মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের বাড়তে থাকা ভূমিকায় নতুন চাপের জায়গা আফগানিস্তান
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যে সাম্প্রতিক উত্তেজনা এখন আর কেবল দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্তসংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে না। একদিকে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে তালেবান নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তান থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্বও বাড়ছে। ফলে দুই ভিন্ন অঞ্চলের এই দুটি নিরাপত্তা বাস্তবতা ক্রমেই একই রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা, গোয়েন্দা নজরদারি ও কূটনৈতিক মনোযোগের ওপর চাপ তৈরি করছে।
৫ অক্টোবর রাশিয়ার আয়োজনে মস্কো ফরম্যাটের বৈঠকে আফগানিস্তান-পাকিস্তান উত্তেজনা আলোচনার অন্যতম বিষয় হওয়ার কথা। এতে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পাশাপাশি চীন, ভারত, ইরান, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো অংশ নেবে। রাশিয়া জানিয়েছে, তারা দুই পক্ষকে একটি ‘যৌক্তিক সমঝোতার’ দিকে নিতে চায়।
বর্তমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। তবে বিষয়টি এখন আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্কের আরেকটি সংকটের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে। ২০২১ সালে তালেবান কাবুলের ক্ষমতা দখল করার পর পাকিস্তান সেখানে নিজেদের প্রভাবকে একটি কৌশলগত সুবিধা হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু টিটিপিকে ঘিরে নিরাপত্তা সংকট সেই ধারণাকে উল্টো পাকিস্তানের জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত করেছে।
আফগান তালেবান ও টিটিপি আলাদা সংগঠন হলেও দীর্ঘদিনের বিদ্রোহী তৎপরতা, যোগাযোগ ও পরিচালনাগত সম্পর্কের কারণে তাদের পুরোপুরি আলাদা রাখা কঠিন। জাতিসংঘের একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে টিটিপি এখনো লজিস্টিক ও পরিচালনাগত সুযোগ এবং আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকে।
ফলে ইসলামাবাদ কাবুলের কাছে শুধু একটি নীতিগত পরিবর্তন চাইছে না; টিটিপির সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার দাবি তালেবান নেতৃত্বকে এমন কিছু নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বাধ্য করতে পারে, যেসব পরিবেশ থেকেই একসময় তাদের নিজেদের সশস্ত্র আন্দোলন সহায়তা পেয়েছিল।
সামরিক চাপ কতটা কার্যকর হবে
সীমান্তে চাপ ও সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পাকিস্তান কাবুলকে সহযোগিতায় বাধ্য করার চেষ্টা করছে। গত কয়েক সপ্তাহে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলাও দুই দেশের উত্তেজনা বাড়িয়েছে। পাকিস্তান এসব হামলাকে জঙ্গি আস্তানার বিরুদ্ধে অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছে। অন্যদিকে তালেবান বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ তুলেছে।
তবে সামরিক চাপ সবসময় প্রত্যাশিত মাত্রায় সহযোগিতা নিশ্চিত করে না। বরং এতে কাবুলের কাছে ইসলামাবাদের ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ বাড়তে পারে। আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগও সেই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি না দিয়েও ভারত ধীরে ধীরে আফগানিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হলে কাবুলের হাতে ইসলামাবাদের বাইরে বিকল্প যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। পাকিস্তানের জন্য এটি একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি—তালেবানকে নিরাপত্তা ইস্যুতে চাপ দিতে গিয়ে তারা এমন সম্পর্কই আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে, যেটি দীর্ঘদিন ধরে সীমিত রাখার চেষ্টা করেছে।
আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমীকরণও গুরুত্বপূর্ণ
আফগানিস্তানের ভেতরে তালেবানবিরোধী সশস্ত্র তৎপরতারও কিছু পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় তালেবান বাহিনীর সঙ্গে বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে প্রশ্ন উঠছে, এসব গোষ্ঠী ভবিষ্যতে কতটা সংগঠিত ও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তানের জন্য তালেবান সরকারের পতনই একমাত্র সম্ভাব্য কৌশল নয়। আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বিরোধী শক্তি যদি দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে, তাহলে তালেবানের একক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে। এতে তালেবানকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় আরও সামরিক সম্পদ ব্যয় করতে হতে পারে এবং ইসলামাবাদের সঙ্গে আলোচনায় তাদের অবস্থানও পরিবর্তিত হতে পারে।
