বালিশের পাশে মোবাইল রেখে ঘুমান? জানুন ঘুম ও স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫২ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঘুমানোর আগে মোবাইল ফোন দেখা এবং সকালে ঘুম থেকে উঠেই ফোন হাতে নেওয়া অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কেউ বালিশের পাশে, কেউ বিছানার পাশের টেবিলে আবার কেউ চার্জে বসিয়ে ফোন রাখেন মাথার কাছেই। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মোবাইল ফোনের ব্যবহার সহজে এড়ানো সম্ভব না হলেও, রাতে এর ব্যবহার এবং রাখার অভ্যাস ঘুম ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহার করলে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হতে পারে। পাশাপাশি ফোন চার্জ দেওয়ার ক্ষেত্রে অসতর্কতা থেকে তৈরি হতে পারে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি। অন্যদিকে, মোবাইল ফোনের বিকিরণ নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও, শুধু বিছানার পাশে ফোন রাখার কারণে ক্যান্সার বা গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হয়—এমন কোনো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
১. ফোনের নীল আলো ব্যাহত করতে পারে ঘুম
মোবাইল ফোনের স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণ চক্রকে প্রভাবিত করতে পারে। সন্ধ্যায় উজ্জ্বল আলোর সংস্পর্শে এলে মেলাটোনিন হরমোনের নিঃসরণ কমে যেতে পারে। এই হরমোন শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করতে সাহায্য করে।
ঘুমানোর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় কাটানো, ভিডিও দেখা কিংবা বারবার মেসেজ পড়ার কারণে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে। শুধু তা-ই নয়, স্ক্রিনের আলো কমিয়ে রাখলেও আকর্ষণীয় বা উত্তেজনাপূর্ণ কনটেন্ট দেখার ফলে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকতে পারে।
যা করবেন: ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট আগে ফোন ব্যবহার বন্ধ করার চেষ্টা করুন। ঘুমের জন্য নির্দিষ্ট সময় ঠিক রাখুন এবং শোবার ঘরে আলো কমিয়ে দিন। নাইট মোড নীল আলোর প্রভাব কিছুটা কমাতে পারে, তবে দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহারের অভ্যাসের বিকল্প সমাধান নয়।
২. নোটিফিকেশনে ভাঙতে পারে রাতের ঘুম
ফোন ব্যবহার না করলেও বিভিন্ন অ্যাপের নোটিফিকেশন, কলের শব্দ কিংবা ভাইব্রেশন ঘুমের মধ্যে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। অনেক সময় অল্প সময়ের জন্য ঘুম ভেঙে গেলেও সকালে তা মনে থাকে না।
বারবার ঘুমের ধারাবাহিকতা নষ্ট হলে পরদিন ক্লান্তি, বিরক্তি এবং কাজে মনোযোগের অভাব দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া ঘুম ভাঙার পর হাতের কাছে ফোন পেলে মেসেজ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরীক্ষা করার প্রবণতা বাড়ে। এতে আবার ঘুমাতে দেরি হতে পারে।
যা করবেন: ঘুমানোর আগে ফোনে ‘ডু নট ডিস্টার্ব’ বা সাইলেন্ট মোড চালু রাখুন। জরুরি ফোন পাওয়ার প্রয়োজন হলে প্রয়োজনীয় নম্বরগুলোতে কলের অনুমতি দিতে পারেন। ফোনটি বালিশের পাশে না রেখে কিছুটা দূরে রাখলে বারবার সেটি দেখার প্রবণতাও কমতে পারে।
৩. মোবাইলের বিকিরণ নিয়ে কতটা উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত?
