জুমার নামাজের সূচনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:১৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সপ্তাহের শ্রেষ্ঠতম দিন এবং মুমিনের সাপ্তাহিক ঈদের দিন হলো জুমার দিন। আল্লাহর অপার কৃপায় এ দিনটি উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য বিশেষ নিয়ামত হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে। বিশ্ব চরাচরের পরিপূর্ণতা এবং আদি পিতা হজরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি থেকে শুরু করে কিয়ামত সংঘটিত হওয়া—সবকিছুই এই মহিমান্বিত দিনের সঙ্গে জড়িত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এই দিনে বিশেষ আয়োজনে মুমিনদের দ্রুত মসজিদে আসার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কীভাবে শুরু হলো জুমার নামাজের এই ঐতিহাসিক প্রচলন? কোন পরিস্থিতিতে মদিনায় এর ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল? এই নিবন্ধে জুমার নামাজের সূচনা, গুরুত্ব এবং এর ঐতিহাসিক পটভূমি তুলে ধরা হয়েছে।
জুমার নামকরণের অর্থ ও পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা
আরবি শব্দ ‘জুমুআ’-এর শাব্দিক অর্থ হলো একত্রিত হওয়া। সপ্তাহের এই দিনে মুসলিম উম্মাহ আল্লাহর নির্দেশ পালনে ইবাদত ও জামাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে একত্রিত হয় বলে দিনটিকে ‘ইয়াওমুল জুমাআ’ বা জুমার দিন বলা হয়। কুরআনুল কারীমে জুমার দিনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরে মহান আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نُودِي لِلصَّلَاةِ مِن يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللَّهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ
‘হে মুমিনগণ! জুমার দিনে যখন নামাজের আজান দেওয়া হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দ্রুত মসজিদের দিকে ধাবিত হও। আর বেচাকেনা বন্ধ কর। এটা তোমাদের জন্যে উত্তম যদি তোমরা বুঝতে পার।’ (সুরা জুমা: আয়াত ৯)
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) কোনো এক জুমার দিনে এরশাদ করেছেন—
‘হে মুসলিম সম্প্রদায়! আল্লাহ তাআলা এ দিনকে ঈদের দিন হিসেবে নির্ধারণ করেছেন।’
যেভাবে শুরু হয় জুমার নামাজ
ইসলামের ইতিহাসে জুমার প্রচলন ও ফরজ হওয়ার বিষয়টি বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে জড়িত। ফরজ ইবাদত হিসেবে জুমার বিধান মক্কাতেই নাজিল হয়েছিল, কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে সেখানে সামষ্টিক ও প্রকাশ্যে জুমা আদায় করা সম্ভব হয়নি। এর পর তা ধাপে ধাপে মদিনায় বাস্তবায়িত হয়।
১. মক্কায় বিধান নাজিল এবং মুসআব ইবনে উমায়রের (রা.) উদ্যোগ
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও আবু মাসউদ আনসারি (রা.)-এর বর্ণনা থেকে জানা যায়, হিজরতের কিছুদিন আগে মক্কা নগরীতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর জুমার নামাজ পড়ার বিধান নাজিল হয়। কিন্তু মক্কায় সামষ্টিক ইবাদত করা সম্ভব না থাকায় বিশ্বনবি মদিনায় হিজরতকারী সাহাবিদের সেখানে জুমা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। ফলে প্রথম দিকে হিজরতকারীদের নেতা হজরত মুসআব ইবনে উমায়ের (রা.) কয়েকজন সাহাবিকে নিয়ে মদিনায় প্রথম জুমার নামাজ আদায় করেন। (তাবারানি, দারাকুতনি)
২. আনসারগণের নিজস্ব উদ্যোগ ও প্রথম জামাত
হজরত কাব ইবনে মালেক ও মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রা.)-এর বর্ণনা মতে, বিশ্বনবির মদিনায় পৌঁছার আগেই আনসারগণ নিজেরা একত্রিত হয়ে আলোচনা করেছিলেন যে, ইহুদি ও খ্রিস্টানদের মতো মুসলিমদের জন্যও সপ্তাহের একটি নির্দিষ্ট দিন থাকা উচিত, যেদিন তারা সকলে একত্রিত হয়ে আল্লাহকে স্মরণ করবেন এবং নামাজ আদায় করবেন। অবশেষে তারা শুক্রবার বা ‘ইয়াওমুল আরুবা’-কে মনোনীত করেন এবং বনি বায়দা অঞ্চলে হজরত আসআদ বিন জুরারাহ (রা.)-এর ইমামতিতে প্রায় ৪০ জন সাহাবি নিয়ে প্রথম জুমার নামাজ আদায় করেন। (মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, বাইহাকি)
