শ্রমিক থেকে চারবারের প্রেসিডেন্ট কে এই লুলা, কীভাবে তার উত্থান?
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩০ এএম
লুলা দ্য সিলভা। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দারিদ্র্য থেকে রাজনীতির শীর্ষে, শ্রমিক আন্দোলনের নেতা থেকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট। কারাগারে যাওয়ার পরও ফিরে এসেছেন ক্ষমতায়। ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলের কঠোর সমালোচনা আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির বিরোধিতা করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও আলোচনায় লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভার রাজনৈতিক জীবন যেন এক নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের গল্প। একসময় দারিদ্র্যের কারণে শৈশবেই কাজ শুরু করতে হয়েছিল তাকে। পরে কারখানার শ্রমিক, শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, রাজপথের আন্দোলনকারী থেকে দেশের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন তিনি। তিনবার নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর ২০০২ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। দুই মেয়াদ দায়িত্ব পালনের পর দুর্নীতির মামলায় কারাগারেও যেতে হয় তাকে। কিন্তু আইনি লড়াই শেষে রাজনীতিতে ফিরে ২০২২ সালে আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের গল্প আরও দীর্ঘ হয়েছে।
দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও লুলা এখন আলোচিত। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করে তিনি বারবার শিরোনাম হয়েছেন। তার সমর্থকদের কাছে লুলা সামাজিক ন্যায়বিচার, শ্রমিকের অধিকার ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতীক। অন্যদিকে সমালোচকদের অভিযোগ, তার কিছু বক্তব্য কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়িয়েছে এবং পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি কখনো কখনো অতিরিক্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই
লুলার জন্ম ১৯৪৫ সালের ২৭ অক্টোবর ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পারনামবুকো রাজ্যের গারানিউন্স শহরে। দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান তিনি। পরিবারের আর্থিক সংকট ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। উন্নত জীবনের আশায় তার মা সন্তানদের নিয়ে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সাও পাওলোতে পাড়ি জমান। তখন লুলার বয়স ছিল সাত বছর। পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নতুন জায়গায় বসতি গড়লেও অভাব তাদের পিছু ছাড়েনি।
শৈশবেই সংসারের খরচ জোগাতে কাজ করতে হয়েছে লুলাকে। কখনো রাস্তায় চিনাবাদাম, কমলা ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি করেছেন, কখনো জুতায় পালিশ করেছেন। পরে কারখানায় কাজ নেন। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বেশি দূর এগোয়নি তার। তবে কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়ে ধাতব শিল্পে কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করেন। একপর্যায়ে তিনি লেদ মেশিন পরিচালনায় দক্ষতা অর্জন করেন এবং সাও পাওলোর শিল্পাঞ্চলে ধাতব কারখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন।
কারখানার কঠিন পরিবেশ, কম মজুরি এবং শ্রমিকদের নানা সমস্যার অভিজ্ঞতা তাকে শ্রমিক আন্দোলনের দিকে টেনে নেয়। ব্যক্তিগত জীবনের সংগ্রামও তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে ভূমিকা রাখে। শ্রমিকদের দৈনন্দিন দুর্ভোগ তিনি কাছ থেকে দেখেছিলেন। ফলে শ্রমিকের অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক বৈষম্য কমানোর দাবি তার রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসে।
শ্রমিক নেতা থেকে রাজনীতির মঞ্চে
লুলার রাজনৈতিক উত্থানের গুরুত্বপূর্ণ সময় ১৯৭০-এর দশক। ব্রাজিল তখন সামরিক শাসনের অধীনে। এ সময় সাও পাওলোর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন তিনি। ১৯৭৫ সালে সাও বার্নার্দো দো কাম্পু ও দিয়াদেমার ধাতবশ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হন। এই পদ তাকে শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।
সামরিক শাসনের শেষদিকে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও উন্নত কর্মপরিবেশের দাবিতে বড় বড় ধর্মঘট সংগঠিত করেন লুলা। ১৯৭০-এর দশকের শেষভাগে তার নেতৃত্বে শিল্পাঞ্চলে ব্যাপক শ্রমিক আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৭৯ সালে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিকের অংশগ্রহণে বড় ধরনের ধর্মঘটের নেতৃত্ব দেন তিনি। আন্দোলন দমনে কর্তৃপক্ষ ইউনিয়নের ওপর হস্তক্ষেপ করে এবং জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় লুলাকে গ্রেফতারও করা হয়।
তবে দমন-পীড়ন তার জনপ্রিয়তা কমাতে পারেনি। বরং শ্রমিকদের অধিকার এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিতি বাড়ে। এ সময় ব্রাজিলে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিও জোরালো হচ্ছিল। লুলা বুঝতে পারেন, শ্রমিকদের দাবি বাস্তবায়নে শুধু কারখানা বা ইউনিয়নের আন্দোলন যথেষ্ট নয়, রাষ্ট্রক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও প্রতিনিধিত্ব প্রয়োজন।
