গণপূর্তের ‘লটারি বদলি মডেল’
মন্ত্রীর উদ্যোগ প্রশংসিত, ছড়িয়ে পড়ছে সবখানে
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
জাকারিয়া তাহের
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
লটারির মাধ্যমে প্রকৌশলী বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়ায় গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের প্রশাসনসহ সর্বত্র প্রশংসিত হচ্ছেন। কারণ, তিনিই প্রথম সাহস করে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নেন এবং গত জুলাই মাসে তা বাস্তবায়নও করেন। এখন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এ ‘লটারি বদলি’ মডেল অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও অনুসরণ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশেষ করে সরকারের যেসব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ যথেষ্ট প্রতিষ্ঠিত, সেখানে আগে শুরু করা হবে। ইতোমধ্যে আইন মন্ত্রণালয় গত সপ্তাহে সাবরেজিস্ট্রার পদে লটারিতে বদলি কার্যক্রম শুরু করেছে। এজন্য আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানকে সাধারণ মানুষও সাধুবাদ জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে শনিবার তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার শুরু থেকে জেনেছি-মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থায় বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতি ও তদবিরের একটি দুষ্টচক্র রয়েছে। যারা কথিত ‘প্রাইজ পোস্টিং’ হাতিয়ে নিতে নানাভাবে প্রভাবশালী মহলকে ব্যবহার করে থাকেন। এ কারণে বিভিন্ন সেক্টরে অনিয়ম-দুর্নীতি ও কাজের স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
কিন্তু তিনি মন্ত্রী থাকাবস্থায় এসব আর চলবে না। এ ব্যাপারে তিনি জিরো টলারেন্সের নীতি গ্রহণ করেছেন। ফলে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ নির্মূল করতে লটারির মাধ্যমে পদায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন।’
তিনি আশা করেন, মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিটি দপ্তরে এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা আরও সহজ হবে। মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় যে অঙ্গীকার করেছেন, তা বাস্তবায়নে অন্যান্য মন্ত্রণালয় লটারি পদ্ধতি অনুসরণ করছে জেনে ভালো লাগছে।
পূর্ত মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র যুগান্তরকে জানায়, মন্ত্রী জাকারিয়া তাহেরের নিজস্ব উদ্ভাবন ও উদ্যোগে বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রশাসনিক পদ্ধতির পাশাপাশি নতুন একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার এমন দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থল নির্ধারণে ব্যক্তিগত প্রভাব ও তদবিরের সুযোগ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলি কার্যক্রমে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। তিন দফায় মোট এক হাজার ৪৩০ জন প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়েছে। স্বচ্ছতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যমকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষের কাছে প্রশংসিত হয়েছে।
এর মধ্যে প্রথম দফায় ৩০ জুলাই গণপূর্ত অধিদপ্তরের ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়। এরপর ৩ আগস্ট আরও ২৫৪ উপসহকারী প্রকৌশলীকে একই পদ্ধতিতে বদলি করা হয়। সর্বশেষ ১৬ আগস্ট ৪০৯ জন সহকারী প্রকৌশলী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হয়। এর মধ্যে ১৫২ জন সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল), ৬৭ সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম), ১৩৫ উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল) এবং উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) ছিলেন ৫৫ জন।
জানা গেছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন স্তরে বদলি ও পদায়ন লটারির মাধ্যমে হবে। বিশেষ করে যেসব পদে কাক্সিক্ষত কর্মস্থল নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে বেশি আগ্রহ ও প্রতিযোগিতা কাজ ংকরে, সেসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে লটারি পদ্ধতি প্রয়োগ করা হবে।
পূর্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করেন, লটারির মাধ্যমে বদলি প্রক্রিয়া স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নতুন এক দৃষ্টান্ত। এর ফলে সরকারের বিভিন্ন ধাপে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করা আরও সহজ হবে। তদবিরের বিপরীতে নতুন এ স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নতুন মাইলফলক সৃষ্টি করবে। তবে লটারি পদ্ধতির পাশাপাশি যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা, প্রশাসনিক প্রয়োজন, কর্মস্থলের ধরন, পারিবারিক ও বিশেষ পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা যথাযথভাবে বিবেচনায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সব ধরনের বদলি-পদায়ন একই প্রকৃতির নয়। লটারিকে কার্যকর করতে হলে আগে যোগ্য ও উপযুক্ত কর্মকর্তাদের পরিধি নির্ধারণ এবং স্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। ভবিষ্যতে মন্ত্রণালয় এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়েছে।
তারা মনে করেন, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য হলো-বদলি ও পদায়নের মতো একটি সংবেদনশীল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে দৃশ্যমান করা। একজন কর্মকর্তা কোথায় বদলি হবেন, কোন কর্মস্থলে যাবেন-এ সিদ্ধান্ত যদি নির্দিষ্ট নীতিমালা ও উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমে হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা তদবিরের প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কমে আসে। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের অন্যতম উপাদান হলো-সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ন্যায্যতা। বদলি-পদায়নে ‘লটারি পদ্ধতি’ সেই নীতিগুলো বাস্তবায়নের একটি প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে।
