চুল পড়া কি রোগের সংকেত?
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আগের তুলনায় বেশি চুল দেখতে পেলেই অনেকে প্রথমে শ্যাম্পু বদলানোর কথা ভাবেন। তবে অতিরিক্ত চুল পড়া শারীরিক সমস্যাও হতে পারে।
শরীরের জন্য চুল অত্যাবশ্যক নয়। তাই শরীর যখন পুষ্টির ঘাটতি, হরমোনের পরিবর্তন বা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের মতো পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যায়, তখন প্রয়োজনীয় অঙ্গ ও গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এর ফলে চুলের বৃদ্ধির প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যেতে পারে এবং চুল পড়া বাড়তে পারে।
চুলের বৃদ্ধির জন্য শরীরের পর্যাপ্ত পুষ্টি, হরমোনের ভারসাম্য এবং স্বাভাবিক রক্তসঞ্চালন প্রয়োজন। এই ব্যবস্থাগুলির কোনও একটিতে সমস্যা তৈরি হলে তার প্রভাব চুলের উপর পড়তে পারে। অনেক সময় শরীরে কোনও পরিবর্তনের অন্য লক্ষণ স্পষ্ট হওয়ার আগেই চুল পড়া শুরু হয়। তাই দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক হারে চুল পড়লে শুধু চুলের যত্নের পণ্য বদলানোর বদলে সম্ভাব্য কারণ খুঁজে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
থাইরয়েডের সমস্যা
থাইরয়েড গ্রন্থির কার্যকারিতা কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া, দুই ধরনের সমস্যাই চুলের বৃদ্ধির স্বাভাবিক চক্রকে প্রভাবিত করতে পারে। থাইরয়েড হরমোন শরীরের বিপাকক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে চুলের ফলিকল বা গোড়াতেও তার প্রভাব পড়তে পারে। ফলে চুল পাতলা হওয়া বা অতিরিক্ত চুল পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
আয়রনের ঘাটতি ও রক্তাল্পতা
চুলের বৃদ্ধির সঙ্গে আয়রনেরও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। আয়রন হিমোগ্লোবিন তৈরিতে প্রয়োজনীয়, আর হিমোগ্লোবিন শরীরের বিভিন্ন টিস্যুতে অক্সিজেন পৌঁছে দেয়। শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে রক্তাল্পতা তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে চুলের বৃদ্ধিও ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে চুল পড়ার পাশাপাশি ক্লান্তি বা দুর্বলতার মতো সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
পিসিওএস-এর সঙ্গেও সম্পর্ক রয়েছে
মহিলাদের ক্ষেত্রে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএস-এর সঙ্গে চুল পড়ার সম্পর্ক থাকতে পারে। এই অবস্থায় অ্যান্ড্রোজেন বা পুরুষ হরমোনের মাত্রা বেড়ে গেলে মাথার চুল পাতলা হতে পারে। একইসঙ্গে শরীরের অন্য অংশে অতিরিক্ত লোমও দেখা দিতে পারে। তাই চুল পাতলা হওয়ার সঙ্গে মাসিকের অনিয়ম, ব্রণ বা অন্যান্য হরমোন-সংক্রান্ত লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
অটোইমিউন রোগেও চুল পড়তে পারে
কিছু অটোইমিউন রোগের ক্ষেত্রেও চুল পড়া অন্যতম লক্ষণ হতে পারে। যেমন অ্যালোপেশিয়া এরিয়াটায় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে চুলের ফলিকলের উপর আক্রমণ করতে পারে। লুপাসের মতো কিছু অটোইমিউন রোগেও চুল পড়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে হঠাৎ গোলাকার অংশে চুল উঠে যাওয়া বা অস্বাভাবিকভাবে চুল পাতলা হওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা যেতে পারে।
ডায়াবেটিসের প্রভাবও থাকতে পারে
রক্তে শর্করার ভারসাম্য এবং রক্তসঞ্চালনের সমস্যার কারণেও চুলের বৃদ্ধির উপর প্রভাব পড়তে পারে। ডায়াবেটিসে দীর্ঘদিন ধরে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্তপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা চুলের ফলিকলের উপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শুধুমাত্র চুল পড়ছে বলেই ডায়াবেটিস হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করানোই সঠিক পথ।
পুষ্টির ঘাটতিও বড় কারণ
কোনও নির্দিষ্ট রোগ না থাকলেও শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি হলে চুল পড়তে পারে। নিয়মিত খাবার খেলেও খাদ্যাভ্যাসের ঘাটতি, শরীরে পুষ্টি শোষণে সমস্যা বা নির্দিষ্ট সময়ে শরীরের বেশি পুষ্টির প্রয়োজনের কারণে কিছু ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। ভিটামিন ডি, জিঙ্ক, বায়োটিন এবং প্রোটিন চুলের স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। তবে পরীক্ষা না করে নিজের ইচ্ছেমতো ভিটামিন বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়া ঠিক নয়। কারণ অতিরিক্ত কিছু পুষ্টি উপাদানও শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
মানসিক চাপের প্রভাব কয়েক মাস পরে দেখা যায়
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ চুল পড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত চাপের ফলে শরীরের হরমোনগত পরিবর্তন চুলের বৃদ্ধির চক্রকে প্রভাবিত করতে পারে। এর একটি পরিচিত ধরন হল টেলোজেন এফ্লুভিয়াম। কোনও বড় মানসিক চাপ, অসুস্থতা বা শারীরিক ধাক্কার প্রায় দুই থেকে তিন মাস পরে হঠাৎ বেশি পরিমাণে চুল পড়তে শুরু করতে পারে। এই সময়ের ব্যবধানের কারণে অনেকেই চুল পড়ার সঙ্গে আগের মানসিক চাপের সম্পর্ক বুঝতে পারেন না। অর্থাৎ, চাপের সময় শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও তার প্রভাব চুলের উপর দেখা দিতে পারে।
শুধু বাইরে থেকে চিকিৎসা করলেই কি সমস্যা মিটবে?
চুল পড়ার কারণ যদি শরীরের ভিতরের কোনও সমস্যা হয়, তাহলে শুধু শ্যাম্পু বা বাহ্যিক প্রসাধনী ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান নাও হতে পারে। থাইরয়েডের সমস্যা থাকলে সেটির চিকিৎসা প্রয়োজন। আয়রনের ঘাটতি থাকলে তা শনাক্ত করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
চুল পড়া স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি হলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। দীর্ঘদিন সমস্যা চললে, দ্রুত চুল পাতলা হয়ে গেলে, মাথার নির্দিষ্ট জায়গায় হঠাৎ চুল উঠে গেলে বা চুল পড়ার সঙ্গে অতিরিক্ত ক্লান্তি, ওজনের পরিবর্তন, মাসিকের অনিয়ম কিংবা ত্বকের অন্য পরিবর্তন দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
