Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

বিদায় হজের ভাষণ কেন বিশ্বমানবতার মুক্তির সনদ?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ০২:৩৮ পিএম

বিদায় হজের ভাষণ কেন বিশ্বমানবতার মুক্তির সনদ?

বিদায় হজের ভাষণ থেকে মুসলমানদের করণীয়। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু ঘটনা রয়েছে, যা যুগে যুগে মানবজাতির জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। বিদায় হজের ভাষণ তার মধ্যে অন্যতম। এটি শুধু একটি ঐতিহাসিক বক্তব্য নয়; বরং মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, নারী-পুরুষের মর্যাদা, অর্থনৈতিক ন্যায্যতা এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের এক চিরন্তন ঘোষণা।

দশম হিজরিতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তার জীবনের একমাত্র ফরজ হজ সম্পাদন করেন, যা ইতিহাসে ‘হজ্জাতুল বিদা’ বা বিদায় হজ নামে পরিচিত। কারণ, এর পরবর্তী বছরেই তিনি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে মহান রবের সান্নিধ্যে চলে যান। তাই বিদায় হজের ভাষণকে ইসলামের সারসংক্ষেপ এবং মানবজাতির জন্য নববী নির্দেশনার শেষ মহাঘোষণা বলা হয়। এটি মানবজাতির জন্য মুক্তির মহাসনদ।

মহানবী (সা.)-এর একমাত্র হজ

হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, কাতাদা (রহ.) বলেন—

قُلْتُ لِأَنَسٍ كَمْ حَجَّ النَّبِيُّ ﷺ؟ قَالَ: حَجَّ حَجَّةً وَاحِدَةً

‘আমি আনাস (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, রাসুলুল্লাহ (সা.) কতবার হজ করেছেন? তিনি বললেন, ‘তিনি একবারই হজ করেছেন।’ (বুখারি ১৭৭৮)

এই হজের সময় ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে এবং ১০ জিলহজ মিনায় লক্ষাধিক সাহাবির সামনে মহানবী (সা.) একাধিক ভাষণ প্রদান করেন। এসব ভাষণই ইতিহাসে ‘বিদায় হজের ভাষণ’ নামে সংরক্ষিত হয়েছে। মহানবী (সা.)-এর দৃঢ় আশঙ্কা ছিল—এটিই তাঁর জীবনের সর্বশেষ হজ এবং তাঁর জীবদ্দশায় মুসলিমদের সর্বশেষ বিশ্ব সম্মেলন। তাই জীবনসায়াহ্নে দাঁড়িয়ে জাতির সামনে ইসলামের সারাংশ তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন তিনি। ঐতিহাসিক এ ভাষণ মহানবী (সা.)-এর নবীজীবনের উপসংহার এবং মানবজাতির মুক্তির সনদ।

দ্বীনের পূর্ণতা ঘোষণার ঐতিহাসিক মুহূর্ত

বিদায় হজের ভাষণের পর মহান আল্লাহ ইসলামের পূর্ণতার ঘোষণা দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا

‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।’ (সুরা আল-মায়িদাহ: আয়াত ৩)

এ আয়াত ইসলামের পরিপূর্ণতা এবং নবুয়তের দায়িত্ব পূর্ণ হওয়ার ঐতিহাসিক সাক্ষ্য বহন করে।

মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা

বিদায় হজের ভাষণে মহানবী (সা.) মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানকে পবিত্র ঘোষণা করেন। হজরত জাবির (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

إِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ حَرَامٌ عَلَيْكُمْ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا

‘নিশ্চয় তোমাদের রক্ত (জীবন) ও সম্পদ তোমাদের জন্য এমনই পবিত্র, যেমন পবিত্র তোমাদের এই দিন, এই মাস এবং এই নগরী।’ (মুসলিম ১২১৮, ৩০০৯)

এ ঘোষণা মানবাধিকারের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।

সুদ, জাহিলিয়াত ও অন্যায়ের অবসান

রাসুলুল্লাহ (সা.) জাহিলি যুগের সব কুসংস্কার, রক্তপণ এবং সুদ প্রথা বাতিল ঘোষণা করেন। তিনি বলেন—

أَلَا وَإِنَّ كُلَّ رِبًا مِنْ رِبَا الْجَاهِلِيَّةِ مَوْضُوعٌ

‘সাবধান! জাহিলি যুগের সমস্ত সুদ বাতিল করা হলো।’ (মুসলিম)

এ শিক্ষা মুসলমানদের অর্থনৈতিক শোষণ, অন্যায় লেনদেন ও সুদভিত্তিক অবিচার থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়।

নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা

বিদায় হজের ভাষণে নারীদের অধিকার ও সম্মান রক্ষার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

فَاتَّقُوا اللَّهَ فِي النِّسَاءِ

‘তোমরা নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো।’ (মুসলিম)

তিনি আরও বলেন যে, নারীরা আল্লাহর আমানত। তাই তাদের ন্যায়সংগত ভরণপোষণ, পোশাক এবং মর্যাদা নিশ্চিত করা পুরুষদের দায়িত্ব।

কুরআন-সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার নির্দেশ

মানুষ যাতে পথভ্রষ্ট না হয়, সে জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মাহর জন্য সবচেয়ে বড় দিকনির্দেশনা দিয়ে যান। তিনি বলেন—

تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ لَنْ تَضِلُّوا مَا تَمَسَّكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ

‘আমি তোমাদের মাঝে দুটি বিষয় রেখে যাচ্ছি; যতদিন তোমরা এ দুটিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে, ততদিন পথভ্রষ্ট হবে না— আল্লাহর কিতাব এবং তার নবীর সুন্নাহ।’ (মুয়াত্তা)

এটি মুসলমানদের জন্য কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক জীবন গঠনের আহ্বান।

বর্ণবৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা

বিদায় হজের ভাষণের সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তাগুলোর একটি ছিল মানবসমতা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

أَلَا لَا فَضْلَ لِعَرَبِيٍّ عَلَى أَعْجَمِيٍّ وَلَا لِأَعْجَمِيٍّ عَلَى عَرَبِيٍّ وَلَا لِأَحْمَرَ عَلَى أَسْوَدَ وَلَا لِأَسْوَدَ عَلَى أَحْمَرَ إِلَّا بِالتَّقْوَى

‘কোনো আরবের ওপর অনারবের এবং কোনো অনারবের ওপর আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কোনো সাদার ওপর কালোর এবং কালোর ওপর সাদার শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া।’ (মুসনাদে আহমদ ২৩৪৮৯)

এই ঘোষণা জাতি, বর্ণ, ভাষা ও গোত্রভিত্তিক সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে ইসলামের সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরে।

বিদায় হজের ভাষণ থেকে মুসলমানদের করণীয়

বিদায় হজের ভাষণ থেকে একজন মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করণীয় হলো—

> মানুষে-মানুষে হানাহানি, খুনোখুনি ও অন্যায় বন্ধ করা।

> সুদ ও সব ধরনের অর্থনৈতিক শোষণ থেকে দূরে থাকা।

> জাহিলি মানসিকতা ও কুসংস্কার পরিহার করা।

> নারীকে সম্মান করা এবং তার অধিকার নিশ্চিত করা।

> কুরআন ও সুন্নাহকে জীবনের পথনির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করা।

> বর্ণ, ভাষা ও জাতিগত বৈষম্য পরিহার করা।

> ন্যায়বিচার ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠন করা।

> শ্রমিক, দুর্বল ও নিপীড়িত মানুষের অধিকার রক্ষা করা।

> মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখা।

> তাকওয়া ও আল্লাহভীতিকে জীবনের প্রধান মানদণ্ড বানানো।

বিদায় হজের ভাষণ শুধু সপ্তম শতাব্দীর আরব সমাজের জন্য নয়; এটি সব যুগ ও সব মানুষের জন্য এক অনন্য জীবনবিধান। মানবাধিকার, ন্যায়বিচার, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং আল্লাহভীতির যে শিক্ষা মহানবী (সা.) এই ভাষণের মাধ্যমে দিয়েছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। যদি ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে বিদায় হজের ভাষণের শিক্ষা বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বৈষম্য, অন্যায়, শোষণ ও বিভক্তির পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হবে শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার এক সুন্দর সমাজ।

আসুন, আমরা বিদায় হজের ভাষণকে শুধু ইতিহাসের অংশ হিসেবে না দেখে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করি। কেননা এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে দুনিয়ার কল্যাণ এবং আখিরাতের মুক্তির পথ।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

যে দোয়ায় কেউ খালি হাতে ফিরে না

যে দোয়ায় কেউ খালি হাতে ফিরে না

আত্মীয়-স্বজন জালেম হলে আপনার আচরণ কেমন হবে?

আত্মীয়-স্বজন জালেম হলে আপনার আচরণ কেমন হবে?

অপমানের বিপরীতে মুমিনের জবাবের ভাষা কী হবে?

অপমানের বিপরীতে মুমিনের জবাবের ভাষা কী হবে?

বাবা-মায়ের গুনাহের দায় কি সন্তানের ওপর পড়ে?

বাবা-মায়ের গুনাহের দায় কি সন্তানের ওপর পড়ে?

ক্ষুধার্ত মানুষের তৃপ্তিময় হাসি যখন শ্রেষ্ঠ ইবাদত

ক্ষুধার্ত মানুষের তৃপ্তিময় হাসি যখন শ্রেষ্ঠ ইবাদত

ফরজ গোসলের সময় নাকের ভেতরে পানি কতদূর পৌঁছাতে হবে?

ফরজ গোসলের সময় নাকের ভেতরে পানি কতদূর পৌঁছাতে হবে?

আরও পড়ুন

যে দোয়ায় কেউ খালি হাতে ফিরে না

যে দোয়ায় কেউ খালি হাতে ফিরে না

আত্মীয়-স্বজন জালেম হলে আপনার আচরণ কেমন হবে?

আত্মীয়-স্বজন জালেম হলে আপনার আচরণ কেমন হবে?

অপমানের বিপরীতে মুমিনের জবাবের ভাষা কী হবে?

অপমানের বিপরীতে মুমিনের জবাবের ভাষা কী হবে?

পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ, শরিয়তে শাস্তির কী বিধান

পুরুষের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মিথ্যা অভিযোগ, শরিয়তে শাস্তির কী বিধান

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম