সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের আদেশ বহালের দাবি
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:০০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জারি করা আদেশ বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে এ শিল্পে কর্মরত সাধারণ শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এনবিআরের এ আদেশ বাতিল করা হলে কারখানা বন্ধ হবে, শ্রমিক কর্মসংস্থান হারাবে এবং ঋণখেলাপি বাড়বে বলে মনে করছেন তারা।
রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বুধবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্পিনিং মিল শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংগঠনের পক্ষে এ দাবি জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সালমা গ্রুপের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা ইঞ্জিনিয়ার আজহার আলী।
আজহার আলী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের স্বল্পচাপ ও সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যার সম্মুখীন হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় শিল্পখাতে পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে, এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে। কারণ একটি কারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা মানে শুধু মেশিন সচল থাকা নয়, এর সঙ্গে হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর কর্মসংস্থান, পরিবারের জীবিকা এবং দেশের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা সরাসরি সম্পৃক্ত।
১০-৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার করায় দেশীয় টেক্সটাইল ও স্পিনিং খাত পুনরুজ্জীবন পেয়েছে—এমন মন্তব্য করে ইঞ্জিনিয়ার আজহার আলী বলেন, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে স্থানীয় সুতার চাহিদা বৃদ্ধি পাবে, বন্ধ ও আংশিক বন্ধ মিলগুলো পুনরায় সচল হবে, বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের সুযোগ বাড়বে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিদ্যমান খেলাপি ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
সালমা গ্রুপের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা আরও বলেন, ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির ব্যবস্থা নতুন নয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নন-বন্ডেড (বন্ড লাইসেন্সবিহীন) রপ্তানিকারকদের জন্য ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে সুতাসহ প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে একই সুবিধা বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে। ফলে এ ব্যবস্থার কারণে সুতা আমদানি বা রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্থ হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। ব্যাংক গ্যারান্টির মাধ্যমে আমদানির পদ্ধতি, আমদানি বন্ধের কোনো ব্যবস্থা নয়; বরং প্রকৃত রপ্তানিকারকদের আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রেখে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা।
দেশীয় স্পিনিং খাতের বর্তমান চিত্র তুলে ধরে আজহার আলী বলেন, বর্তমানে দেশে ৫৩০টি স্পিনিং মিল রয়েছে। বিভিন্ন কারণে ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে ১১৭টি স্পিনিং মিল সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে বন্ধ হয়েছে। বর্তমানে ৪১৩টি মিল পূর্ণ বা আংশিকভাবে চালু রয়েছে। চালু মিলগুলোর শুধু ১০-৩০ কাউন্ট কটন সুতা উৎপাদনের বার্ষিক সক্ষমতাই প্রায় ১৩০ কোটি কেজি। অন্যদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১০-৩০ কাউন্ট কটন সুতা আমদানি ছিল ২১ দশমিক ৬ কোটি কেজি, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ৪৬ কোটি কেজিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র দুই অর্থবছরে এই শ্রেণির সুতা আমদানির পরিমাণ প্রায় ১১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সমস্যা শুধু মিল মালিকদের সমস্যা নয়। এ খাতে ৩২ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ এবং সরাসরি প্রায় ৩০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে এবং পরোক্ষভাবে প্রায় ১ কোটি মানুষ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। একটি কারখানা বন্ধ হলে তার প্রভাব পড়ে শ্রমিক ও কর্মচারীর জীবিকায়, তাদের পরিবারের আয় ও শিক্ষায়, ব্যাংকের বিনিয়োগে, সরবরাহকারী ও পরিবহণ খাতে এবং সর্বোপরি দেশের অর্থনীতিতে।
তিনি আরও বলেন, আমরা কোনো অযৌক্তিক সুরক্ষা বা বিশেষ সুবিধা চাই না। আমরা চাই ন্যায্য প্রতিযোগিতা, স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতি, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধ, দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার, প্রকৃত রপ্তানিকারকের আমদানি সুবিধা এবং সর্বোপরি শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা। দেশীয় টেক্সটাইল শিল্পকে শক্তিশালী করা মানে শুধু একটি শিল্পখাতকে শক্তিশালী করা নয়; এর অর্থ দেশের রপ্তানি ভিত্তি, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, ব্যাংকিং খাতের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ভবিষ্যৎ শিল্পায়নকে শক্তিশালী করা।
লিখিত বক্তব্যে দেশের টেক্সটাইল শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে ৪ দাবি জানানো হয়। এগুলো হচ্ছে—
প্রথমত: এনবিআরের জারি করা আদেশ বহাল রাখা।
দ্বিতীয়ত: শিল্পখাতে বর্তমান গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি অব্যাহত রাখা এবং প্রয়োজনীয় চাপ ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা।
তৃতীয়ত: শিল্প, ব্যাংকিং খাত, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানির দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় একটি সমন্বিত টেক্সটাইল-আরএমডি নীতি গ্রহণ করা।
চতুর্থত: রিসাইকেল ও সাসটেইনেবল পণ্যের ব্যবহার ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে অতিরিক্ত ৫ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া।
স্বাগত বক্তব্যে মোশাররফ গ্রুপের পরিচালক (অপারেশন) শাহিনুল হক বলেন, গত ৩ বছর ধরে দেশি ও আন্তর্জাতিক চাপের কারণে টেক্সটাইল শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে ৫০-৬০টি মিল বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক শ্রমিক, কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মসংস্থানহীন হয়ে পড়েছে। ৪০ বছর পরও কেন গার্মেন্টস শিল্পে বন্ড সুবিধা বহাল রাখতে হবে— এ প্রশ্ন রেখে তিনি আরও বলেন, গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশে বন্ড সুবিধা দেওয়া হয়েছে। যার ফলশ্রুতিতে শিল্পের বিকাশ হয়েছে। বর্তমানে বন্ডের আওতায় বিদেশ থেকে আমদানি করা সুতায় বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। যার কারণে অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে একে একে স্পিনিং মিল বন্ধ হচ্ছে। তাই দেশীয় শিল্পের স্বার্থে যেকোনো পদ্ধতিতেই হোক বন্ড সুবিধা বাতিল অথবা ১০-৩০ কাউন্টের কটন সুতা আমদানিতে এনবিআরের জারি করা ডি-বন্ড আদেশ বহাল রাখতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন গ্রিনটেক্স লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক রুহুল আমিন, ইউটা স্পিনিং মিলের উপ মহাব্যবস্থাপক আব্দুস সালিক ও বেঙ্গল এফএনকে গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক এনামুল হক প্রমুখ।



