স্ত্রীর পর্দা পালন নিয়ে পারিবারিক বিরোধ হলে স্বামীর করণীয় কী?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলামে পর্দা নারী-পুরুষের চারিত্রিক পবিত্রতা, শালীনতা ও সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান। নারীর পর্দা পালন করা ইসলামের আবশ্যকীয় বিধান। তাই প্রত্যেক মুসলিম নারীর দায়িত্ব হলো শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী পর্দা রক্ষা করা। একইভাবে স্ত্রীর দ্বীন পালন ও পর্দা রক্ষায় সহযোগিতা করা স্বামীরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
প্রশ্ন
একজন প্রশ্নকারী জানতে চান, আমার স্ত্রী পরিপূর্ণভাবে পর্দা পালন করতে চান। কিন্তু আমার বাবা-মা তাকে ভালোভাবে পর্দা করতে দেন না। গ্রামে বসবাস করায় তাকে ঘরের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন কাজ করতে হয়। ফলে যথাযথভাবে পর্দা পালন করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। আমি ঢাকায় চাকরি করি। আর্থিক সামর্থ্যও তেমন নেই যে স্ত্রীকে নিজের কাছে এনে পর্দার পরিবেশ তৈরি করব। এ অবস্থায় আমার করণীয় কী?
ঢাকা বিমানবন্দর এলাকার জামিয়া বাবুস সালামের মুফতি ও মুহাদ্দিস মুফতি জাওয়াদ তাহের বলেন—
স্ত্রীর পর্দা পালনে সহযোগিতা করা স্বামীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। একই সঙ্গে বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা এবং তাদের সম্মান বজায় রাখাও সন্তানের কর্তব্য। তাই এ ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত, যাতে যথাসম্ভব শরিয়তের বিধান পালন করা যায় এবং পারিবারিক সম্পর্কেরও অবনতি না ঘটে।
প্রথমত, আপনার স্ত্রীকে বুঝতে হবে, শরিয়ত যেসব পুরুষের সামনে পর্দা করা আবশ্যক করেছে, তাদের সামনে যথাযথ পর্দা করা জরুরি। দেবর, ভাসুর, চাচাতো ও ফুফাতো ভাইসহ অন্যান্য গায়রে মাহরাম পুরুষের ক্ষেত্রেও এ বিধান প্রযোজ্য।
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
الْحَمْوُ الْمَوْتُ
‘স্বামীর নিকটাত্মীয় পুরুষ (যেমন দেবর-ভাসুর) অত্যন্ত বিপজ্জনক।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৩২)
তবে কোন পরিস্থিতিতে কী পরিমাণ পর্দা আবশ্যক, তা শরিয়তের বিস্তারিত বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
দ্বিতীয়ত, আপনার বাবা-মায়ের সঙ্গে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে কথা বলুন। তাদের বোঝানোর চেষ্টা করুন যে, আপনার স্ত্রী তাদের খেদমত করতে এবং সংসারের কাজকর্ম করতে আগ্রহী। তবে কাজের সময় যেন শরিয়তসম্মত পোশাক পরিধান করে পর্দা বজায় রাখতে পারেন, সে সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
সম্ভব হলে ঘরের কাজের ধরন ও সময় এমনভাবে নির্ধারণ করুন, যাতে গায়রে মাহরাম পুরুষদের সামনে আসার প্রয়োজন কমে যায় এবং পর্দা রক্ষা করা সহজ হয়।
তৃতীয়ত, বাবা-মা যদি এমন কোনো কাজে বাধ্য করেন, যা শরিয়ত অনুযায়ী গুনাহের কাজ, তাহলে সে ক্ষেত্রে তাদের আনুগত্য করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা হলো, স্রষ্টার অবাধ্যতার কাজে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না। তবে এ কারণে বাবা-মায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা কিংবা তাদের অধিকার অবহেলা করাও বৈধ হবে না।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন— لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا مَا آتَاهَا
‘আল্লাহ কাউকে তিনি যা দিয়েছেন, তার অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করেন না।’ (সুরা আত-তালাক, আয়াত: ৭)
চতুর্থত, স্ত্রীর পর্দা ও দ্বীনদারি রক্ষার স্বার্থে আপনি গ্রামে গিয়ে চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য করা কিংবা স্ত্রীকে নিজের কাছে নিয়ে আসার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। তবে এসব ব্যবস্থা গ্রহণে সময় লাগতে পারে। তত দিন পর্যন্ত আপনার স্ত্রী গ্রামে কাজের প্রয়োজনে ঘরের বাইরে গেলে কাজের উপযোগী ঢিলেঢালা বোরকা অথবা সাধারণ, ঢিলেঢালা ও অনাকর্ষণীয় পোশাক পরিধান করবেন। বড় ওড়না দিয়ে মাথা, বুক ও পিঠ ঢেকে রাখবেন। চেহারা ঢাকার জন্য নিকাব বা উপযুক্ত মাস্ক ব্যবহার করবেন।
সর্বোপরি, আপনার প্রথম করণীয় হলো, বাবা-মাকে সম্মানের সঙ্গে বুঝিয়ে স্ত্রীর জন্য পর্দাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা। এতে সফল না হলে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে আপাতত স্ত্রীকে ঢাকায় নিয়ে আসতে না পারলেও সাধ্যের মধ্যে তাঁর দ্বীন পালন ও পর্দা রক্ষায় সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকা উচিত নয়।
আল্লাহ তাআলা আপনাদের পারিবারিক জীবনে সহজতা, শান্তি ও বরকত দান করুন। আমিন।
ফিকহি ও শরয়ি তথ্যসূত্র
১. তাফসিরে রুহুল মাআনি
وأخرج ابن أبي شيبة وعبد بن حميد عن ابن عباس أنه قال في قوله تعالى: إلا ما ظهر منها رقعة الوجه وباطن الكف، وأخرجا عن ابن عمر أنه قال: الوجه والكفان.
(সুরা আন-নূর, খণ্ড: ৯, পৃষ্ঠা: ৩৩৫)
২. মুসনাদে আহমাদ
عن علي رضي الله عنه، عن النبي صلى الله عليه وسلم، قال: لا طاعة لمخلوق في معصية الله عز وجل.
(মুসনাদে আহমাদ, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৩৩)
৩. ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া
يجوز النظر إلى مواضع الزينة الظاهرة منهن وذلك الوجه والكف في ظاهر الرواية.
(কিতাবুল কারাহিয়্যাহ, আল-বাবুস সামিন ফিমা ইয়াহিল্লুর রাজুলা নাজারু ইলাইহি ওয়া মা লা ইয়াহিল্লু লাহু, খণ্ড: ৫, পৃষ্ঠা: ৩২৯)
৪. আদ-দুররুল মুখতার
وتمنع المرأة الشابة من كشف الوجه بين الرجال لا لأنه عورة بل لخوف الفتنة كمسّه وإن أمن الشهوة لأنه أغلظ، ولذا ثبت به حرمة المصاهرة كما يأتي في الحظر، انتهى.
(আদ-দুররুল মুখতার, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৭)
সূত্র: মুসলিম বাংলা