তবে এমন কোনো পরিবর্তনের অর্থ সরাসরি তালেবান সরকারকে উৎখাত করা নয়। বরং আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন এনে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার সুযোগ তৈরি হতে পারে—যদিও এ ধরনের পরিবর্তনের বৈধতা ও ভবিষ্যৎ কাঠামো শেষ পর্যন্ত আফগান জনগণের অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের নতুন ভূমিকা
আফগানিস্তান নিয়ে পাকিস্তানের এই চাপের সময়েই মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির কৌশলগত ভূমিকা বাড়ছে। গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। চুক্তিতে তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
এরপর তিন দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। আগস্টের শেষ দিকে তারা একটি কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি গঠন এবং সৌদি আরবে একটি স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একমত হয়। প্রাথমিকভাবে এই সচিবালয়ের মহাসচিব হিসেবে একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়।
চুক্তিটিকে অবশ্য সব পরিস্থিতিতে একইভাবে কাজ করবে এমন পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থ ও হুমকি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য রয়েছে। তবে সহযোগিতাটি এখন কেবল প্রতীকী পর্যায়ে নেই।
ইয়েমেনে হুতিদের হামলা এবং সৌদি নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তিন দেশ এরই মধ্যে সমন্বয় করছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, ইরান হুতিদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা নিয়ে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্যদের জরুরি বৈঠক হবে।
ফলে পাকিস্তান একই সময়ে একটি বৈপরীত্যপূর্ণ নিরাপত্তা বাস্তবতার মুখোমুখি। পশ্চিম দিকে মধ্যপ্রাচ্যে তার নিরাপত্তা ভূমিকা বাড়ছে, অথচ নিজ দেশের পশ্চিম সীমান্তে আফগানিস্তান থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে।
দুই অঞ্চলের সংকট কেন গুরুত্বপূর্ণ
আফগানিস্তানের সংকট মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করেনি। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আফগান তালেবান ও পাকিস্তানের বর্তমান বিরোধেরও মূল কারণ নয়। তবে একটি দেশের সামরিক সক্ষমতা, গোয়েন্দা নজরদারি, কূটনৈতিক মনোযোগ ও কৌশলগত সময়—সবই সীমিত।
তাই আফগানিস্তান থেকে আসা চাপ এমন একটি রাষ্ট্রের ওপর পড়ছে, যে রাষ্ট্র একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ভূমিকা নিতে শুরু করেছে।
এই কারণে আফগানিস্তানের অস্থিরতাকে এখন শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। মস্কো বৈঠকও এই পরিবর্তিত আঞ্চলিক বাস্তবতার একটি উদাহরণ। ভারত ও পাকিস্তান পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী, চীন ও ভারত প্রতিযোগী, ইরানের নিজস্ব আঞ্চলিক কৌশল রয়েছে এবং রাশিয়া তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তবু পাকিস্তান-তালেবান সংঘাত আরও বিস্তৃত হোক—এমনটা কোনো পক্ষই চায় না।
ফলে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন এমন এক আন্তঃসংযুক্ত কাঠামোর দিকে যাচ্ছে, যেখানে দেশগুলো এক অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও অন্য অঞ্চলে সহযোগিতা করছে এবং তৃতীয় কোনো ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান সামঞ্জস্য করছে। একটি অঞ্চলের নিরাপত্তা সংকট তাই সরাসরি কোনো অভিন্ন জোট ছাড়াও অন্য অঞ্চলে প্রভাব ফেলতে পারে।
মস্কো বৈঠক সাময়িক উত্তেজনা কমাতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানের গভীরতর প্রশ্নটি থেকেই যাবে—টিটিপির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে তালেবানকে শুধু আচরণ পরিবর্তনের জন্য চাপ দিলেই কি ইসলামাবাদ তার নিরাপত্তা চাহিদা পূরণ করতে পারবে?
যদি ধারাবাহিক সামরিক ও কূটনৈতিক চাপেও প্রত্যাশিত ফল না আসে এবং আফগানিস্তানের বিরোধী শক্তিগুলো নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে থাকে, তাহলে পাকিস্তান আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্যকে নিজেদের কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। এর অর্থ সরাসরি তালেবানকে উৎখাত করা নয়; বরং আফগানিস্তানে ক্ষমতার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা হতে পারে।
তবে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যের যেকোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থাকবে—তা কতটা আফগান জনগণের অংশগ্রহণ ও বৈধতার ভিত্তিতে তৈরি হচ্ছে এবং একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ কীভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে।
মস্কো বৈঠকের পর তাই মূল প্রশ্ন শুধু পাকিস্তান ও তালেবান তাদের সাম্প্রতিক সংঘাত থামাতে পারবে কিনা—তা নয়। বরং ২০২১ সালের পর তৈরি আফগান রাজনৈতিক কাঠামোকে তালেবানের আচরণে পরিবর্তন আনার মাধ্যমেই নিজেদের নিরাপত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা সম্ভব বলে ইসলামাবাদ এখনো মনে করে কিনা, সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে।
