোন দেখছেন বা কম্পিউটারে কাজ করছেন। এমন পরিস্থিতিতে শিশু কথা বলতে বলতে আরও কাছে আসতে পারে, একই কথা বারবার বলতে পারে কিংবা বাবা-মায়ের মুখে হাত দিতে পারে।

এটিকে সরাসরি ‘মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা’ বলা ঠিক নয়। তবে শিশু নিজের প্রয়োজন সরাসরি ভাষায় প্রকাশ করতে না পেরে বিভিন্ন আচরণের মাধ্যমে বাবা-মায়ের মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারে।

এ ক্ষেত্রে মুখে হাত দেওয়া মুখের প্রতি বিশেষ আগ্রহের চেয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার একটি উপায়ও হতে পারে।

স্পর্শে নিরাপত্তার অনুভূতি

বাবা-মায়ের স্পর্শ শিশুর নিরাপত্তাবোধের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। ১৩৮টি অভিভাবক-শিশু জুটিকে নিয়ে একটি গবেষণায় দেখা হয়, বাবা-মায়ের সংক্ষিপ্ত ও কোমল স্পর্শ সামাজিক হুমকির প্রতি শিশুদের প্রতিক্রিয়ায় কোনো প্রভাব ফেলে কি-না।

গবেষণায় ৮ থেকে ১০ বছর এবং ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সি শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একদল শিশুর বাবা-মাকে সন্তানের কাঁধে হাত রাখতে বলা হয়। অন্য দলের ক্ষেত্রে এমন স্পর্শ দেওয়া হয়নি।

গবেষকরা দেখতে পান, বাবা-মায়ের স্পর্শ শিশুদের সামাজিক হুমকির প্রতি অবচেতন মনোযোগ কমিয়ে দেয়। বেশি সামাজিক উদ্বেগ থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকের স্পর্শের সঙ্গে বেশি আস্থার সম্পর্কও পাওয়া যায়।

তবে এই গবেষণা শিশুর বাবা-মায়ের মুখ স্পর্শ করা নিয়ে নয়। তাই মুখে হাত দেওয়ার অর্থ নিরাপত্তা খোঁজা- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। গবেষণাটি শুধু দেখায়, বিশ্বস্ত বাবা-মায়ের শারীরিক স্পর্শ শিশুর কাছে সামাজিক ও আবেগীয় বার্তা বহন করতে পারে।


নিছক ভালোবাসা

সব আচরণের পেছনে জটিল মনস্তাত্ত্বিক কারণ খোঁজার প্রয়োজন নেই। কোনো শিশু বাবা-মায়ের কোলে উঠে থাকতে পছন্দ করে, কেউ হাত ধরে থাকে, আবার কেউ গালে হাত দেয় বা চুল নিয়ে খেলে।

শিশুর কাছে বাবা-মায়ের মুখ স্পর্শ করা তার নিজস্ব ভালোবাসা প্রকাশের অভ্যাসও হতে পারে। স্নেহপূর্ণ ও ইতিবাচক স্পর্শ বাবা-মা ও সন্তানের বন্ধন এবং পারস্পরিক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট স্পর্শকে সরাসরি কোনো হরমোন বা মস্তিষ্কের বিশেষ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।

শুধুই অভ্যাস?

আবার শিশুর আচরণকে অতিরিক্ত মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। শিশু হয়তো বাবা-মায়ের নাক স্পর্শ করে মজা পায়, গালের নরম অনুভূতি পছন্দ করে কিংবা ভ্রুতে হাত দেওয়ার বিষয়টি তার কাছে কৌতূহলোদ্দীপক।

গবেষণায় বলা হয়, শিশুরা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে মানুষ ও আশপাশের পরিবেশ সম্পর্কে শেখে। তাই বারবার মুখ স্পর্শ করার পেছনে নিছক অভ্যাস বা স্পর্শের প্রতি কৌতূহলও থাকতে পারে।

আচরণটি কখন ঘটছে, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ। স্নেহপূর্ণ কথাবার্তার সময় হলে এটি ঘনিষ্ঠতার অংশ হতে পারে। বাবা-মা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার সময় হলে শিশুটি যোগাযোগ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারে। আবার শিশু ক্লান্ত বা মন খারাপের সময় এমন করলে পরিচিত শারীরিক স্পর্শ থেকে স্বস্তি পাওয়ার বিষয়টিও থাকতে পারে।


বাবা-মায়ের কী করা উচিত

শিশু আলতোভাবে মুখ স্পর্শ করলে এবং এতে বাবা-মায়ের অস্বস্তি না হলে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। বরং আচরণের সময় পরিস্থিতি লক্ষ্য করা যেতে পারে।