৩. বিশ্বনবি (সা.) কর্তৃক প্রথম জুমা আদায়
নবুয়তের ১২তম বর্ষে মদিনার ‘নাকীউল খাজিমাতে’ জুমার নামাজ পড়ার প্রমাণ পাওয়া গেলেও, বিশ্বনবি সা.-এর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে ইসলামের প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমা আদায় হয় হিজরতের সময়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কা থেকে হিজরত করে সোমবার কুবায় পৌঁছান। সেখানে ৪ দিন অবস্থানের পর পঞ্চম দিন অর্থাৎ ‘ইয়াওমুল জুমা’ বা শুক্রবার মদিনার উদ্দেশে রওয়ানা হন। পথিমধ্যে বনি সালেম ইবনে আওফ গোত্রের উপত্যকায় জোহরের সময় হয়ে গেলে তিনি সেখানেই প্রথম জুমার নামাজ আদায় করেন। তখন থেকেই মুমিন মুসলমানদের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে জুমার ধারা স্থায়ী রূপ লাভ করে। (ইবনে হিশাম)
জুমার নামাজের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা
সপ্তাহের জোহরের চার রাকাত ফরজ নামাজের বিকল্প বা স্থলাভিষিক্ত হিসেবে দুই রাকাত ফরজ জুমা এবং ইমামের খুতবা নির্ধারণ করা হয়েছে। খুতবায় খতিব উম্মতের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও কুরআন-হাদিসের আলোকে উপদেশ প্রদান করেন। হাদিস শরিফে জুমার গুরুত্ব ও জামাতের সঙ্গে তা আদায়ের কঠোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে—
জুমা যাদের জন্য ফরজ
عَنْ طَارِقِ بْنِ شِهَابٍ عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ الْجُمُعَةُ حَقٌّ وَاجِبٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ فِي جَمَاعَةٍ إِلَّا أَرْبَعَةً عَبْدٌ مَمْلُوكٌ أَوْ امْرَأَةٌ أَوْ صَبِيٌّ أَوْ مَرِيضٌ
হজরত তারেক ইবনে শিহাব (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ক্রীতদাস, নারী, নাবালেগ বাচ্চা ও অসুস্থ ব্যক্তি—এই চার প্রকার মানুষ ছাড়া সব মুসলমানের ওপর জামাতের সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করা অপরিহার্য কর্তব্য (ফরজ)।’ (আবু দাউদ ১০৬৭, মুসতাদরেকে হাকেম)
জুমা বর্জনের মারাত্মক পরিণতি
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া জুমার নামাজ বর্জন করবে, তার নাম মুনাফিক হিসেবে এমন দফতরে লেখা হবে; যা কখনো মুছে ফেলা হবে না এবং পরিবর্তনও করা যাবে না।’ (তাফসিরে মাজহারি)
কঠোর সতর্কবাণী
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) জুমার নামাজ না পড়া ব্যক্তিদের সম্পর্কে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমার ইচ্ছা হয় যে আমি কাউকে নামাজ পড়ার আদেশ করি, সে মানুষকে নামাজ পড়াক। অতঃপর যে সব ব্যক্তি জুমার নামাজ পড়ে না, আমি তাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিই। ( মুসলিম ৬৫২, মুসনাদে আহমাদ)
জুমা কেবল একটি সাপ্তাহিক ইবাদতই নয়, বরং এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, শৃঙ্খলা এবং আল্লাহর প্রতি আত্মনিবেদনের এক অনন্য প্রতীক। মক্কা ও মদিনার সূচনালগ্ন থেকে নানা ধাপ পেরিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাতে প্রবর্তিত এই পবিত্র বিধান আজও বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। তাই আসুন, জুমার দিনের পবিত্রতা রক্ষা করে, খুতবা মনোযোগ সহকারে শুনে এবং জামাতের সঙ্গে জুমার নামাজ আদায় করে এই মহা বরকতময় দিনের অফুরন্ত ফজিলত ও রহমত অর্জন করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে জুমার নামাজ যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

