Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

যেভাবে মিসরের রাজত্বে ইউসুফ (আ.)

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম

যেভাবে মিসরের রাজত্বে ইউসুফ (আ.)

মিসরের রাজত্বে ইউসুফ (আ.)

Advertisement

মানুষের জীবনে বিপদ, অপবাদ, একাকিত্ব ও অপেক্ষা—এসবই আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা; কিন্তু যে ব্যক্তি ধৈর্য, সততা ও আল্লাহর ওপর অটল ভরসা রাখে, তার জন্য পরীক্ষার অন্ধকারও একদিন সম্মানের আলো হয়ে ওঠে। এই সত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলেন হজরত ইউসুফ (আ.)।

কুরআনে তার জীবনের কাহিনী এমন হৃদয়স্পর্শী ও শিক্ষণীয়ভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ নিজেই এটিকে বলেছেন—

نَحْنُ نَقُصُّ عَلَيْكَ أَحْسَنَ الْقَصَصِ

‘আমি তোমার কাছে সর্বোত্তম কাহিনি বর্ণনা করছি।’ (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৩)

শৈশবের স্বপ্ন ও ঈর্ষার সূচনা

নবী হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর প্রিয়সন্তান ছিলেন ইউসুফ (আ.)। শৈশবে তিনি এক বিস্ময়কর স্বপ্ন দেখেন—

إِذْ قَالَ يُوسُفُ لِأَبِيهِ يَا أَبَتِ إِنِّي رَأَيْتُ أَحَدَ عَشَرَ كَوْكَبًا وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ رَأَيْتُهُمْ لِي سَاجِدِينَ

‘হে আমার পিতা! আমি দেখেছি এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য ও চাঁদ—তারা আমাকে সিজদা করছে।’ (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৪)

এই স্বপ্ন ভবিষ্যতের মিসরের রাজত্বে উচ্চ মর্যাদা ও নেতৃত্বের ইঙ্গিত বহন করছিল। কিন্তু ভাইদের ঈর্ষা তাকে কূপে নিক্ষেপের মাধ্যমে জীবনের কঠিন পরীক্ষার পথে ঠেলে দেয়। পরে তিনি কাফেলার মাধ্যমে মিসরে দাস হিসেবে বিক্রি হন।

দাসত্ব থেকে কারাগার

মিসরে তিনি আজিজের গৃহে আশ্রয় পান। সততা, সৌন্দর্য ও চরিত্রের দৃঢ়তায় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন; কিন্তু আজিজের স্ত্রীর কুপ্রস্তাবে সাড়া না দেওয়ায় অন্যায়ের শিকার হয়ে কারাগারে বন্দি হন হজরত ইউসুফ (আ.)।

এই কঠিন সময়ে তিনি আল্লাহর প্রতি আস্থা হারাননি। বরং দোয়া করেন—

رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ

‘হে আমার রব! তারা আমাকে যে কাজে আহ্বান করছে তার চেয়ে কারাগারই আমার কাছে অধিক প্রিয়।’ (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৩৩)

এখানে তার তাকওয়া ও আত্মসম্মানবোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত প্রকাশ পায়।

কারাগারে দাওয়াত ও প্রজ্ঞার পরিচয়

কারাগারেও তিনি দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া বন্ধ করেননি। সহবন্দিদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়ার আগে তিনি তাওহিদের আহ্বান জানান—

يَا صَاحِبَيِ السِّجْنِ أَأَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ

‘হে কারাগারের দুই সাথী! বহু উপাস্য কি উত্তম, না একক পরাক্রমশালী আল্লাহ?’ (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৩৯)

তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী দুই বন্দির স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়, যা পরবর্তীতে তার মুক্তির পথ সুগম করে।

রাজদরবারে সম্মান ও দায়িত্ব

কয়েক বছর পর মিসরের বাদশাহ অদ্ভুত এক স্বপ্ন দেখেন—সাতটি মোটা গরু সাতটি শুকনো গরু দ্বারা গ্রাস হচ্ছে, আর সাতটি সবুজ ও সাতটি শুকনো শীষ। কেউ এর ব্যাখ্যা দিতে না পারায় ইউসুফ (আ.)-এর কথা স্মরণ করা হয়।

তিনি (হজরত ইউসুফ আ.) জানান, সাত বছর প্রাচুর্যের পর সাত বছর দুর্ভিক্ষ আসবে এবং আগাম শস্য সংরক্ষণের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

