ইসলামের দৃষ্টিতে চার পুরুষের ধারণা
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৫৬ এএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এক পুরুষের কঠোর পরিশ্রমে গড়ে ওঠে বিপুল সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদা। পরের পুরুষ সেই সম্পদ ভোগ করে, তৃতীয় পুরুষ পূর্বপুরুষের সংগ্রামের কথা ভুলতে শুরু করে। আর চতুর্থ পুরুষ এসে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ ও ক্ষমতাকে নিজের যোগ্যতার ফল মনে করে অহংকারে ডুবে যায়। একসময় পরিশ্রম, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার অভাবে সেই সমৃদ্ধ বংশেই নেমে আসে পতন। ইতিহাসে পরিবার, গোত্র ও রাজবংশের উত্থান-পতন বিশ্লেষণে এমন একটি প্রজন্মভিত্তিক ধারণার কথা উঠে এসেছে।
ইসলামের দৃষ্টিতেও সম্পদ, ক্ষমতা ও বংশীয় মর্যাদা মানুষের জন্য পরীক্ষা। সম্পদ অর্জন করা নিষিদ্ধ নয়; বরং হালাল উপায়ে উপার্জন, সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং মানুষের কল্যাণে তা ব্যয় করার নির্দেশনা রয়েছে। তবে সম্পদ ও বংশীয় পরিচয় নিয়ে অহংকার করা এবং নিজের আমলের বদলে পূর্বপুরুষের অর্জনের ওপর নির্ভর করা ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
প্রথম পুরুষ
একটি পরিবারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি সাধারণত গড়ে ওঠে প্রথম পুরুষের কঠোর পরিশ্রমে। জীবনের নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে তারা সম্পদ অর্জন করেন, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা করেন কিংবা সামাজিক অবস্থান তৈরি করেন। তাদের কাছে প্রতিটি অর্জনের পেছনে থাকে শ্রম, ত্যাগ ও ঝুঁকি নেওয়ার অভিজ্ঞতা।
ইসলাম হালাল উপার্জনকে উৎসাহিত করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য হলে ভিন্ন কথা।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ২৯)
অর্থাৎ সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে সততা ও বৈধতার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রথম প্রজন্মের এই পরিশ্রম ও নৈতিকতাই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সম্পদের পাশাপাশি একটি আদর্শও তৈরি করতে পারে।
দ্বিতীয় পুরুষ
দ্বিতীয় পুরুষ সাধারণত পূর্বসূরিদের গড়ে দেওয়া সম্পদ, ব্যবসা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সুবিধা পায়। তাদের জীবনযাত্রা আগের পুরুষের তুলনায় সহজ হতে পারে। তবে এই প্রজন্মের সামনে বড় দায়িত্ব থাকে অর্জিত সম্পদ রক্ষা করা, তা সঠিকভাবে পরিচালনা করা এবং নতুন কর্মসংস্থান ও সম্ভাবনা তৈরি করা।
ইসলাম সম্পদ ভোগের অনুমতি দিলেও অপচয় ও অপব্যয়ের ব্যাপারে সতর্ক করেছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা খাও ও পান করো, কিন্তু অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩১)
ফলে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পদ শুধু ভোগের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দায়িত্ব ও জবাবদিহি।
তৃতীয় পুরুষ
তৃতীয় পুরুষের কাছে পূর্বপুরুষদের সংগ্রাম অনেক সময় কেবল পারিবারিক গল্প হয়ে থাকে। সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদা আগে থেকেই পাওয়া থাকায় নতুন করে সংগ্রাম করার প্রয়োজনীয়তা তারা কম অনুভব করতে পারে। কেউ কেউ ব্যবসা ও সম্পদ পরিচালনায় শৃঙ্খলা হারায়, আবার কেউ বিলাসী জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
এ পর্যায়ে পরিবারের মধ্যে ঐক্য, দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতার ঘাটতি দেখা দিলে সম্পদের ভিত্তিও দুর্বল হতে পারে। তবে এটি সব পরিবারের ক্ষেত্রে ঘটবে, এমন কোনো অবধারিত নিয়ম নেই।
ইসলাম মানুষকে সম্পদের মোহে অন্ধ না হওয়ার শিক্ষা দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদের মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।’ (সুরা তাকাসুর, আয়াত: ১)
সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় মানুষ যখন নৈতিকতা, দায়িত্ব ও পরকালের জবাবদিহি ভুলে যায়, তখন সেই সম্পদই তার জন্য পরীক্ষার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
চতুর্থ পুরুষ
চতুর্থ পুরুষের কাছে পূর্বপুরুষদের প্রতিষ্ঠিত সম্পদ, ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদা অনেক সময় স্বাভাবিক অধিকার বলে মনে হতে পারে। পূর্বসূরিদের কষ্ট ও ত্যাগের অভিজ্ঞতা না থাকায় কেউ কেউ সম্পদকে সীমাহীন মনে করে। ফলে বিলাসিতা, অপচয়, অহংকার ও দায়িত্বহীনতা বাড়তে পারে। এতে তার পতন ঘটে।
ইসলাম এ ধরনের অহংকারকে নিরুৎসাহিত করেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আর তুমি মানুষের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না এবং পৃথিবীতে অহংকারভরে চলাফেরা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো অহংকারী ও দাম্ভিককে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ১৮)
অর্থাৎ সম্পদ বা বংশীয় মর্যাদা কাউকে অন্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ করে না। বরং সম্পদের সঠিক ব্যবহার, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং বিনয়ী আচরণই ইসলামের শিক্ষা।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সদকা করলে সম্পদ কমে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৮) এই হাদিসে দান ও সম্পদের কল্যাণকর ব্যবহারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
সম্পদ নয়, নিজের আমলই মুখ্য
ইসলামে বংশীয় পরিচয় ও পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্ব থাকলেও পরকালের মুক্তির ক্ষেত্রে প্রত্যেক মানুষকে নিজের আমলের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৬৪)
মহানবী (সা.) তার নিকটাত্মীয়দেরও সতর্ক করে বলেছিলেন, নিজেদের জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো; আল্লাহর শাস্তি থেকে তোমাদের রক্ষা করার ক্ষমতা আমার নেই। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৫৩)
এই শিক্ষা স্পষ্ট করে যে, পূর্বপুরুষের সম্পদ, সম্মান কিংবা ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রত্যেককে নিজের ঈমান, আমল ও কর্মের ভিত্তিতে জীবন পরিচালনা করতে হবে।
ইতিহাসেও আছে প্রজন্মগত উত্থান-পতনের বিশ্লেষণ
ইসলামি চিন্তাবিদ ও ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন তার বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মুকাদ্দিমা-তে রাজবংশের উত্থান-পতন নিয়ে প্রজন্মভিত্তিক বিশ্লেষণ করেছেন। তার মতে, প্রথম প্রজন্ম সংগ্রাম, ঐক্য ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী প্রজন্ম সেই প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতা ও সম্পদের সুবিধা ভোগ করে। সময়ের সঙ্গে বিলাসিতা বাড়লে এবং পূর্বসূরিদের সংগ্রামের স্মৃতি ম্লান হলে শাসকগোষ্ঠীর ঐক্য ও শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
ইবনে খালদুনের এই বিশ্লেষণ মূলত রাষ্ট্র ও রাজবংশের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে। এটি ইসলামের কোনো নির্ধারিত ধর্মীয় বিধান নয়। তবে সম্পদ, ক্ষমতা, বিলাসিতা ও সামাজিক সংহতির সম্পর্ক বুঝতে তার বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পদ ধরে রাখতে প্রয়োজন দায়িত্বশীলতা
ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ মানুষের জন্য আল্লাহর দেওয়া আমানত ও পরীক্ষা। তাই তা অর্জনের পাশাপাশি সঠিকভাবে ব্যয় করা, দরিদ্রের অধিকার আদায়, উত্তরাধিকারীদের নৈতিক শিক্ষা দেওয়া এবং পরিবারের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
একটি বংশের প্রকৃত সমৃদ্ধি শুধু কত সম্পদ রেখে যাওয়া হলো, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। বরং পরবর্তী প্রজন্ম সেই সম্পদ কীভাবে ব্যবহার করছে, পূর্বসূরিদের ভালো আদর্শ কতটা ধরে রাখছে এবং সমাজের কল্যাণে কতটা ভূমিকা রাখছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
