শতবর্ষী মসজিদ সরাতে চায় মোদি সরকার, বিকল্প জায়গা নিয়ে প্রশ্ন আদালতে
Advertisement
কলকাতা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:০৮ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির কৃষি ভবন চত্বর থেকে শতবর্ষী কাদেমি মসজিদ সরিয়ে নেওয়ার পক্ষে দিল্লি হাইকোর্টে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার। সরকারি দপ্তরের চত্বরে স্থায়ী ধর্মীয় স্থাপনা থাকা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে আদালতে জমা দেওয়া এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।
তবে মসজিদটি সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিকল্প জায়গা দেওয়ার নিয়ম কী, তা জানতে চেয়েছেন আদালত। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছেন বিচারপতি। সেন্ট্রাল ভিস্তা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কৃষি ভবন ও পাশের শাস্ত্রী ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ কারণে কৃষি ভবন চত্বরে অবস্থিত কাদেমি মসজিদ সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে কেন্দ্র। সরকারের যুক্তি, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বজায় রাখা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) প্রকাশিত কেন্দ্রের এই অবস্থানের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট হয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে মসজিদটি বর্তমান অবস্থান থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। আগামী ২৩ নভেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।
তবে কাদেমি মসজিদের ইতিহাস কেন্দ্রীয় সরকারের যুক্তিকে ঘিরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নতুন রাজধানী নির্মাণের জন্য জমি জরিপ শুরু হয়। সে সময়ের সরকারি নথিতেই মসজিদটির অস্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়।
১৯১২ সালে ব্রিটিশ স্থপতি এডউইন লুটিয়েন্স যখন নয়াদিল্লির নকশা তৈরি করছিলেন, তখনকার সরকারি মানচিত্রেও কাদেমি মসজিদের অবস্থান চিহ্নিত ছিল। অর্থাৎ, ১৯৫৭ সালে কৃষি ভবন নির্মাণের অনেক আগে থেকেই ওই স্থানে মসজিদটি ছিল।
এ ছাড়া ১৯৭০ সালের দিল্লি সরকারি গেজেটেও কাদেমি মসজিদকে বৈধ ও তালিকাভুক্ত ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
এই মসজিদসহ সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকা ছয়টি মসজিদের সুরক্ষা চেয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড। তখন কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানিয়েছিলেন, এসব ধর্মীয় স্থাপনার কোনো ক্ষতি করা হবে না। প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদি এবং তখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেছিলেন।
তবে এবার কেন্দ্রের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা গেছে। মসজিদ সরানোর পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতার যুক্তি তুলে ধরেছে সরকার।
শুনানিতে কেন্দ্রের আইনজীবী নিশান্ত গৌতমের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি দয়াল জানতে চান, কোনো ধর্মীয় স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হলে বিকল্প জায়গা দেওয়ার বিষয়ে কী নিয়ম রয়েছে। সব ধর্মীয় স্থাপনার ক্ষেত্রেই কি বিকল্প জায়গা দেওয়া হবে না, নাকি সরকারি স্থানে কোনো সম্প্রদায়ের প্রার্থনার জায়গা থাকতে পারবে না—সে বিষয়ে কেন্দ্রের অবস্থান স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিচারপতি আরও বলেন, সরকারি সম্পত্তিতে ধর্মীয় স্থাপনা থাকা অননুমোদিত—সরকারের এই বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ ও প্রভাব পরিষ্কার হলে আদালতের পক্ষে আইনি অবস্থান নির্ধারণ সহজ হবে।
ফলে কাদেমি মসজিদ সরানোর বিষয়টি এখন শুধু উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মসজিদটির ঐতিহাসিক অস্তিত্ব, ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি, ধর্মীয় অধিকার এবং রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক ব্যাখ্যার প্রশ্ন।

