Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দক্ষিণ এশিয়ার ‘জেন জি’ অভ্যুত্থান

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ১০:৫৬ পিএম

কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দক্ষিণ এশিয়ার ‘জেন জি’ অভ্যুত্থান

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশ—বাংলাদেশ, নেপাল এবং শ্রীলংকা বর্তমানে এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যুবসমাজ ও জেন জি (জেনারেশন জেড) প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের পর এসব দেশে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে এবং জনগণের পক্ষ থেকে পরিবর্তনের বড় ধরনের রায় বা ম্যান্ডেটও তারা পেয়েছে। 

তবে সরকার গঠনের পর প্রাথমিক উল্লাস কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষমতার বাস্তবতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার নানা জটিলতা এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ এবং ভারতের সঙ্গে জটিল কূটনৈতিক সম্পর্কের সমীকরণ এই নতুন সরকারগুলোর পথ চলাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

বিগত কয়েক বছরে দক্ষিণ এশিয়ার এই তিন দেশেই তীব্র গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটে। ২০২২ সালে শ্রীলংকায় গণ-বিক্ষোভের মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর ২০২৪ সালে বাংলাদেশে বিপ্লবের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। সর্বশেষ ২০২৫ সালে নেপালে ‘জেন জি’ বিপ্লবের জোয়ারে কে পি শর্মা অলির সরকারের পতন ঘটে। 

এই আন্দোলনগুলোর পেছনে কিছু অভিন্ন কারণ ছিল, যার মধ্যে অন্যতম অর্থনৈতিক বিপর্যয়, যুবসমাজের জনসংখ্যাগত চাপ এবং রাজনৈতিক স্থবিরতা। আইএমএফের বেলআউট বা ঋণ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল এই তিন দেশেই দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং কর্তৃত্ববাদী আচরণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ জমেছিল। এই ক্ষোভকে উসকে দিতে এবং সরকারবিরোধী বয়ান তৈরি করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বড় ভূমিকা পালন করে।

তবে দেশগুলোর আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কিছু ভিন্নতাও ছিল। শ্রীলংকার আন্দোলনের মূল কারণ ছিল দেশটির দেউলিয়া হয়ে যাওয়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট। বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতিকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। আর নেপালে আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার একটি সরকারি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। আন্দোলন-পরবর্তী নির্বাচনের ধারাও ভিন্ন পথ নিয়েছে। 

নেপাল গত মার্চের নির্বাচনে উগ্র পরিবর্তনের পথ বেছে নিয়ে একজন সাবেক র‍্যাপার বালেণ শাহকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কিছুটা ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতা তারেক রহমানকে নির্বাচিত করে। শ্রীলংকায় আবার মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী দল জেভিপির নেতৃত্বাধীন জোটের প্রধান অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

নতুন সরকারগুলো বড় ম্যান্ডেট নিয়ে আসায় তিন দেশেই এক ধরনের আশাবাদী পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশেও ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর আওতায় রাজনৈতিক সংস্কারের প্রস্তাবগুলো গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণের হাওয়া দেয়। কিন্তু দ্রুতই এই জনসমর্থন হারানোর শঙ্কা তৈরি হচ্ছে, কারণ সরকারগুলো প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং অনভিজ্ঞতার কারণে নানামুখী ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। 

নেপালে দুর্নীতিবিরোধী স্লোগান দিয়ে বালেণ শাহ ক্ষমতায় এলেও প্রথম মাসেই কেলেঙ্কারির মুখে তার সরকারের দুই মন্ত্রী পদত্যাগ করেন। শ্রীলংকায় অর্থনৈতিক কৃচ্ছ্রসাধনের কারণে জনগণের অসন্তোষের মধ্যেই গত বছর ঘূর্ণিঝড় ‘দিতওয়াহ’ মোকাবিলায় সরকারের ব্যর্থতা ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়, যার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও। বাংলাদেশেও সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার পর সহিংস অপরাধ বৃদ্ধি পাওয়া একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে বিএনপি সরকার জুলাই সনদের সংস্কারগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

জনগণের বড় ম্যান্ডেট যে স্থায়ী স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি নয়, তা এই তিন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দেখলেই বোঝা যায়। নেপালে দীর্ঘস্থায়ী মাওবাদী সহিংসতার ইতিহাস রয়েছে। নতুন সরকার শহরের তরুণ ভোটারদের খুশি করতে গিয়ে গ্রামীণ বা অন্যান্য জনগোষ্ঠীর স্বার্থ উপেক্ষা করছে, যা সামাজিক সংহতি বিনষ্ট করতে পারে। শ্রীলংকায় গৃহযুদ্ধ শেষ হলেও সিংহলী বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ এখনও সমাজের গভীরে প্রোথিত, যা তামিল ও মুসলিম সংখ্যালঘুদের সঙ্গে স্থায়ী মেলবন্ধনের পথে বড় বাধা। 