মোবাইল ফোন থেকে রেডিওফ্রিকোয়েন্সি বা আরএফ (RF) বিকিরণ নির্গত হয়। এটি নন-আয়োনাইজিং বিকিরণ, যা এক্স-রের মতো আয়োনাইজিং বিকিরণের তুলনায় ভিন্নভাবে কাজ করে। এর শক্তি ডিএনএ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যথেষ্ট নয় বলে বর্তমান বৈজ্ঞানিক ধারণা।
তবে মোবাইল ফোনের বিকিরণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা (IARC) রেডিওফ্রিকোয়েন্সি ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডকে ‘সম্ভাব্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী’ বা গ্রুপ ২বি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। এর অর্থ, সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায়নি; তবে এই শ্রেণিবিন্যাস মোবাইল ফোন ক্যান্সার ঘটায়—এমন প্রমাণ নয়।
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি বৃহৎ গবেষণা পর্যালোচনাতেও মোবাইল ফোনে কথা বলার সময়ের সঙ্গে মস্তিষ্কের টিউমারের ঝুঁকি বৃদ্ধির কোনো উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। সামগ্রিকভাবে, বর্তমান প্রমাণ শুধু বিছানার পাশে ফোন রাখার কারণে ক্যান্সার হয় বলে প্রতিষ্ঠা করে না।
যা করবেন: বিকিরণের সংস্পর্শ কমাতে চাইলে ঘুমানোর সময় ফোনটি শরীর ও মাথা থেকে কিছুটা দূরে রাখতে পারেন। কথা বলার সময় স্পিকার ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজন না থাকলে এয়ারপ্লেন মোড চালু রাখাও একটি বিকল্প।
৪. বালিশের নিচে ফোন চার্জ দেওয়া কেন বিপজ্জনক?
রাতে ফোন চার্জ দেওয়ার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো তাপ নিয়ন্ত্রণ। ফোন বালিশ, কম্বল বা তোশকের নিচে রাখলে উৎপন্ন তাপ সহজে বের হতে পারে না। ফলে ফোন অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষ করে নষ্ট ব্যাটারি, ত্রুটিপূর্ণ চার্জার কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত তার ব্যবহার করলে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। অতিরিক্ত তাপ থেকে পোড়ার ঘটনা কিংবা আগুন লাগার মতো দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।
যা করবেন: ফোন চার্জ দেওয়ার সময় সেটিকে বিছানা বা বালিশের ওপর না রেখে শক্ত, সমতল ও খোলা জায়গায় রাখুন। প্রস্তুতকারকের নির্দেশনা অনুযায়ী উপযুক্ত চার্জার ব্যবহার করুন। ফোনের ব্যাটারি ফুলে গেলে, তার নষ্ট হলে কিংবা চার্জ দেওয়ার সময় অস্বাভাবিক গরম হলে ব্যবহার বন্ধ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন।
৫. গভীর রাতে ফোন ব্যবহার বাড়াতে পারে মানসিক চাপ
বিছানার পাশে ফোন থাকলে গভীর রাতেও কাজের ইমেইল, খবর কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু সব সময় অনলাইনে থাকার এই অভ্যাস মানসিকভাবে বিশ্রাম নেওয়ার সময় কমিয়ে দিতে পারে।
উদ্বেগজনক খবর, কাজের বার্তা কিংবা অন্যদের জীবনযাপনের সঙ্গে নিজের তুলনা করার প্রবণতা মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। আবার রাত জেগে ফোন ব্যবহারের কারণে ঘুম কম হলে তার প্রভাব পরদিনের মেজাজ ও কর্মক্ষমতার ওপর পড়তে পারে।
তবে শুধু ফোন কাছে রাখলেই উদ্বেগ বা বিষণ্ণতা তৈরি হয়, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর যথেষ্ট প্রমাণ নেই। বরং দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহার, ঘুমের ঘাটতি এবং অনলাইন কার্যক্রমের চাপ একসঙ্গে মানসিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
যা করবেন: রাতে কাজের মেসেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ঠিক করুন। ঘুমানোর আগে বই পড়া, শান্ত অডিও শোনা কিংবা ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়ার মতো আরামদায়ক অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন।
সুস্থ ঘুমের জন্য কী মনে রাখবেন?
বালিশের পাশে মোবাইল ফোন রাখলেই যে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হবে, এমনটি বলার মতো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে ঘুমের আগে দীর্ঘ সময় ফোন ব্যবহার, নোটিফিকেশনের কারণে ঘুমের ব্যাঘাত এবং বিছানায় ফোন চার্জ দেওয়ার মতো অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো।
তাই রাতে ফোনের ব্যবহার সীমিত করুন, নোটিফিকেশন নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং চার্জ দেওয়ার সময় নিরাপদ জায়গা বেছে নিন। ছোট ছোট এই পরিবর্তনগুলো ঘুমের পরিবেশ আরও আরামদায়ক ও নিরাপদ করতে সাহায্য করতে পারে।
