চুক্তিভিত্তিক বিয়ে: ইসলামি শরিয়তে এর বৈধতা ও বিধান
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিয়ে মানুষের জীবনের একটি অত্যন্ত পবিত্র ও সামাজিক বন্ধন। ইসলামে বিবাহব্যবস্থাকে কেবল আবেগ বা প্রয়োজনের নাম দেওয়া হয়নি, বরং একে একটি স্থায়ী ইবাদত ও দায়িত্বশীল চুক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে উন্নত দেশের নাগরিকত্ব বা ভিসাপ্রাপ্তির উদ্দেশ্যে ‘চুক্তিভিত্তিক বিয়ে’ বা কাগজ-কলমের বিয়ের প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। এটি ইসলামি দৃষ্টিতে কতটুকু শরিয়তসম্মত এবং এভাবে আকদ সম্পন্ন করলে শরিয়তের বিধানে বিবাহ সত্যি সম্পাদিত হয় কি না—তা জানা অত্যন্ত জরুরি।
ইসলামে ধোঁকা ও প্রতারণার কঠোর নিষেধাজ্ঞা
নাগরিকত্ব বা ভিসার সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে কোনো প্রকার বাস্তব সম্পর্ক ছাড়া চুক্তিভিত্তিক বিয়ে করা মূলত এক ধরনের জালিয়াতি ও অসত্যের আশ্রয় নেওয়া। ইসলামে কোনো অবস্থাতেই ধোঁকা ও প্রতারণা বৈধ নয়। একজন প্রকৃত মুমিনের মূল বৈশিষ্ট্য হলো সত্যবাদিতা ও আমানতদারি। কুরআন মজিদে মিথ্যা ও অসত্য থেকে বেঁচে থাকার বিষয়ে কঠোর নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন—
فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ
‘সুতরাং তোমরা মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো এবং পরিহার করো মিথ্যা কথা।’ (সুরা আল-হজ: আয়াত ৩০)
প্রতারণামূলক আচরণে লিপ্ত ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ থেকে বিচ্যুত। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে—
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا
‘যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি বা প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম ১০২)
এ ছাড়া লোকদেখানো বা প্রতারণামূলক কাজ মুনাফিকের আচরণ প্রকাশ করে। এ বিষয়ে আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন—
آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلاَثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ
‘মুনাফিকের আলামত তিনটি— কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা খেলাফ করে এবং আমানত রাখা হলে তাতে খেয়ানত করে।’ (বুখারি ৩৩)
ইসলামি শরিয়তে চুক্তিভিত্তিক বিয়ের কার্যকারিতা
উদ্দেশ্য যা-ই হোক না কেন, শরিয়তের নির্ধারিত নিয়ম মেনে আকদ করা হলে ইসলামি আইনে তার প্রভাব পড়ে। বিয়ের নিয়ম অনুযায়ী দুজন যোগ্য সাক্ষীর উপস্থিতিতে প্রস্তাব (ইজাব) ও সম্মতি (কবুল) সম্পন্ন হলে বিবাহ সম্পাদিত হয়ে যায়— তা আন্তরিকভাবে করা হোক কিংবা কোনো সুবিধাপ্রাপ্তির ছলে করা হোক।
কারণ বিয়ে ও তালাকের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে রসিকতা বা অভিনয়ের সুযোগ নেই। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
ثَلاَثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ: النِّكَاحُ، وَالطَّلاَقُ، وَالرَّجْعَةُ
‘তিনটি বিষয় এমন, যা গাম্ভীর্যের সঙ্গে করলেও তা কার্যকরী হয় এবং ঠাট্টা-ছলে করলেও তা ধর্তব্য ও কার্যকর হয়; বিষয়গুলো হলো— বিবাহ, তালাক এবং তালাকে রাজঈর পর স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়া।’ (তিরমিজি ১১৮৪, আবু দাউদ ২১৯৪)
অতএব, দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে শরিয়তসম্মত ইজাব-কবুল হলে শরিয়তের বিচারে তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য হবেন। পরবর্তীতে যদি তারা আলাদা হতে চান, তবে ইসলামি শরিয়তের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে তালাক বা খোলার মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে হবে। বিচ্ছেদ না হওয়া পর্যন্ত স্ত্রী অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারবেন না; করলে তা বাতেল বলে গণ্য হবে।
তবে শরিয়তসম্মত ইজাব-কবুল ছাড়া যদি কেবল কাগজপত্রে বা রেজিস্ট্রি নথিতে স্বাক্ষর করা হয় এবং সেখানে সাক্ষীদের সামনে শরিয়তের আকদ সম্পাদিত না হয়, তবে ইসলামে তা বিবাহ হিসেবে গণ্য হবে না। ফলে ইসলামি দৃষ্টিতে কোনো বৈবাহিক সম্পর্কও তৈরি হবে না এবং বিচ্ছেদের জন্য পৃথক তালাকেরও প্রয়োজন পড়বে না।