তার জ্ঞান ও দূরদর্শিতায় মুগ্ধ হয়ে বাদশাহ বলেন—

إِنَّكَ الْيَوْمَ لَدَيْنَا مَكِينٌ أَمِينٌ

‘আজ থেকে তুমি আমাদের কাছে ক্ষমতাবান ও বিশ্বস্ত।’ (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৫৪)

এরপর ইউসুফ (আ.) নিজেই দায়িত্ব প্রার্থনা করেন—

اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ

‘আমাকে দেশের ভাণ্ডারের দায়িত্ব দিন; নিশ্চয়ই আমি সংরক্ষণকারী ও জ্ঞানী।’ (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৫৫)

এভাবেই একজন দাস ও বন্দি থেকে আল্লাহর পরিকল্পনায় মিসরের রাজত্বের অর্থব্যবস্থার প্রধান হয়ে ওঠেন।

শিক্ষা ও প্রেরণা

ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় আমাদের শেখায়—

  • ঈর্ষা ও ষড়যন্ত্র সাময়িক
  • ধৈর্য স্থায়ী
  • চরিত্রের পবিত্রতা শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়
  • আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের পরিকল্পনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ

কুরআন ঘোষণা করে—

إِنَّهُ مَن يَتَّقِ وَيَصْبِرْ فَإِنَّ اللَّهَ لَا يُضِيعُ أَجْرَ الْمُحْسِنِينَ

‘যে তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।’ (সুরা ইউসুফ: আয়াত ৯০)

ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনী কেবল অতীতের ইতিহাস নয়; এটি প্রতিটি মুমিনের জীবনের জন্য দিকনির্দেশনা। কূপের অন্ধকার, দাসত্বের অপমান, কারাগারের নিঃসঙ্গত—সবকিছু পেরিয়ে তিনি রাজদরবারে সম্মানিত হয়েছেন এবং  মিসরের রাজত্বে সম্মানের স্থানে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

এ শিক্ষা আমাদের মনে গেঁথে দেয়—

ধৈর্য কখনো ব্যর্থ হয় না, সততা কখনো হারায় না, আর আল্লাহর ওপর ভরসা কখনো বৃথা যায় না।

যিনি কূপ থেকে সিংহাসনে তুলতে পারেন, তিনি আজও তার বান্দাদের ভাগ্য বদলাতে সক্ষম। তাই বিপদের সময় হতাশ না হয়ে ধৈর্য, ইমান ও নৈতিকতায় অটল থাকাই মুমিনের পথ।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে ইউসুফ (আ.)-এর মতো ধৈর্যশীল ও আমানতদার হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? ইসলামের বিধান কী?

দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? ইসলামের বিধান কী?

ধূমপানের কারণে কি অজু ভেঙে যায়?

ধূমপানের কারণে কি অজু ভেঙে যায়?

ইচ্ছাকৃত নামাজ কাজা করলে ক্ষমা পাওয়া যাবে কি?

ইচ্ছাকৃত নামাজ কাজা করলে ক্ষমা পাওয়া যাবে কি?

‘হাজিদের অর্থ ফেরত পাওয়া তারেক রহমান সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য’

‘হাজিদের অর্থ ফেরত পাওয়া তারেক রহমান সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য’

ঘুমের সময় মানুষের রূহ কোথায় থাকে, ঘুম ও মৃত্যুর রহস্য কী?

ঘুমের সময় মানুষের রূহ কোথায় থাকে, ঘুম ও মৃত্যুর রহস্য কী?

যে নামাজ পড়ে আল্লাহকে ভালোবাসার প্রমাণ দেখাতে হয়

যে নামাজ পড়ে আল্লাহকে ভালোবাসার প্রমাণ দেখাতে হয়

আরও পড়ুন

ইমামের আগে দাঁড়ালে কি মুক্তাদির নামাজ হবে?

ইমামের আগে দাঁড়ালে কি মুক্তাদির নামাজ হবে?

দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? ইসলামের বিধান কী?

দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? ইসলামের বিধান কী?

শেষ রাতের যে ৫ আমল বদলে দিতে পারে জীবন

শেষ রাতের যে ৫ আমল বদলে দিতে পারে জীবন

ধূমপানের কারণে কি অজু ভেঙে যায়?

ধূমপানের কারণে কি অজু ভেঙে যায়?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম