থাইল্যান্ডে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বৈঠক, যেসব বিষয় প্রাধান্য পাবে
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৬ পিএম
ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা হবে। ছবি: রয়টার্স
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ, নজিরবিহীন জ্বালানি সংকট এবং ক্রমবর্ধমান সুদহারের মতো বিষয়গুলোর প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্টরা চলতি সপ্তাহে থাইল্যান্ডে সমবেত হতে যাচ্ছেন। এসব বিষয় এরই মধ্যে ধীরগতির বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট মুদ্রাস্ফীতি ও জনদুর্ভোগ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার আলোচনার মূল বিষয়বস্তু হয়ে উঠবে। তিন বছরের মতো প্রথমবারের মতো ওয়াশিংটনের বাইরে এই সভা হতে যাচ্ছে। খবর রয়টার্সের।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, এবারের সভায় মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট থাকছেন না। দেশের অভ্যন্তরীণ কাজে ব্যস্ত থাকায় নিজের পরিবর্তে দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে পাঠাচ্ছেন তিনি।
মার্কিন অর্থমন্ত্রীর এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন এড়ানোর সিদ্ধান্ত অন্য দেশের প্রতিনিধিদের হতাশ করতে পারে। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখন তার এই অনুপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা রয়টার্সকে বলেছেন, ইরান যখন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহের পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি আশঙ্কার চেয়ে ভালো অবস্থায় ছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি আবার চাপের মুখে পড়ছে। ডিজেলের আকাশচুম্বী দাম, সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং আসন্ন সুপার এল নিনো—এখন একই সময়ে আঘাত হানছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপে জি-৭ দেশগুলো তাদের জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়তে সম্মত হয়েছে। নভেম্বরের নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমাতে ট্রাম্প আগ্রহী। কারণ ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে তার দল রিপাবলিকান পার্টি।
শুক্রবার ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন, যার আওতায় বিশ্ববাজারে আরও বেশি ডিজেল সরবরাহ করা হবে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য মস্কোর আয়ে আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করা হবে। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মূলত স্থলভাগের বাণিজ্যিক মজুতাগার থেকে ১০০ কোটি ব্যারেলেরও বেশি তেল বাজারে ছাড়া হয়েছে।
তবে শিল্পখাতের নির্বাহীরা বলছেন, বিশ্ববাজারে ব্যবহারের উপযোগী তেলের মজুত কমে আসছে, যা বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে এবং তেলের দামের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
বাঙ্গা জানান, বিশ্বব্যাংক এই মুহূর্তে তাদের বৈশ্বিক পূর্বাভাসের কোনো সংশোধন করছে না। তবে পরিস্থিতির ওপর তারা নিবিড় নজর রাখছে। তিনি বলেন, ‘মূল বিষয়টি কেবল এল নিনোর প্রভাব নয়, বরং বিভিন্ন বিষয়ের সম্মিলিত প্রভাব... সারের দামের কী হচ্ছে? জ্বালানি খরচের কী হচ্ছে? ঋণের কী হচ্ছে? এসব মিলিয়েই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয়, আগামী মাসগুলোতে কোন পরিস্থিতির জন্য আমরা প্রস্তুতি নিচ্ছি, সে বিষয়ে আমাদের সবাইকে আরও অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে।’
ক্রমবর্ধমান ঋণ
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা আসন্ন বৈঠকের প্রাক্কালে দেওয়া উদ্বোধনী বক্তৃতায় একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘শীতকাল ঘনিয়ে আসছে।’
আইএমএফ ২০২৬ সালে ৩ শতাংশ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়নি এবং আগামী বছরের পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে সামান্য ঊর্ধ্বমুখী সংশোধনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কিছু দেশের ক্ষেত্রে পূর্বাভাস নিম্নমুখী করা হতে পারে; এর মধ্যে রয়েছে ইউক্রেন এবং উপসাগরীয় দেশগুলো।
গত মঙ্গলবার প্রকাশিত আইএমএফের গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্য ও জ্বালানির দামের আকস্মিক ও তীব্র বৃদ্ধি ক্রমশ সংকটের একটি সাধারণ কারণ হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা জিইয়ে রাখে, দারিদ্র্য পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে।
