অপমানের বিপরীতে মুমিনের জবাবের ভাষা কী হবে?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জীবন চলার পথে মানুষের কথা বা ব্যবহারে কষ্ট পাওয়া খুবই স্বাভাবিক এক অভিজ্ঞতা। কখনো কাছের মানুষের অবহেলা, কখনো পরিচিতদের কটূক্তি, আবার কখনো বা অনাত্মীয় কারও রূঢ় আচরণ আমাদের হৃদয়ে আঘাত হানে। এমন মুহূর্তে রক্ত গরম হয়ে যাওয়া কিংবা সঙ্গে সঙ্গে একটা কড়া জবাব দিয়ে অপমানকারীকে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার ইচ্ছা জাগাটা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি।
তবে প্রশ্ন হলো— আঘাতের জবাবে প্রত্যুত্তরে দেওয়ার প্রচলিত এই চর্চায় কি মানসিক প্রশান্তি মেলে? ইসলাম আমাদের শেখায় একটু ভিন্ন ও মহৎ পথ। জীবনের এসব প্রতিকূল পরিস্থিতিতে একজন মুমিন নিজের ভেতরের তেজকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে ধাবিত হবেন, তা নিয়েই এই আয়োজন।
প্রথমত— রাগের তাণ্ডব থামান: নীরবতাই প্রথম শক্তি
কেউ যখন অন্যায় আচরণ করে, তখন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে কেবল জটিলই করে তোলে। তুচ্ছ একটি কথা থেকে অনেক সময় সম্পর্কের স্থায়ী ভাঙন ধরে। তাই উত্তেজনার মুহূর্তে থামা এবং নীরব থাকাটাই সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমত্তা। হাদিসে পাকে এসেছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ
‘প্রকৃত বীর বা শক্তিশালী সেই ব্যক্তি নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে আছাড় দিয়ে হারিয়ে দেয়; বরং প্রকৃত শক্তিশালী তো সেই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।’ (বুখারি ৬১১৪, মুসলিম ২৬০৯)
দ্বিতীয়ত— উত্তম দিয়ে মন্দ আচরণকে জয় করুন
কেউ রূঢ় আচরণ করলেই যে আমাদেরও নেমে যেতে হবে সেই একই স্তরে, তা নয়। বরং প্রজ্ঞা ও হাসিমুখ দিয়ে অন্যায়কে প্রতিহত করাটাই সুন্নাহর আসল সৌন্দর্য। কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ۚ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ
‘ভালো ও মন্দ কখনো সমান হতে পারে না। আপনি মন্দকে প্রতিহত করুন তা দিয়ে, যা সবচেয়ে উত্তম। এতে আপনার সাথে যার শত্রুতা রয়েছে, সেও যেন এক অন্তরঙ্গ বন্ধুতে পরিণত হয়ে যায়।’ (সুরা ফুসসিলাত: আয়াত ৩৪)
ভালো ও মন্দের মৌলিক পার্থক্য
আল্লাহ তাআলা শুরুতেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—ভালো ও মন্দ কখনো এক হতে পারে না। প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, অন্যায়ের জবাবে একই আচরণ করাই বোধহয় যোগ্য জবাব। কিন্তু ক্ষোভ বা খারাপ আচরণের জবাবে যখন ভালো আচরণ করা হয়, তখন ইতিবাচকতার শক্তি নেতিবাচকতাকে ছাড়িয়ে যায়।
‘যা সবচেয়ে উত্তম’ তা দিয়ে মন্দকে প্রতিহত করা
আয়াতে বলা হয়েছে, কেবল ভালো আচরণই নয়, বরং ‘যা সবচেয়ে উত্তম’ (ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ) তা দিয়ে খারাপকে সামাল দিতে হবে। তাই—
- কেউ রূঢ় কথা বললে তার উত্তর হাসিমুখে দিতে হবে।
- কেউ ক্ষোভ দেখালে ধৈর্য ধরতে হবে।
- কেউ সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাইলে তার দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।
এটি মোটেও দুর্বলতা নয়; বরং এটি হলো প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের ভেতরের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানসিক শক্তির পরম প্রকাশ।
শত্রুকে অন্তরঙ্গ বন্ধুতে রূপান্তরের মনস্তত্ত্ব
আয়াতের শেষ অংশটি পরম বাস্তবতার এক মনস্তাত্ত্বিক সত্য ফুটিয়ে তোলে— ‘যার সঙ্গে শত্রুতা ছিল, সে হয়ে যাবে অন্তরঙ্গ বন্ধু।’
যখন মানুষ খারাপ আচরণের বদলে অনাকাঙ্ক্ষিত ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও ক্ষমা পায়, তখন তার নিজের ভেতরে অপরাধবোধ ও অনুশোচনা তৈরি হয়। এই অনুশোচনাই একসময় ঘৃণা ও শত্রুতাক ভেঙে চরম ভালোবাসায় রূপান্তর করে। প্রিয়নবী রাসুলুল্লাহ (স.)-এর পুরো দাওয়াত ও জীবনচরিত্রই ছিল এই আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন।
প্রতিশোধ নেওয়া সহজ, কিন্তু ক্ষমা করা ও খারাপের জবাবে ভালো উপহার দেওয়া মহান ব্যক্তিত্বের পরিচয়। আজকের সমাজে যেখানে কথায় কথায় ক্ষোভ, অহংকার ও সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়, সেখানে সুরা ফুসসিলাতের এই বাণীটি এক পরম শীতল বাতাসের মতো।
আমরা যদি আমাদের পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক জীবনে এই নীতিটি চর্চা করতে পারি, তবে বহু অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব চুকে যাবে এবং হৃদয়গুলো হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হয়ে প্রশান্তিতে ভরে উঠবে। মহান আল্লাহ আমাদের রাগের মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তম আচরণের মাধ্যমে সুন্দর সমাজ গড়ার তৌফিক দান করুন। আমিন।

