যৌথ পরিবারে অশান্তি হলে আলাদা থাকা যাবে কি, ইসলাম কী বলে?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলামে পরিবার সমাজ ও সভ্যতার মূল ভিত্তি এবং মহান আল্লাহ তাআলার এক বিশেষ নিয়ামত। ইসলাম পরিবারকে পারস্পরিক ভালোবাসা, দায়িত্বশীলতা ও ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি পবিত্র আমানত হিসেবে ঘোষণা করেছে। ব্যক্তি ও সমাজ গঠনের প্রথম পাঠশালা হলো পরিবার। সুশৃঙ্খল ও আদর্শ পরিবার ছাড়া সুস্থ সমাজ কল্পনা করা যায় না।
পরিবারের বন্ধন অটুট রাখা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
যুবাইর ইবনে মুতইম (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন—
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعٌ
‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫৬; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৬৭৩২)
একজন প্রশ্নকারী জানতে চান, আমি ১৩ বছর যৌথ পরিবারে বসবাস করেছি। বর্তমানে পারিবারিক কলহের কারণে স্বামীকে নিয়ে আলাদা সংসার করছি। কিন্তু আমার শাশুড়ি আমার স্বামী ও আমাকে বদদোয়া দিচ্ছেন। তাকে টাকা দিলে ফেরত দেন। কাপড় কিংবা খাবারজাতীয় জিনিস দিলেও ফিরিয়ে দেন। আবার কিছু না দিলেও ঝগড়া করেন। এ অবস্থায় আমাদের করণীয় কী?
ঢাকা বিমানবন্দর এলাকার জামিয়া বাবুস সালামের মুফতি ও মুহাদ্দিস মুফতি জাওয়াদ তাহের বলেন—
প্রিয় প্রশ্নকারী! স্ত্রীর জন্য আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করা একটি বিষয়, আর পিতা-মাতার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ ও তাদের খেদমত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। একটির কারণে অন্যটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। স্ত্রীকে আলাদা বাসস্থানে রাখা মানেই মা-বাবাকে পরিত্যাগ করা নয়।
মানুষ যেভাবে জীবিকা নির্বাহ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনে দিনের বড় একটি সময় ঘরের বাইরে কাটায়, ঠিক তেমনি একজন ছেলে চাইলে প্রতিদিন অথবা সপ্তাহের নির্দিষ্ট সময় মায়ের খেদমত ও খোঁজখবর নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে।
মা যদি কোনো কারণে মন থেকে সন্তুষ্ট না হন কিংবা রাগ করে থাকেন, তবু ছেলে যদি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী তার সেবা-যত্ন ও আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখে, তাহলে আল্লাহর দরবারে তার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অবহেলা থাকবে না।
মা-বাবা ও স্ত্রীর অধিকার একসঙ্গে রক্ষা করা কিছুটা মানসিক চাপ ও ধৈর্যের দাবি রাখে। তবে এটি অসম্ভব কোনো কাজ নয়। প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও সুন্দর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে উভয় সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব।
আপনাদের উদ্দেশে দেওয়া শাশুড়ির বদদোয়া নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। ইসলামে মা-বাবার দোয়া ও বদদোয়ার গুরুত্ব রয়েছে। তবে কোনো অন্যায় বা পাপের জন্য করা দোয়া কবুল হয় না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন—
لَا يَزَالُ يُسْتَجَابُ لِلْعَبْدِ، مَا لَمْ يَدْعُ بِإِثْمٍ أَوْ قَطِيعَةِ رَحِمٍ
‘বান্দার দোয়া ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল হতে থাকে, যতক্ষণ না সে কোনো পাপের কাজের জন্য অথবা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য দোয়া করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৩৫)
স্ত্রীর জন্য পৃথক ও নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর ওপর শরিয়ত নির্ধারিত একটি দায়িত্ব। আপনার স্বামী স্ত্রীর অধিকার আদায়ের জন্য আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থা করে কোনো অন্যায় করেননি। পারিবারিক কলহ থেকে বাঁচতে এ ব্যবস্থা নেওয়া শরিয়তসম্মত। তাই এ কারণে মায়ের অসন্তুষ্টি বা আবেগের বশবর্তী হয়ে দেওয়া বদদোয়া নিয়ে আপনাদের অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।