শিশুটি কী বলছে, বাবা-মা তখন ফোনে ব্যস্ত কি-না, সে স্কুল থেকে এইমাত্র ফিরেছে কি-না, মন খারাপ কি না বা আনন্দের কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলছে কি না- এসব বিষয় আচরণটির কারণ বুঝতে বেশি সহায়ক হতে পারে।

তবে শিশুকে ব্যক্তিগত সীমারেখার বিষয়টিও শেখানো জরুরি। সে যদি চোখে আঙুল দেয়, ঠোঁট টানে কিংবা ‘না’ বলার পরও স্পর্শ করতে থাকে, তাহলে শান্তভাবে সীমা নির্ধারণ করা উচিত।

বাবা-মা বলতে পারেন, ‘তুমি আমার মুখে হাত দিতে চাও, সেটা বুঝতে পারছি। তবে আলতো করে দাও।’ অথবা, ‘চাইলে আমার হাত ধরতে পারো।’

এভাবে শিশু একই সঙ্গে দুটি বিষয় শিখতে পারে- ভালোবাসা ও ঘনিষ্ঠতা স্বাভাবিক, আবার প্রত্যেকের শরীরের নিজস্ব সীমারেখাও রয়েছে।

আচরণ নয়, সম্পর্কটাই গুরুত্বপূর্ণ

শিশু কেন বাবা-মায়ের মুখে হাত দেয়, তার একক কোনো মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা নেই। বরং আচরণটি কখন এবং কী পরিস্থিতিতে হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শিশু হয়তো কথোপকথনকে শারীরিকভাবে কাছাকাছি রাখতে চাইছে, বাবা-মা তার কথা শুনছেন কি-না তা নিশ্চিত করতে চাইছে, স্নেহ প্রকাশ করছে কিংবা পরিচিত স্পর্শের মাধ্যমে নিজেকে স্বস্তি দিচ্ছে। আবার এমনও হতে পারে, সে শুধু বাবা-মায়ের নাক বা গাল স্পর্শ করতে মজা পাচ্ছে।

তাই শিশুর এই আচরণকে শুধু বিরক্তিকর অভ্যাস হিসেবে না দেখে বাবা-মায়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের একটি ছোট সংকেত হিসেবেও দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে শিশু যদি হাসতে হাসতে, কথা বলতে বলতে এবং আলতোভাবে মুখ স্পর্শ করে কাছে থাকতে চায়, তাহলে সেটি তার নিরাপদ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অংশ হতে পারে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

শিশুদের মেধা বিকাশে সুযোগ দিতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

শিশুদের মেধা বিকাশে সুযোগ দিতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

আপেল কেটে দিলেই কালচে দাগ, যে কৌশলে তাজা থাকবে জেনে নিন

আপেল কেটে দিলেই কালচে দাগ, যে কৌশলে তাজা থাকবে জেনে নিন

গোবিন্দগঞ্জে পানিতে ডুবে ২ শিশুর মৃত্যু

গোবিন্দগঞ্জে পানিতে ডুবে ২ শিশুর মৃত্যু

শিশুখাদ্যের প্যাকেটে মা-শিশুর ছবি নিষিদ্ধ

শিশুখাদ্যের প্যাকেটে মা-শিশুর ছবি নিষিদ্ধ

মাঝরাতে আকাশের দিকে মুখ করে কুকুর কাঁদে কেন?

মাঝরাতে আকাশের দিকে মুখ করে কুকুর কাঁদে কেন?

আইভিএফের সময় যে ৪ বিষয়ে নজর দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞের

আইভিএফের সময় যে ৪ বিষয়ে নজর দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞের

আরও পড়ুন

কথার সময় বাবা-মায়ের মুখ স্পর্শ শিশুর, এর পেছনে থাকতে পারে যে কারণ

কথার সময় বাবা-মায়ের মুখ স্পর্শ শিশুর, এর পেছনে থাকতে পারে যে কারণ

প্রতি ৮টি ক্যানসারের ১টির পেছনে রয়েছে সংক্রমণ, যার অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য

প্রতি ৮টি ক্যানসারের ১টির পেছনে রয়েছে সংক্রমণ, যার অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য

যে ছয় কারণে দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশি হয়

যে ছয় কারণে দীর্ঘস্থায়ী শুকনো কাশি হয়

ডেঙ্গু রোগীর যেসব লক্ষণ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ

ডেঙ্গু রোগীর যেসব লক্ষণ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম