সবকিছু মনের মতো না হলেও কি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলতে হবে?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সুখে কৃতজ্ঞতা, দুঃখে আল্লাহর ওপর ভরসা! সবকিছু মনের মতো না হলেও বলুন— ‘আলহামদুলিল্লাহ’। কখনো আল্লাহর প্রশংসা থামিয়ে দেবেন না। কারণ জীবন সবসময় আমাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী চলে না। কখনো হাসিতে ভরে ওঠে দিন, কখনো চোখের কোণে জমে অশ্রু। কখনো প্রাপ্তির আনন্দে হৃদয় ভরে যায়, আবার কখনো হারানোর বেদনায় মন ভারী হয়ে ওঠে। কিছু মুহূর্ত আমাদের আনন্দিত করে, আর কিছু মুহূর্ত আমাদের ধৈর্য, বিশ্বাস ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার পরীক্ষা নেয়।
তবুও একজন মুমিনের হৃদয়ে এমন একটি শব্দ রয়েছে, যা সুখের সময়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, আর দুঃখের সময়ে আল্লাহর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে স্মরণ করিয়ে দেয়। সেই মহিমান্বিত শব্দটি হলো— الْحَمْدُ لِلَّهِ (আলহামদুলিল্লাহ)। অর্থাৎ সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে এই শব্দটি উচ্চারণ করা শুধু জিহ্বার আমল নয়; বরং এটি আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা, তার প্রজ্ঞার ওপর আস্থা এবং তার রহমতের প্রত্যাশা নিয়ে বেঁচে থাকার এক সুন্দর মানসিকতা।
১. সুখের সময়ে বলুন— ‘আলহামদুলিল্লাহ’
জীবনে যখন সুস্থতা, স্বাচ্ছন্দ্য, প্রিয়জনের সান্নিধ্য কিংবা কোনো কাঙ্ক্ষিত সফলতা লাভ করেন, তখন মনে রাখবেন— এসবই আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত। নিজের যোগ্যতা ও প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সবকিছুর ঊর্ধ্বে আল্লাহর অনুগ্রহ রয়েছে। তাই আনন্দের মুহূর্তে অহংকার নয়, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। প্রাপ্তিকে নিজের কৃতিত্বের একমাত্র ফল মনে না করে আল্লাহর দান হিসেবে স্বীকার করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির রব।’ (সুরা আল-ফাতিহা: আয়াত ২)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ
‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তবে অবশ্যই আমি তোমাদের আরও বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইবরাহিম: আয়াত ৭)
সুতরাং, জীবনে যা কিছু পেয়েছেন, তার জন্য আল্লাহর প্রশংসা করুন। ছোট-বড় প্রতিটি নিয়ামত উপলব্ধি করুন। কারণ, কৃতজ্ঞ হৃদয় শুধু প্রাপ্তির আনন্দই উপভোগ করে না; বরং প্রাপ্তির পেছনে আল্লাহর অনুগ্রহও চিনতে শেখায়।
২. কঠিন সময়ে বলুন— ‘আলহামদুলিল্লাহ’
জীবনের সব দিন সমান নয়। কখনো অসুস্থতা আসে, কখনো আর্থিক সংকট, কখনো প্রিয় মানুষের বিচ্ছেদ, আবার কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যার কারণ আমরা বুঝে উঠতে পারি না। এমন সময়ে মন খারাপ হওয়া, কষ্ট পাওয়া কিংবা চোখে পানি আসা স্বাভাবিক। ইসলাম আমাদের কষ্ট অস্বীকার করতে শেখায় না; বরং কষ্টের মধ্যেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে, ধৈর্য ধরতে এবং তার রহমতের আশা করতে শেখায়। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
‘আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা বিপদে আক্রান্ত হলে বলে, ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই আমরা তারই কাছে ফিরে যাব।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫৫–১৫৬)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ
‘মুমিনের ব্যাপারটি আশ্চর্যজনক! তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর।’
হাদিসের ব্যাখ্যায় এসেছে, সে সুখ পেলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, আর দুঃখ-কষ্টে আক্রান্ত হলে ধৈর্য ধারণ করে— উভয় অবস্থাই তার জন্য কল্যাণকর। (মুসলিম ২৯৯৯)
তাই কঠিন সময় এলে নিজেকে অসহায় ভেবে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হবেন না। প্রয়োজন হলে সাহায্য চান, চিকিৎসা নিন, সমস্যার সমাধানে চেষ্টা করুন এবং ধৈর্যের সঙ্গে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন।
