মুখ খোলা রেখে ঘুমানোর অভ্যাসে শরীরে যেসব সমস্যা হতে পারে
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৮ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঘুমের মধ্যে মুখ খোলা রেখে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস অনেকেরই রয়েছে। বিশেষ করে সর্দি, অ্যালার্জি কিংবা নাক বন্ধ থাকলে এমনটা হতে পারে। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্বাভাবিক বোধ করায় অনেকেই বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেন না। তবে নিয়মিত মুখ খোলা রেখে ঘুমানোর অভ্যাস মুখের স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে ঘুমের মানেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ঘুমের সময় মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার কারণে মুখ ও গলা শুকিয়ে যাওয়া, নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ এবং দাঁত ও মাড়ির বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি নাক কিংবা শ্বাসনালির কোনো সমস্যার কারণেও এমন অভ্যাস তৈরি হতে পারে। তাই নিয়মিত এমনটা হলে এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়া কেন বেশি উপকারী?
শ্বাস নেওয়ার সময় নাক শুধু বাতাস চলাচলের পথ হিসেবে কাজ করে না; এটি বাতাসকে পরিশোধন, উষ্ণ ও আর্দ্র করতেও সাহায্য করে। নাকের ভেতরের সূক্ষ্ম গঠন ধুলাবালি ও বিভিন্ন কণা আটকে রাখতে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি নাক দিয়ে শ্বাস নেওয়ার সময় তৈরি হওয়া নাইট্রিক অক্সাইড ফুসফুসের কার্যক্রম ও রক্তপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার ফলে বাতাস সরাসরি মুখ ও গলার মধ্য দিয়ে প্রবেশ করে। এতে মুখের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে যেতে পারে এবং গলায় অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
সর্দি-কাশি বা সাময়িক নাক বন্ধ থাকার কারণে মাঝে মাঝে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া সাধারণ ঘটনা। তবে দীর্ঘদিন এমন হলে অ্যালার্জি, নাকের গঠনগত সমস্যা কিংবা শ্বাসপ্রশ্বাসের অন্য কোনো জটিলতা রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
মুখ খোলা রেখে ঘুমালে যেসব সমস্যা হতে পারে
১. মুখ ও গলা শুকিয়ে যাওয়া
সারারাত মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার কারণে মুখের ভেতরের আর্দ্রতা কমে যেতে পারে। ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ শুকনো লাগা, গলায় খুসখুসে ভাব কিংবা ব্যথা অনুভূত হতে পারে।
২. নিঃশ্বাসে দুর্গন্ধ
লালা মুখের ভেতর থেকে খাবারের অবশিষ্টাংশ ও কিছু ব্যাকটেরিয়া সরিয়ে রাখতে সাহায্য করে। মুখ শুকিয়ে গেলে লালার পরিমাণ কমে যায়। এর ফলে মুখে দুর্গন্ধ তৈরি হতে পারে।
৩. দাঁত ও মাড়ির সমস্যা
দাঁত ও মাড়িকে সুরক্ষিত রাখতে লালার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মুখ দীর্ঘসময় শুকনো থাকলে দাঁতের ক্ষয়, মাড়িতে প্রদাহ এবং অন্যান্য মুখের সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৪. ঠোঁট ফেটে যাওয়া ও জিহ্বায় আস্তরণ পড়া
ঘুমের সময় মুখ দিয়ে বাতাস চলাচলের কারণে ঠোঁটের আর্দ্রতা কমে যেতে পারে। এতে ঠোঁট শুষ্ক হয়ে ফেটে যেতে পারে। একই সঙ্গে জিহ্বায় সাদা বা অন্য ধরনের আস্তরণও দেখা দিতে পারে।
৫. নাক ডাকা ও ঘুমের ব্যাঘাত
মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস নাক ডাকার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। বিশেষ করে শ্বাসনালিতে বাধা থাকলে ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হতে পারে। ফলে পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও সকালে ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।
২০২২ সালে পলিমারস (বাসেল) সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় মুখের আর্দ্রতা কমে যাওয়ার সঙ্গে দাঁতের ক্ষয় ও মুখের সংক্রমণের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে মুখ শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও অন্যান্য শারীরিক কারণও থাকতে পারে।
মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া কি ঘুমের মান নষ্ট করে?
ঘুমের সময় মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে যদি শ্বাসনালির সমস্যা যুক্ত থাকে, তাহলে ঘুমের মান খারাপ হতে পারে। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া। এ সমস্যায় ঘুমের মধ্যে শ্বাসনালির ওপরের অংশ বারবার সরু হয়ে যায় বা বন্ধ হয়ে পড়ে। ফলে স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি হয়।
স্লিপ অ্যাপনিয়ার সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে জোরে নাক ডাকা, ঘুমের মধ্যে দম আটকে আসা বা হাঁপিয়ে ওঠা, সকালে মাথাব্যথা এবং দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুম পাওয়া।
আমেরিকান থোরাসিক সোসাইটির প্রকাশনায়ও স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে শুধু মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস থাকলেই কারও স্লিপ অ্যাপনিয়া হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য উপসর্গ ও চিকিৎসার ইতিহাস বিবেচনা করা জরুরি।
দীর্ঘদিন ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে মনোযোগ, মেজাজ ও দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে নাক ডাকার সঙ্গে ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা বা দিনের বেলায় অতিরিক্ত ক্লান্তির মতো লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
মাঝেমধ্যে মুখ খোলা রেখে ঘুমানো সাধারণত উদ্বেগের কারণ নয়। তবে নিয়মিত এমন হলে, নাক দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে কিংবা ঘুমের মধ্যে জোরে নাক ডাকা ও শ্বাস আটকে আসার লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন।
নাক বন্ধ থাকার কারণ শনাক্ত করে তার চিকিৎসা করা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং মুখের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা উপকারী হতে পারে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া মুখে টেপ লাগিয়ে ঘুমানো উচিত নয়, বিশেষ করে নাক বন্ধ থাকা বা শ্বাসপ্রশ্বাসের সমস্যা থাকলে।
মুখ খোলা রেখে ঘুমানোর অভ্যাসকে সবসময় সাধারণ সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। নিয়মিত এমন হলে এর কারণ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই সুস্থ ঘুম ও মুখের স্বাস্থ্য বজায় রাখার ভালো উপায়।

-6ad232f452c49.jpg)