ইসলামে অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ: বিধান, শর্ত ও শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি কী?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:১২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পরিবার পরিকল্পনা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ আধুনিক যুগে একটি বহুল আলোচিত বিষয়। বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রীর মিলনের পর অপরিকল্পিত গর্ভধারণ এড়াতে কনডম বা অন্যান্য অস্থায়ী জন্মবিরতিকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করা যাবে কি না—এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে নানা প্রশ্ন থাকে। ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে মূলনীতি হলো, সন্তান লাভ আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান নেয়ামত এবং বংশবৃদ্ধি ইসলামের একটি মৌলিক উদ্দেশ্য। তবে নির্দিষ্ট কিছু বাস্তবসম্মত কারণ বা ওজরের ভিত্তিতে অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করার অনুমতি ইসলামে রয়েছে।
অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণের শরয়ি বিধান ও মূলনীতি
ইসলামে স্বতঃস্ফূর্ত বংশবৃদ্ধি এবং অধিক সন্তান লাভকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তাই কোনো প্রকার যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া জন্মবিরতি পালন করা অপছন্দনীয়। তবে স্থায়ীভাবে সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা নষ্ট না করে, কনডম ব্যবহার, পিল বা অন্যান্য অস্থায়ী পদ্ধতি অবলম্বন করা শরীয়তের নির্ধারিত শর্ত সাপেক্ষে জায়েজ।
ইসলামে অস্থায়ী জন্মবিরতির মূলনীতিগুলো নিচে তুলে ধরা হলো—
১. গ্রহণযোগ্য কারণ বা ওজরের ভিত্তিতে অনুমতি
যদি স্ত্রীর শারীরিক চরম অসুস্থতা, মারাত্মক দুর্বলতা, ঘন ঘন গর্ভধারণের কারণে স্বাস্থ্যের অবক্ষয়, কিংবা আগের ছোট বাচ্চার দুগ্ধপানে ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা থাকে, তবে সাময়িকভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি (যেমন: কনডম, ট্যাবলেট ইত্যাদি) গ্রহণ করা সম্পূর্ণ জায়েজ।
২. অভাব বা রিযিকের ভয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ হারাম
‘সন্তানকে খাওয়াব কী?’, ‘ভরণপোষণ কীভাবে দেব?’ কিংবা অর্থনৈতিক সংকটের ভয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম। কারণ রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা।
কুরআন ও হাদিসের আলোকচ্ছটা
বংশবৃদ্ধি, রিজিক এবং জন্মবিরতির বিষয়ে কুরআন ও হাদিসে সুস্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে—
রিজিকের ভয়ে সন্তান হত্যা বা জন্মরোধের নিষেধাজ্ঞা
আল্লাহ তাআলা কুরআনে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি প্রতিটি প্রাণীর রিজিকের জামিনদার। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ خَشْيَةَ إِمْلَاقٍ نَّحْنُ نَرْزُقُهُمْ وَإِيَّاكُمْ إِنَّ قَتْلَهُمْ كَانَ خِطْئًا كَبِيرًا
‘দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমিই তাদেরকে রিজিক দিই এবং তোমাদেরকেও। নিশ্চয়ই তাদেরকে হত্যা করা মহাপাপ।’ (সুরা আল-ইসরা: আয়াত ৩১)
কন্যা সন্তান জীবন্ত দাফন ও তাদের অধিকার