নীতি-নির্ধারকদের জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণের বোঝা, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে। আইএমএফের মতে, সরকারি ঋণের পরিমাণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং ২০৩০ সালের আগেই তা জিডিপির ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে উন্নত অর্থনীতিগুলোর ক্ষেত্রে ঋণ ও জিডিপির অনুপাত সবচেয়ে বেশি হলেও, উদীয়মান বাজার ও স্বল্প আয়ের দেশগুলো বিশেষ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এর পেছনে রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মিলিত আঘাত যেমন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ সুদের হারের আকর্ষণে পুঁজি বেরিয়ে যাওয়া, এল নিনোর প্রভাব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) বিনিয়োগের অভাব সরবরাহ-সংক্রান্ত নেতিবাচক ধাক্কা সামাল দিতে সহায়তা করেছে।
উদীয়মান বাজারের উদ্বেগ
উচ্চমাত্রার সরকারি ঋণের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষ ঝুঁকির মুখে রয়েছে; এই ঋণগুলোর শর্ত ভবিষ্যতে সম্ভবত উচ্চ সুদের হারে পুনঃনির্ধারণ করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গড়ে ঋণের সুদ পরিশোধের পরিমাণ ইতোমধ্যেই তাদের মোট রাজস্ব আয়ের ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
কোভিড সংকটের শুরুর দিকে জি-২০ নেতারা দরিদ্রতম দেশগুলোর ঋণ পরিশোধ সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার আগ্রহ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। জি-২০ দেশগুলোর কূটনীতিকদের মতে, ঋণের উচ্চমাত্রা এবং রাজনৈতিক চাপ এবার বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেক স্বল্প-আয়ের দেশ ঋণ কর্মসূচির বিষয়ে আইএমএফের নতুন সুপারিশমালা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই সুপারিশগুলোতে ঋণ অনুমোদনের শর্ত হিসেবে কম সংখ্যক কিন্তু গভীর বা কঠোর সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। এটি এমন এক পরিবর্তন, যা শেষ পর্যন্ত কষ্টদায়ক কৃচ্ছ্রসাধনমূলক পদক্ষেপের দিকে নিয়ে যাবে বলে অনেকের আশঙ্কা।
ইউরোড্যাডের ঋণ-সংক্রান্ত ন্যায়বিচার বিষয়ক কর্মী ইয়োলান্ডা ফ্রেস্নিলো বলেন, ‘ঋণ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি এবং আইএমএফের শর্তের কারণে দেশগুলো ইতোমধ্যেই তাদের ব্যয় সংকোচন করছে। আমাদের আশঙ্কা, শর্ত বিষয়ক নীতির এই পর্যালোচনা পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকেই নিয়ে যাবে।’
তিনি উল্লেখ করেন, কেনিয়া সরকারি ব্যয় কমিয়ে এবং কর বাড়ানোর চেষ্টার মাধ্যমে ঋণ পুনর্গঠনের পরিস্থিতি এড়াতে সক্ষম হয়েছিল; কিন্তু এই পরিবর্তন ব্যাপক বিক্ষোভের জন্ম দেয়, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে।
অনেক উন্নয়নশীল দেশ যে সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, তার তীব্রতা স্বীকার না করলে আইএমএফের বিশ্বাসযোগ্যতা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে।
নিরাপত্তা ও অর্থায়ন
ব্যাংককগামী ফ্লাইটগুলো প্রায়ই মধ্যপ্রাচ্যের ওপর দিয়ে যাতায়াত করে। সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে, থাইল্যান্ডের জনবহুল রাজধানীতে আগমনকারী ১০ হাজারেরও বেশি যাত্রীর জন্য এটি তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বার্ষিক সম্মেলনটি মরক্কোতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইসরাইলে হামাসের হামলার আগে। এরপরই ইসরাইল গাজায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে, যাতে ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারায় এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
আটলান্টিক কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জশ লিপস্কি বলেন, তিন বছর পর জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার মধ্যকার যোগসূত্রটি এখন স্পষ্ট। অথচ সেই সময়কার অর্থ-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হামাসের হামলাকে কোনো অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে গণ্য করেননি।
তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই এর ব্যাপক বৈশ্বিক প্রভাব পড়েছে। ইরান ও হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তিন বছর আগের সেই ঘটনার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।’