আপনি যদি আন্তরিকভাবে সম্পর্ক ভালো রাখার উদ্দেশ্যে শাশুড়িকে কিছু দিতে চান, কিন্তু তিনি বারবার তা ফিরিয়ে দিয়ে ঝগড়া করেন, তাহলে আপাতত জোর করে টাকা-পয়সা বা উপহার দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে তার খোঁজখবর নেওয়া, সালাম দেওয়া এবং সম্মানজনক আচরণ বজায় রাখার চেষ্টা করবেন।
সম্ভব হলে পরিবারের কোনো বিচক্ষণ ও নিরপেক্ষ ব্যক্তির মাধ্যমে বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা করুন। এমন কোনো পদক্ষেপ নেবেন না, যাতে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিরোধ আরও বেড়ে যায়। নিয়মিত অপমান বা ঝগড়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে নিজের সংসারের শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে উপযুক্ত সীমারেখা নির্ধারণ করুন।
শাশুড়ি কোনো কারণে ঝগড়া করলে বা কটু কথা বললে উত্তেজিত হয়ে পালটা জবাব দেবেন না। ধৈর্য ধরুন এবং অপ্রয়োজনীয় তর্ক এড়িয়ে চলুন। কারণ, অনেক সময় একটি কথার জের ধরে ছোট বিরোধ বড় আকার ধারণ করে এবং পুরো সংসারের শান্তি নষ্ট হয়। তাই ধৈর্য, সংযম ও প্রজ্ঞার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই উত্তম।
স্ত্রীর জন্য পৃথক ও নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব। এ বিষয়ে ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোতে সুস্পষ্ট আলোচনা রয়েছে।
ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে—
تجب السكنى لها عليه في بيت خال عن أهله وأهلها إلا أن تختار ذلك كذا في العيني شرح الكنز.
অর্থ: স্ত্রীর জন্য এমন একটি বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব, যেখানে স্বামীর পরিবারের সদস্য কিংবা স্ত্রীর পরিবারের সদস্যরা থাকবেন না; তবে স্ত্রী নিজে যদি তাদের সঙ্গে বসবাস করতে সম্মত হন, তাহলে ভিন্ন কথা।
(ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া, কিতাবুত তালাক, বাবুস সাদাস আশার ফিন নাফাকাত, ফাসলুস সানি ফিস সুকনা, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৫৫৬)
আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ গ্রন্থে বলা হয়েছে—
স্ত্রীর জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর ওপর আবশ্যকীয় দায়িত্ব। এ বিষয়ে ফকিহদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। কারণ, আল্লাহ তাআলা তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীদের ইদ্দতকালীন বাসস্থানের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—
أَسْكِنُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ سَكَنْتُمْ مِنْ وُجْدِكُمْ
‘তোমরা তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যেখানে বসবাস করো, তাদেরও সেখানে বসবাসের ব্যবস্থা করো।’ (সুরা আত-তালাক, আয়াত: ৬)
সুতরাং বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ স্ত্রীর জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করা আরও বেশি অগ্রাধিকারযোগ্য। স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে সদাচরণ করা আল্লাহর নির্দেশ। নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশে বসবাসের ব্যবস্থা করাও সদাচরণের অন্তর্ভুক্ত। কেননা, নিজের নিরাপত্তা, সম্পদ সংরক্ষণ ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার জন্য স্ত্রীর পৃথক বাসস্থানের প্রয়োজন রয়েছে।
এ ছাড়া স্বামী, স্ত্রী ও পিতা-মাতাকে একই বাসস্থানে একত্রে বসবাস করতে বাধ্য করা বৈধ নয়। একইভাবে অন্যান্য আত্মীয়ের সঙ্গেও বসবাসে স্ত্রীকে বাধ্য করা যাবে না। নিজের নিরাপত্তা ও সম্পদের সুরক্ষার জন্য পৃথক বাসস্থানের অধিকার স্ত্রীর রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাকে জোর করার অধিকার কারও নেই। এটি হানাফি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবসহ অধিকাংশ ফকিহের মত।
(আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ‘আস-সুকনা’, আল-আহকামুল মুতাআল্লিকাতু বিস-সুকনা, খণ্ড: ২৫, পৃষ্ঠা: ১০৮-১০৯)
সূত্র: মুসলিম বাংলা

-6ae48550f3567.jpg)