১৯৮০ সালে শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা, বুদ্ধিজীবী, সামাজিক আন্দোলনের প্রতিনিধি ও বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ওয়ার্কার্স পার্টি বা পার্টিদো দোস ত্রাবালহাদোরেস (পিটি)। দলটি শ্রমিকের অধিকার, দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেয়। দলটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে লুলা দ্রুত জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন।
১৯৮৬ সালে সাও পাওলো থেকে ফেডারেল ডেপুটি নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৮৯ সালে সামরিক শাসন-পরবর্তী প্রথম সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন। কিন্তু দ্বিতীয় দফার ভোটে ফার্নান্দো কোলর দে মেলোর কাছে হেরে যান। ১৯৯৪ ও ১৯৯৮ সালের নির্বাচনেও পরাজিত হন। তবে প্রতিটি নির্বাচনে তার পরিচিতি ও সমর্থনের ভিত্তি বিস্তৃত হতে থাকে।
২০০২ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট
পরপর তিনবার পরাজয়ের পর ২০০২ সালের নির্বাচনে কৌশল বদলান লুলা। শ্রমিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকারের প্রশ্নে নিজের অবস্থান ধরে রাখলেও অর্থনীতি ও বিনিয়োগের বিষয়ে তুলনামূলক মধ্যপন্থি বার্তা দেন। এতে ব্যবসায়ী ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের একাংশের উদ্বেগ কমে। নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি।
শ্রমিক পরিবার থেকে উঠে আসা একজন নেতার রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া ব্রাজিলের রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। তার সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ছিল ক্ষুধা ও দারিদ্র্য কমানো। দরিদ্র পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচি, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক সুরক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। এসব উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রাজিলের পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও তার সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
লুলার প্রথম দুই মেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সামাজিক কর্মসূচির সম্প্রসারণের ফলে লাখো মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পায়। সরকার দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোগব্যয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের সময়ও ব্রাজিলের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে টিকে থাকার বিষয়টি তার সরকারের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়।
২০০৬ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে নির্বাচিত হন লুলা। ২০১০ সালে তার সমর্থিত প্রার্থী দিলমা রুসেফ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। দুই মেয়াদ শেষে ক্ষমতা ছাড়লেও লুলার রাজনৈতিক প্রভাব অটুট ছিল। তবে তার দল ও সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পরবর্তী সময়ে বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করে।
দুর্নীতির মামলা, কারাবাস ও প্রত্যাবর্তন
লুলার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে দুর্নীতির তদন্তের সময়। ব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পেট্রোব্রাসকে ঘিরে দুর্নীতির তদন্ত এবং ‘অপারেশন কার ওয়াশ’ নামে পরিচিত অভিযানের সময় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। ২০১৭ সালে একটি মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। পরের বছর কারাগারে যাওয়ায় ২০১৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি তিনি। তার সমর্থকদের দাবি ছিল, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে। বিপরীতে বিরোধীরা অভিযোগ করেন, দুর্নীতির দায় এড়াতে তিনি রাজনৈতিক সমর্থন কাজে লাগাচ্ছেন।
২০১৯ সালে মুক্তি পান লুলা। ২০২১ সালে ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে দেওয়া সাজা বাতিল করে। আদালতের সিদ্ধান্তে বলা হয়, যে আদালত তার বিচার করেছিল, সেই আদালতের এ মামলার বিচার করার এখতিয়ার ছিল না। সংশ্লিষ্ট বিচারকের নিরপেক্ষতা নিয়েও আদালত প্রশ্ন তোলে। এর ফলে লুলার রাজনৈতিক অধিকার ফিরে আসে এবং তিনি আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ পান।
২০২২ সালের নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন তৎকালীন ডানপন্থি প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো। তীব্র মেরুকরণ ও উত্তেজনার মধ্যে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে দ্বিতীয় দফায় বলসোনারোকে হারিয়ে জয়ী হন লুলা। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। তার এ জয়কে সমর্থকেরা গণতন্ত্র ও সামাজিক নীতির প্রত্যাবর্তন হিসেবে দেখেন। তবে বলসোনারোর সমর্থকদের বড় অংশের মধ্যে লুলাবিরোধী মনোভাবও বজায় থাকে।
কেন যুক্তরাষ্ট্রের কট্টর সমালোচক লুলা?
