অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের সময় চিনি খেলে বাড়তে পারে অন্ত্রের ক্ষতি: গবেষণা
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের সময় অতিরিক্ত চিনি খেলে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে অন্ত্রের জীবাণুর বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে তীব্র করতে পারে খাদ্যতালিকায় থাকা অতিরিক্ত চিনি। এতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বংশবিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এনওয়াইইউ ল্যাঙ্গোন হেলথ, সিটি অব হোপ এবং মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টারের গবেষকেরা এ গবেষণা পরিচালনা করেন। গবেষণায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত ১৭৩ জন রোগীর খাওয়ার ৯ হাজার ৪১৯টি খাবারের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। পাশাপাশি তাদের অন্ত্রের জীবাণুর পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা শুরুর আগের ৪৮ ঘণ্টায় প্রতি অতিরিক্ত ১০০ গ্রাম চিনি গ্রহণের সঙ্গে অন্ত্রের জীবাণুর বৈচিত্র্য বা ‘আলফা ডাইভারসিটি’ আরও ২১ শতাংশ কমে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে। অন্ত্রে বিভিন্ন প্রজাতির ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ও বৈচিত্র্য পরিমাপ করতে এই সূচক ব্যবহার করা হয়।
গবেষণার ফলাফল গত ৩০ সেপ্টেম্বর নেচার সাময়িকীতে অনলাইনে প্রকাশিত হয়। এতে আরও দেখা গেছে, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সমন্বয়ের সঙ্গে এন্টারোকক্কাস ফেসিয়াম নামের একটি ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। এই ব্যাকটেরিয়া এমন কিছু সংক্রমণের সঙ্গে যুক্ত, যেগুলোর চিকিৎসা করা কঠিন হতে পারে।
ইঁদুরের ওপর পরীক্ষাতেও মিলেছে একই প্রবণতা
গবেষকেরা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়েও একই ধরনের ফল পেয়েছেন। পরীক্ষায় অ্যান্টিবায়োটিক বায়াপেনেমের পাশাপাশি সুক্রোজযুক্ত খাবার গ্রহণকারী ইঁদুরের অন্ত্রে তৃতীয় দিনেই এন্টারোকক্কাস ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা ১৬ দশমিক ৩ গুণ বেড়ে যায়। ষষ্ঠ দিনে এই ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ দশমিক ৪ গুণে।
গবেষণার সহপ্রধান লেখক ও এনওয়াইইউ ল্যাঙ্গোনের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জোনাস শ্লুটার বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের কারণে অন্ত্রের জীবাণুসমাজে যে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষতি হয়, তার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। এ ঝুঁকি কমাতে সহায়ক বিষয়গুলো চিহ্নিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ৯ হাজারের বেশি খাবারের তথ্য বিশ্লেষণ করে পাওয়া ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের সময় এবং পরবর্তী সময়ে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা, বিশেষ করে মিষ্টিজাতীয় খাবার কমানো, অন্ত্রের ক্ষতি সীমিত রাখতে সহায়ক হতে পারে।
রক্তের ক্যানসারে আক্রান্তদের কেন বেছে নেওয়া হলো
গবেষণায় রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, কারণ তাদের প্রায়ই অ্যান্টিবায়োটিক নিতে হয় এবং হাসপাতালে অবস্থানকালে তাদের খাবারের হিসাব নিয়মিত রাখা সম্ভব। গবেষকেরা প্রতিবারের খাবারের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি প্রতিদিন তাদের অন্ত্রের জীবাণুর নমুনাও পরীক্ষা করেন।
গবেষণার সহপ্রধান লেখক ও সিটি অব হোপের প্রধান চিকিৎসা নির্বাহী মার্সেল ভ্যান ডেন ব্রিংক বলেন, ক্যানসারের চিকিৎসায় অন্ত্রের জীবাণুসমাজের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের মতো নিবিড় চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর বৈচিত্র্য চিকিৎসার ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত যেসব রোগীর স্টেম সেল প্রতিস্থাপন করা হয়, তাদের অনেককে কেমোথেরাপি ও অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার জন্য কয়েক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকতে হয়। এ সময়ে তাদের খাদ্যাভ্যাস এবং অন্ত্রের জীবাণুসমাজে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা ও বৈচিত্র্য কমে গেলে এন্টারোকক্কাস ফেসিয়াম-এর মতো সম্ভাব্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বেড়ে ওঠার সুযোগ পেতে পারে।
ক্যানসার রোগীদের চিকিৎসায় কী প্রভাব পড়তে পারে
গবেষণার আরেক সহপ্রধান লেখক ও মেমোরিয়াল স্লোন কেটারিং ক্যানসার সেন্টারের চিকিৎসক জোনাথন পেলেড বলেন, বিশেষ করে রক্তের ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে অন্ত্রের জীবাণুসমাজের ক্ষতির সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধি ও বিভিন্ন সংক্রমণের সম্পর্ক রয়েছে। খাদ্যাভ্যাসে স্বল্পমেয়াদি পরিবর্তন রোগীদের চিকিৎসার ফলাফল উন্নত করতে পারে কি না, তা জানতে ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রয়োজন।
গবেষকদের ধারণা, অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পরও টিকে থাকা কিছু ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া খাদ্য থেকে পাওয়া চিনি ব্যবহার করে দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। এ কারণে অতিরিক্ত চিনি অ্যান্টিবায়োটিকের প্রভাবে অন্ত্রের জীবাণুসমাজে সৃষ্ট ক্ষতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তবে চিনি সরাসরি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকে পুষ্টি জোগায়, নাকি উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে তাদের প্রতিযোগিতাকে দুর্বল করে, কিংবা অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় এ পরিবর্তন ঘটে—তা এখনো নিশ্চিত নয়।
গবেষকেরা বলছেন, অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের সময় ও পরবর্তী সময়ে সাধারণ চিনি বা সরল শর্করার পরিমাণ কমানো অন্ত্রের জীবাণুসমাজের ক্ষতি সীমিত রাখতে সহায়ক হতে পারে। তবে খাদ্যাভ্যাসে এমন পরিবর্তন রোগীদের সংক্রমণ, চিকিৎসার ফলাফল কিংবা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায় কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সূত্র: সাইন্স ডেইলি

