মোদি সরকারের ‘পরীক্ষা’ নিচ্ছেন অভিজিৎ দীপকে
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২২ পিএম
অভিজিৎ দীপকে। ছবি : সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতে বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’ বলে কটাক্ষের জবাবে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দিয়ে আলোচনায় আসা অভিজিৎ দীপকে এবার নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারকে। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কর্মসূচি ঘোষণা করেন তিনি। শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লিতে যাওয়ার পর তাকে আটক করে পুলিশ।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩১ বছর বয়সী দীপকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন হিসেবে যাত্রা শুরু করে। পরে বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির দাবিতে এটি তরুণদের প্রতিবাদী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।
গতকাল শনিবার নয়াদিল্লিতে পৌঁছানোর পর দীপকের সঙ্গে সংগঠনটির আরও দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকেও আটক করা হয়। বিমানবন্দরে পুলিশের সঙ্গে কথোপকথনের ভিডিওতে দীপকেকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি গ্রেফতার হতে এসেছি, গ্রেফতার করুন। আপনাদের ভয় পাই না।’ তবে পুলিশ সদস্যরা জানান, তাকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না, বরং তার সহযোগিতা চাওয়া হচ্ছে।
দেশজুড়ে পরিচিতি
চলতি বছরের মে মাসে বেকার তরুণদের ‘তেলাপোকা’র সঙ্গে তুলনা করে দেওয়া এক মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের ওই মন্তব্যের জবাবে দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ‘সব তেলাপোকা একসঙ্গে হলে কী হবে?’
তার এই ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে একটি অনলাইন আন্দোলনের জন্ম হয়। অল্প সময়ের মধ্যে সংগঠনটি বিপুলসংখ্যক অনুসারী অর্জন করে এবং বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে রাজপথে প্রতিবাদ শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্রে জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা শেষ করে ভারতে ফেরেন দীপকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা তাকে অর্থবহ কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে আন্দোলনের কারণে তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা হুমকির মুখেও পড়েছেন বলে দাবি করেছেন।
আন্দোলনে ভূমিকা
চলতি বছর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি সামনে এনে প্রতিবাদে অংশ নেয় দীপকের সংগঠন। পরে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠেন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
টানা জনচাপের মুখে গত ২৫ জুলাই পদত্যাগ করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভায় এমন পদত্যাগকে বিরল ঘটনা হিসেবে দেখা হয়।
এরপর থেকে দীপকে ও তার সমর্থকেরা সরকারি স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়ন, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রচার চালিয়ে আসছেন। সংগঠনটি নিজেদের রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়, বরং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করা একটি চাপ সৃষ্টিকারী আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরে।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক
সম্প্রতি ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে আবারও আন্দোলনে নামে সংগঠনটি। বিরোধীদের অভিযোগ, খসড়া ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। এ ঘটনার প্রতিবাদে নির্বাচন কমিশনের প্রধান জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছেন দীপকে ও তার সমর্থকেরা।
তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, তালিকা সংশোধনের সময় চিহ্নিত বিভিন্ন এন্ট্রির কারণে এই সংখ্যা তৈরি হয়েছে। ভুলভাবে কারও নাম বাদ পড়লে সংশ্লিষ্ট ভোটাররা পুনরায় নিবন্ধন করতে পারবেন।
গত মাসে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের দুই কর্মকর্তার ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধনপ্রক্রিয়া ও ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানানোর বিষয়টি উঠে আসে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন নতুন গতি পায়। তবে কমিশনের দাবি, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক।
দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তা
শনিবারের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে হাজারো নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল এবং প্রতিবাদ কর্মসূচির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
এ পরিস্থিতিতে সমর্থকদের শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান দীপকে। তিনি মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের আদর্শ অনুসরণের কথাও বলেন।
বিমানে ওঠার আগে ধারণ করা এক ভিডিওতে দীপকে বলেন, ‘আগামীকাল কী হবে, আমি জানি না। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত- আমি ভয় পাব না, পিছু হটব না। আমাদের গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে।’
বেকারত্ব, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ও ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিয়ে দীপকের আন্দোলন ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