লুলার পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, বড় শক্তিগুলোর প্রভাবের বাইরে থেকে ব্রাজিলের স্বাধীন অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা। তিনি বহুপক্ষীয় কূটনীতি, আন্তর্জাতিক সংলাপ এবং জাতিসংঘের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন। তার মতে, সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির জোরে কোনো দেশ অন্য দেশের ওপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে না। এ অবস্থান তাকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নীতির সমালোচক হিসেবে পরিচিত করেছে।
বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে লুলা প্রকাশ্যে আপত্তি জানিয়েছেন। ২০২৬ সালের এপ্রিলে স্পেনের সংবাদপত্র এল পায়েসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের হুমকিমূলক বক্তব্যের সমালোচনা করেন তিনি। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির প্রসঙ্গে লুলা বলেন, কোনো দেশের নেতারই সকালে উঠে অন্য একটি দেশকে হুমকি দেওয়ার অধিকার নেই। সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা আছে বলেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকে নিজের নিয়মে চালাতে পারে, এমন ধারণাকেও তিনি ভুল বলে মন্তব্য করেন।
লুলার এ অবস্থানের পেছনে ব্রাজিলের ঐতিহাসিক কূটনৈতিক নীতিরও ভূমিকা রয়েছে। দেশটি লাতিন আমেরিকার আঞ্চলিক সহযোগিতা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে গ্লোবাল সাউথের প্রভাব বাড়ানোর পক্ষে কথা বলে আসছে। লুলা মনে করেন, আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনে কেবল সামরিক শক্তি নয়, আলোচনা ও কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ কারণেই ভেনেজুয়েলা, ইরান এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা পদক্ষেপের বিরোধিতা করেছেন তিনি।
গাজা ইস্যুতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে সরব
ইসরাইলের গাজা অভিযান নিয়ে লুলার বক্তব্য তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও আলোচনায় এনেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলায় ইসরাইলি বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনার নিন্দা জানালেও গাজায় ইসরাইলের সামরিক প্রতিক্রিয়াকে তিনি অতিরিক্ত ও নির্বিচার বলে সমালোচনা করেন। তার বক্তব্য, হামাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর অজুহাতে নারী ও শিশুদের হত্যা গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে কথা বলেছেন।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মিসর সফরের সময় লুলা ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেন। তার বক্তব্য ঘিরে ইসরাইলের সঙ্গে ব্রাজিলের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। ইসরাইলি সরকার তার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানায় এবং দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ে। লুলার সমর্থকেরা বলেন, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বন্ধ করা ও আন্তর্জাতিক মানবিক আইন রক্ষার প্রশ্নে তিনি নীতিগত অবস্থান নিয়েছেন। তবে সমালোচকদের মতে, তার ব্যবহৃত কিছু তুলনা ও ভাষা অপ্রয়োজনীয়ভাবে উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
লুলার অবস্থানকে শুধু ইসরাইলবিরোধিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করলে তার কূটনৈতিক বক্তব্যের পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। তিনি একদিকে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকারের পক্ষে কথা বলেছেন, অন্যদিকে ইসরাইলি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলারও নিন্দা জানিয়েছেন। তার ঘোষিত অবস্থান হলো, দীর্ঘমেয়াদি শান্তির জন্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রয়োজন। তবে গাজা যুদ্ধ নিয়ে তার তীব্র ভাষা এবং ইসরাইলি সরকারের নীতির সরাসরি সমালোচনার কারণেই তাকে ইসরাইলের অন্যতম কঠোর সমালোচক হিসেবে দেখা হয়।
২০২৬ সালে আবারও আলোচনায় লুলা
২০২৬ সালের নির্বাচনে ডানপন্থি সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর বিরুদ্ধে জয় পেয়ে চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন লুলা। তার এই জয়কে ঘিরে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। মেক্সিকো, কানাডা, কিউবা ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের নেতারা তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে অবশ্য প্রতিক্রিয়া একরকম নয়। ট্রাম্পের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ভোটগ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে বার্নি স্যান্ডার্সসহ কয়েকজন প্রগতিশীল মার্কিন রাজনীতিক লুলার জয়কে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
নতুন মেয়াদে লুলার সামনে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দেশের ভেতরে জীবনযাত্রার ব্যয়, অপরাধ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রাজনৈতিক বিভাজন নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং পরিবেশ সুরক্ষার মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আমাজন বনাঞ্চল রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তার সরকারের অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
লুলার রাজনৈতিক শক্তির বড় অংশ আসে সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সংযোগ থেকে। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা, শ্রমিক হিসেবে কাজ করা এবং ইউনিয়ন আন্দোলনের অভিজ্ঞতা তাকে শ্রমজীবী মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছে। সামাজিক সহায়তা ও দারিদ্র্য হ্রাসের কর্মসূচিও তার সমর্থনের ভিত্তি শক্তিশালী করেছে। তবে দুর্নীতির অভিযোগ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং তার পররাষ্ট্রনীতির কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কও রয়ে গেছে।

-6adedc930e1d1.jpg)
-6aded995265ff.jpg)
-6aded0c2214ef.jpg)