অভ্যন্তরীণ এই সংকটগুলোকে আরও ঘনীভূত করেছে চলমান ইরান যুদ্ধ। জ্বালানি সংকট, মুদ্রাস্ফীতি এবং রেমিট্যান্সের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের কারণে এই তিন দেশের অর্থনীতি তীব্র ধাক্কা খেয়েছে, যা নতুন সরকারগুলোর হানিমুন পিরিয়ড বা স্বস্তির সময়কে সংক্ষিপ্ত করে দিয়েছে। এরই মধ্যে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের একটি নতুন সূচনা করতে চাইছে এই তিন দেশই। জ্বালানি সংকট মোকাবিলা ও মানবিক সহায়তার জন্য ভারতের ওপর নির্ভরতা থাকলেও, দিল্লির বড় ভাই সুলভ আচরণ প্রতিবেশীদের মনে এক ধরনের অবিশ্বাসও তৈরি করে।

বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপি জয়ী থাকায় গঙ্গা পানি চুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রে ইতিবাচক সম্ভাবনার পাশাপাশি দলটির পরিচয়বাদী রাজনীতি এবং অনুপ্রবেশকারী তাড়ানোর কড়াকড়ির কারণে সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধির শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেণ শাহের খামখেয়ালি আচরণ এবং ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে দেখা না করার সিদ্ধান্ত দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

প্রতিবেশীদের এই যুব-বিপ্লবের হাওয়া থেকে ভারতও পুরোপুরি মুক্ত নয়। ভারতের তরুণ ভোটারদের একাংশও প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে নতুন বিকল্প খুঁজছে, যার প্রমাণ মিলেছে তামিলনাড়ুর রাজ্য নির্বাচনে। এছাড়া সম্প্রতি প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ব্যঙ্গাত্মকভাবে গড়ে ওঠা যুব আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ দিল্লিতে বড় ধরনের বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। যদিও ভারতে এই আন্দোলনগুলো সরকার পতনের মতো পরিস্থিতি তৈরি করবে না, তবে তা রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। 

দক্ষিণ এশিয়ার এই নতুন সরকারগুলো এখন অপূর্ণ প্রতিশ্রুতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির এক কঠিন গোলকধাঁধায় রয়েছে। তারা যদি জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে আবারও তীব্র গণ-বিক্ষোভের মুখে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সূত্র: চ্যাথাম হাউস।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

গুপ্তচরবৃত্তির মামলায় ৭ দিনের রিমান্ডে সেই ভারতীয় নাগরিক

গুপ্তচরবৃত্তির মামলায় ৭ দিনের রিমান্ডে সেই ভারতীয় নাগরিক

স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া তরুণীকে ভাড়াটে লোক দিয়ে গণধর্ষণ!

স্বামীর সঙ্গে ঘুরতে যাওয়া তরুণীকে ভাড়াটে লোক দিয়ে গণধর্ষণ!

বেরোবির তিন শিক্ষকসহ ১১ জন স্থায়ী বহিষ্কার

আবু সাঈদ হত্যা বেরোবির তিন শিক্ষকসহ ১১ জন স্থায়ী বহিষ্কার

ইসরাইলগামী ফ্লাইটে ছুরিকাহত পাইলট কে এই স্মিত মাচ্ছার?

ইসরাইলগামী ফ্লাইটে ছুরিকাহত পাইলট কে এই স্মিত মাচ্ছার?

জম্মু-কাশ্মীরে সহকর্মীর গুলিতে নিরাপত্তাবাহিনীর ৪ সদস্য নিহত

জম্মু-কাশ্মীরে সহকর্মীর গুলিতে নিরাপত্তাবাহিনীর ৪ সদস্য নিহত

ইসরাইলগামী বিমানে ছুরিকাহত ভারতীয় পাইলটকে ‘বীর’ বললেন মোদি

ইসরাইলগামী বিমানে ছুরিকাহত ভারতীয় পাইলটকে ‘বীর’ বললেন মোদি

আরও পড়ুন

অর্থনৈতিক চাপে থাকা ইয়েমেনকে ৬০ মিলিয়ন ডলার দিল সৌদি আরব

অর্থনৈতিক চাপে থাকা ইয়েমেনকে ৬০ মিলিয়ন ডলার দিল সৌদি আরব

এক ভিসায় ২৯ দেশ ভ্রমণ, জানুন শেনজেন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ৯ প্রশ্নের উত্তর

এক ভিসায় ২৯ দেশ ভ্রমণ, জানুন শেনজেন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ৯ প্রশ্নের উত্তর

ইসরাইলের নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুকে নিয়ে ট্রাম্পের বার্তা

ইসরাইলের নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুকে নিয়ে ট্রাম্পের বার্তা

দুই দফা প্রাণঘাতী ইনজেকশনেও বেঁচে গেলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী

দুই দফা প্রাণঘাতী ইনজেকশনেও বেঁচে গেলেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম