জাতিসংঘের আমন্ত্রণ, যুক্তরাষ্ট্রের বাধা—কার হাতে আসল ক্ষমতা?
Advertisement
ফারুক নেগারী
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে নিউইয়র্কে যেতে দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। দেওয়া হয়নি ভিসা। অথচ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ তাকে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি দেয়। জাতিসংঘের অধিবেশনে অংশ নেওয়ার সুযোগ আর আয়োজক দেশের ভিসা ক্ষমতার এই সংঘাত সামনে আনে বড় প্রশ্ন—আন্তর্জাতিক মঞ্চে কে কথা বলবেন, শেষ সিদ্ধান্তটা কার?
গত ২২ সেপ্টেম্বর থেকে এক সপ্তাহের জন্য নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহে জড়ো হন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা। তবে এবার টানা দ্বিতীয় বছরের মতো ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ভিসা দেওয়া হয়নি। কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে- ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সংস্কারে ব্যর্থ হয়েছে এবং ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক আদালতগুলোতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপও রয়েছে।
কিন্তু জাতিসংঘের অবস্থান ভিন্ন। ১৭ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদ ১৫২-৩ ভোটে সিদ্ধান্ত নেয়, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করতে না পারা ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা ভিডিওর মাধ্যমে সাধারণ পরিষদের সভা ও জাতিসংঘের অন্যান্য সম্মেলনে অংশ নিতে পারবেন।
এ অবস্থায় জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও উদ্বেগ জানান। তার দপ্তরের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতিসংঘের কাজে অংশ নিতে আসা প্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালনের জন্যও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
ফিলিস্তিন জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য নয়; জাতিসংঘে এর মর্যাদা ‘পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’। কিন্তু এই মর্যাদার অর্থ এই নয় যে, জাতিসংঘের কার্যক্রমে ফিলিস্তিনের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। তবে এই প্রশ্নটি বহু বছর ধরেই জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার আইনি ও কূটনৈতিক আলোচনার অংশ।
এই বিরোধের ভিত্তিতে রয়েছে ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘ-যুক্তরাষ্ট্র হেডকোয়ার্টার্স অ্যাগ্রিমেন্ট। চুক্তির ১১ নম্বর ধারায় জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধি এবং জাতিসংঘের আমন্ত্রণে সরকারি কাজে সদর দপ্তরে আসা ব্যক্তিদের সদর দপ্তর এলাকায় যাতায়াতে বাধা না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ১২ নম্বর ধারা আরও স্পষ্ট করে, এই প্রবেশাধিকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজ দেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভর করবে না।
আর ১৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশিদের প্রবেশসংক্রান্ত আইন এমনভাবে প্রয়োগ করা যাবে না, যাতে ১১ নম্বর ধারায় দেওয়া এই প্রবেশাধিকারের সুবিধা বাধাগ্রস্ত হয়। যাদের ভিসা প্রয়োজন, তাদের দ্রুত ও বিনামূল্যে ভিসা দেওয়ার কথাও চুক্তিতে রয়েছে।
তবে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে প্রবেশ করছেন বলে তাদের ভিসা ও প্রবেশের বিষয়টি মার্কিন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়; কিন্তু সেই ভিসা ব্যবস্থা এমনভাবে ব্যবহার করা যাবে কিনা, যাতে জাতিসংঘের কাজে অংশ নেওয়ার অধিকারই বাধাগ্রস্ত হয়—আব্বাসের ঘটনায় মূল আইনি প্রশ্নটি সেখানেই।
জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ভিসা ও প্রবেশাধিকার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধের ইতিহাসও দীর্ঘ। রাশিয়া, কিউবা ও ভেনেজুয়েলার মতো দেশগুলোর প্রতিনিধিদের ভিসা, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং সদর দপ্তরে প্রবেশাধিকার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি জাতিসংঘে উঠেছে।
ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও এমন বিরোধের ইতিহাস রয়েছে। জাতিসংঘের নথিতে বলা হয়েছে- প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)-এর জাতিসংঘে স্থায়ী পর্যবেক্ষক মিশনের কর্মকর্তারা হেডকোয়ার্টার্স অ্যাগ্রিমেন্টের ১১, ১২ ও ১৩ নম্বর ধারার আওতায় পড়েন। অর্থাৎ জাতিসংঘের সরকারি কাজে নিউইয়র্কে আসার ক্ষেত্রে তাদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে জাতিসংঘের অবস্থান ছিল।
এবার ইরানের ঘটনা এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের ভিসা না দিলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিসহ মূল প্রতিনিধি দলকে সাধারণ পরিষদে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেয়। তবে তাদের চলাচল নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকার মধ্যে সীমিত রাখার শর্ত দেওয়া হয়।
ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ভিসাই দেয়নি। আর ইরানের ক্ষেত্রে ভিসা দিয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হলেও চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ফলে দুই সিদ্ধান্তের ধরন এক নয় এবং ওয়াশিংটন যে কারণ দেখিয়েছে সেগুলোও এক নয়। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দুটি ঘটনাকেই শুধু ‘জাতিসংঘে প্রবেশে যুক্তরাষ্ট্রের বাধা’ হিসেবে দেখলে আইনি ও কূটনৈতিক বাস্তবতার পার্থক্যটি আড়ালে পড়ে যায়।
দুটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে প্রশ্ন ওঠে, জাতিসংঘের অধিবেশনে অংশগ্রহণের বাস্তব সুযোগ কি শুধু কোনো দেশের জাতিসংঘের মর্যাদার ওপর নির্ভর করে; নাকি সদর দপ্তর যে দেশের ভূখণ্ডে, সেই দেশের ভিসা ও চলাচলসংক্রান্ত সিদ্ধান্তও তা প্রভাবিত করে?
সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের সপ্তাহ শুধু রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের বক্তৃতার জায়গা নয়। চলে অসংখ্য দ্বিপক্ষীয় বৈঠক, অনানুষ্ঠানিক আলোচনা, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং করিডর কূটনীতি। আব্বাস ভিডিওতে বক্তব্য দিতে পেরেছেন; কিন্তু নিউইয়র্কে শারীরিকভাবে উপস্থিত থেকে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক, অনানুষ্ঠানিক আলোচনা কিংবা কূটনৈতিক যোগাযোগ—এসবের বিকল্প ভিডিও সংযোগ কতটা হতে পারে, সেটিই বড় প্রশ্ন। এখানেই ‘অংশগ্রহণ’ আর ‘উপস্থিতির’ পার্থক্য সামনে আসে।
জাতিসংঘ একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান; কিন্তু তার সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে। একটি রাষ্ট্র যদি তার ভূখণ্ডে অবস্থিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে অংশ নিতে আসা ব্যক্তিদের প্রবেশ সীমিত করতে চায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—সেই ক্ষমতার সীমা কোথায়? আবার জাতিসংঘ যদি তার কার্যক্রমে অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে সেই অধিকার বাস্তবে কার্যকর করার উপায় কী?
আব্বাসের ঘটনা সেই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেয় না। বরং ১৯৪৭ সালের একটি আইনি কাঠামোকে আজকের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
আর সেখানেই মূল প্রশ্নটি থেকে যায়—জাতিসংঘের মঞ্চ যদি সবার জন্য উন্মুক্ত হয়, সেই মঞ্চে পৌঁছানোর অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষমতা কার- জাতিসংঘের, নাকি যে দেশের ভূখণ্ডে জাতিসংঘের সদর দপ্তর, শেষ পর্যন্ত সেই দেশের?