৩. সবকিছু বুঝতে না পারলেও বলুন— ‘আলহামদুলিল্লাহ’
জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয় না। কোনো চাওয়া পূরণ হয় না, পরিকল্পনা ভেঙে যায়, আবার কোনো অপেক্ষার ফল পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। কিন্তু সবকিছুর কারণ বুঝতে না পারা মানেই এই নয় যে, জীবনে আর কোনো কল্যাণ নেই। একজন মুমিন নিজের সীমিত জ্ঞানের পাশাপাশি আল্লাহর অসীম জ্ঞানের কথা স্মরণ করেন। তিনি নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেন, দোয়া করেন এবং ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
‘আর হতে পারে, তোমরা কোনো বিষয় অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আবার হতে পারে, তোমরা কোনো বিষয় পছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, আর তোমরা জানো না।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২১৬)
এই আয়াত আমাদের শেখায়, আমাদের জ্ঞান সীমিত। তাই জীবনের প্রতিটি ঘটনা নিজের পছন্দ অনুযায়ী না ঘটলেও আল্লাহর প্রতি আস্থা হারানো উচিত নয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি কষ্টের কারণ আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, কিংবা সব কষ্টের ফল দুনিয়াতেই আমাদের পছন্দমতো হবে। বরং এর অর্থ হলো—আল্লাহর জ্ঞানের ওপর আস্থা রেখে সঠিক পথে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া এবং তার রহমতের আশা না হারানো।
৪. জিহ্বাকে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলতে অভ্যস্ত করুন
কৃতজ্ঞতা শুধু বড় কোনো সুখবর পাওয়ার পর প্রকাশ করার বিষয় নয়। প্রতিদিনের ছোট ছোট নিয়ামতেও কৃতজ্ঞ হওয়ার সুযোগ রয়েছে— একটি নতুন সকাল, শ্বাস নেওয়ার সামর্থ্য, খাবার, নিরাপদ আশ্রয়, প্রিয়জনের সান্নিধ্য কিংবা ইবাদত করার সুযোগ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
الطُّهُورُ شَطْرُ الْإِيمَانِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ تَمْلَأُ الْمِيزَانَ
‘পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক, আর ‘আলহামদুলিল্লাহ’ মিজানকে পূর্ণ করে দেয়।’ (মুসলিম ২২৩)
এই হাদিসে আল্লাহর প্রশংসা করার মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে। তাই জিহ্বাকে আল্লাহর প্রশংসায় অভ্যস্ত করুন, হৃদয়ে কৃতজ্ঞতা লালন করুন এবং কাজের মাধ্যমে সেই কৃতজ্ঞতার প্রকাশ ঘটান।
মনে রাখবেন, কৃতজ্ঞতা মানে কষ্টের কথা অস্বীকার করা নয়। মন খারাপ হলে আল্লাহর কাছে নিজের কষ্টের কথা বলুন, দোয়া করুন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিন। একই সঙ্গে তার দেওয়া নিয়ামতগুলোও স্মরণ করুন। কারণ আপনার রব আপনাকে ভুলে যাননি। তাই বলুন— ‘আলহামদুলিল্লাহ’।
পরিস্থিতি বদলাতে পারে, কিন্তু আল্লাহর প্রশংসা ভুলে যাবেন না
জীবন কখনো হাসাবে, কখনো কাঁদাবে। কখনো আপনার ইচ্ছা পূরণ হবে, কখনো অপেক্ষা দীর্ঘ হবে। কখনো আপনি বুঝতে পারবেন কেন কোনো ঘটনা ঘটেছে, আবার কখনো উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই সময় কেটে যাবে।
তবুও আপনার হৃদয়কে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত রাখুন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য সুখের সময়ে বলুন— ‘আলহামদুলিল্লাহ’। কঠিন সময়ে ধৈর্য ধরুন, দোয়া করুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। আর যখন সবকিছু বুঝতে পারবেন না, তখনও তার রহমতের আশা ছাড়বেন না। জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সুখকর না হলেও, আল্লাহর প্রশংসা করার মতো নিয়ামত ও তার দিকে ফিরে যাওয়ার সুযোগ আমাদের জীবনে রয়েছে।
আসুন, আমরা এমন হৃদয়ের অধিকারী হওয়ার চেষ্টা করি, যে হৃদয় প্রাপ্তিতে কৃতজ্ঞ হয়, বিপদে ধৈর্য ধারণ করে এবং প্রতিটি অবস্থায় আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা রাখে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তার নিয়ামতের প্রকৃত কদর করার, বিপদে ধৈর্য ধরার এবং সর্বাবস্থায় তার প্রশংসা ও স্মরণে অবিচল থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।