জাহেলিয়াত যুগে রিজিক বা সামাজিক লজ্জার ভয়ে সন্তান নষ্ট বা হত্যা করা হতো, যার বিরুদ্ধে কুরআনে কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَإِذَا الْمَوْءُودَةُ سُئِلَتْ، بِأَيِّ ذَنبٍ قُتِلَتْ
‘আর যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?’ (সুরা অত-তাকভীর: আয়াত ৮-৯)
অধিক সন্তান জন্মদানে উৎসাহিতকরণ
রাসুলুল্লাহ (সা.) অধিক সন্তান জন্মদানকারী নারীকে বিবাহের পরামর্শ দিয়েছেন। হাদিসে পাকে এসেছে—
تَزَوَّجُوا الْوَدُودَ الْوَلُودَ فَإِنِّي مُكَاثِرٌ بِكُمُ الْأُمَمَ
‘তোমরা এমন নারীকে বিয়ে করো যে অধিক ভালোবাসে এবং অধিক সন্তান প্রসব করে। কারণ কিয়ামতের দিন আমি অন্যান্য উম্মতের সামনে আমার উম্মতের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গর্ব করব।’ (আবু দাউদ ২০৫০)
ফিকহ ও ফতোয়ার আলোকে অস্থায়ী আজল বা জন্মবিরতি
ইসলামি ফিকহের প্রখ্যাত কিতাবসমূহে সাহাবায়ে কেরামের যুগের ‘আজল’ (সহবাসের সময় বীর্য বাইরে ফেলা)-কে আধুনিক কনডম বা অস্থায়ী পদ্ধতির সাথে তুলনা করে শর্তসাপেক্ষে জায়েজ বলা হয়েছে।
জুমহুর ফুকাহায়ে কেরামের মত
অধিকাংশ ফকিহ ও আলেমদের মতে নির্দিষ্ট শর্তে আজল বা অস্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা জায়েজ।
وَالَّذِي عَلَيْهِ الْجُمْهُورُ وَالْفُقَهَاءُ أَنَّ الْعَزْلَ جَائِزٌ عَلَى شُرُوطٍ
‘অধিকাংশ ফকিহ ও আলেমের অভিমত হলো, নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে আজল (অস্থায়ী পদ্ধতি) জায়েজ।’ (আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া ১/৩৩৫)
সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কায় অনুমতি
গর্ভধারণের কারণে যদি পূর্বের দুগ্ধপোষ্য শিশুর দুধ শুকিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে এবং বিকল্প স্তন্যদানকারী রাখার সামর্থ্য না থাকে, তবে তা শরীয়তসম্মত ওজর হিসেবে গণ্য হবে।
وَمِنَ الْأَعْذَارِ أَنْ يَنْقَطِعَ لَبَنُهَا بَعْدَ ظُهُورِ الْحَمْلِ وَلَيْسَ لِأَبِي الصَّبِيِّ مَا يَسْتَأْجِرُ بِهِ الظَّئِرَ وَيَخَافُ هَلَاكَهُ
‘বৈধ ওজরের মধ্যে একটি হলো— গর্ভধারণের ফলে যদি মায়ের দুধ শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং পিতার এমন সামর্থ্য না থাকে যে অন্য কোনো দাই বা দুধমাতা ভাড়া করবে, ফলে শিশুর ধ্বংস বা ক্ষতির ভয় থাকে।’ (রদ্দুল মুহতার ৪/৩৩৬)
স্ত্রীর সম্মতি ও জরায় মুখ বন্ধ করার বিধান
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতিক্রমে অস্থায়ী বাধা ব্যবহার করা জায়েজ।
يَجُوزُ لَهَا سَدُّ فَمِ رَحِمِهَا كَمَا تَفْعَلُهُ النِّسَاءُ
‘নারীদের জন্য (সাময়িকভাবে) জরায়ুর মুখ বন্ধ রাখা জায়েজ, যেমনটি নারীরা করে থাকে।’ (রদ্দুল মুহতার ৪/৩৩৬)
ইসলামি শরিয়ত একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনবিধান। অভাবের ভয়ে জন্মবিরতি পালন করা ইমানের পরিপন্থী ও নিষিদ্ধ হলেও, স্ত্রীর শারীরিক স্বাস্থ্য রক্ষা, পূর্বের ছোট শিশুর সুষ্ঠু লালন-পালন কিংবা পারস্পরিক সুবিধাজনক সময়ের দূরত্বের জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়ে মিলে কনডম বা অন্যান্য অস্থায়ী পদ্ধতি ব্যবহার করতে পারেন। তবে কোনো অবস্থাতেই স্থায়ীভাবে প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট করা যাবে না এবং নিয়ত সর্বদা বিশুদ্ধ রাখতে হবে।

