খতিয়ানে নাম আছে, দলিল নেই? যেভাবে প্রমাণ করবেন জমির মালিকানা
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জমির খতিয়ানে নিজের বা পূর্বপুরুষের নাম রয়েছে, কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মূল দলিল। এমন পরিস্থিতিতে জমির মালিকানা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েন অনেকেই। কেউ মনে করেন, খতিয়ানে নাম থাকলেই জমির মালিকানা নিশ্চিত। আবার দলিল না থাকায় অনেকে জমির অধিকার হারানোর আশঙ্কা করেন। তবে আইন অনুযায়ী, খতিয়ানে নাম থাকা জমির মালিকানার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলেও সব ক্ষেত্রে এটি চূড়ান্ত মালিকানার দলিল নয়।
ভূমি আইনসংশ্লিষ্টদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে প্রথমেই জমিটি কীভাবে পাওয়া হয়েছিল, কোন জরিপে নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলের কোনো তথ্য সংরক্ষিত আছে কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
খতিয়ানে নাম থাকলেই কি মালিকানা নিশ্চিত?
খতিয়ানে কারও নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলে তা জমির মালিকানার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়। রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ১৪৪এ ধারা অনুযায়ী, ওই আইনের অধীনে প্রস্তুত বা সংশোধিত স্বত্বলিপির প্রতিটি এন্ট্রি প্রমাণ হিসেবে গণ্য হবে। ভুল প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট তথ্য সঠিক বলে ধরে নেওয়া হয়।
তবে এই অনুমান চূড়ান্ত নয়। বিপরীত পক্ষ যথাযথ প্রমাণের মাধ্যমে খতিয়ানের তথ্য ভুল প্রমাণ করতে পারে। তাই শুধু খতিয়ানে নাম থাকার ভিত্তিতে জমির মালিকানা নিশ্চিত ধরে নেওয়া ঠিক নয়। জমিটি কীভাবে অর্জিত হয়েছে, আগের মালিকের সঙ্গে বর্তমান মালিকের সম্পর্ক কী এবং জমির দখল কার কাছে রয়েছে, সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।
প্রথমেই যাচাই করুন কোন খতিয়ানে নাম রয়েছে
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে সিএস, এসএ, আরএস, বিএস ও সিটি জরিপের খতিয়ান তৈরি হয়েছে। কোন খতিয়ানে নিজের বা পূর্বপুরুষের নাম রয়েছে, তা শনাক্ত করা জরুরি।
পুরোনো খতিয়ানে নাম থাকলেও পরবর্তী জরিপে জমির দাগ, পরিমাণ কিংবা মালিকানার তথ্য পরিবর্তিত হতে পারে। আবার সর্বশেষ জরিপের খতিয়ানে নাম থাকলে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজে আসতে পারে।
এ জন্য সংশ্লিষ্ট জমির প্রাসঙ্গিক সব খতিয়ান সংগ্রহ করে মালিকের নাম, মৌজা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও সীমানা মিলিয়ে দেখতে হবে।
মূল দলিল হারিয়ে গেলে যেভাবে সংগ্রহ করবেন নকল
জমির মূল দলিল হারিয়ে গেলে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। জমিটি বিক্রয়, দান, হেবা কিংবা বণ্টনের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিসের রেজিস্টার ও সূচিবহিতে দলিলের তথ্য থাকার কথা।
রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর ৫৭ ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত ফি দিয়ে সংশ্লিষ্ট রেজিস্টার ও সূচিবহি পরিদর্শন করা যায়। সেখানে দলিলের তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী সার্টিফায়েড কপি বা নকল সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে।
দলিলের নম্বর ও রেজিস্ট্রির সাল জানা থাকলে অনুসন্ধান সহজ হয়। এগুলো জানা না থাকলেও বিক্রেতা ও ক্রেতার নাম, সম্ভাব্য রেজিস্ট্রির সময়কাল, মৌজা এবং জমির অন্যান্য পরিচিত তথ্য দিয়ে অনুসন্ধান করা যেতে পারে।
দলিলের নকল সংগ্রহের জন্য সাধারণত যেসব তথ্য প্রয়োজন হতে পারে—
- দলিলের সম্ভাব্য রেজিস্ট্রির সাল।
- বিক্রেতা ও ক্রেতার নাম।
- দলিল নম্বর, জানা থাকলে।
- জমির মৌজা ও দাগ নম্বর।
- খতিয়ান নম্বর ও জমির পরিমাণ।
- দলিলের ধরন, যেমন বিক্রয়, দান বা বণ্টননামা।
রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল না পাওয়া গেলে কী করবেন?
সংশ্লিষ্ট অফিসে অনুসন্ধানের পরও দলিলের তথ্য পাওয়া না গেলে জমির মালিকানা নেই, এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ জমির মালিকানা অর্জনের সব পথ বিক্রয় দলিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
উত্তরাধিকার, সরকারি বন্দোবস্ত, নিলাম কিংবা আদালতের ডিক্রির মাধ্যমেও জমির মালিকানা অর্জিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সংগ্রহ করতে হবে।
উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পেয়ে থাকলে পূর্ববর্তী মালিকের দলিল, খতিয়ান, মৃত্যু সনদ ও ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করতে হবে। সরকারি বন্দোবস্তের জমি হলে বরাদ্দপত্র বা সংশ্লিষ্ট সরকারি আদেশ সংগ্রহ করতে হবে। আদালতের মাধ্যমে মালিকানা অর্জিত হলে রায়, ডিক্রি ও প্রয়োজনীয় আদেশের সার্টিফায়েড কপি প্রয়োজন হবে।
খতিয়ান, দাগ ও জমির দখল মিলিয়ে দেখুন
জমির মালিকানা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কাগজপত্রের পাশাপাশি বাস্তব দখলের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। খতিয়ান, দলিল এবং অন্যান্য নথিতে উল্লেখ করা মৌজা, দাগ নম্বর, জমির পরিমাণ ও সীমানার সঙ্গে বাস্তব জমির অবস্থান মিলিয়ে দেখতে হবে।
প্রয়োজনে মৌজা নকশা সংগ্রহ করে অভিজ্ঞ আমিনের মাধ্যমে জমির অবস্থান ও পরিমাণ যাচাই করা যেতে পারে। জমি অন্য কারও দখলে থাকলে কিংবা সীমানা নিয়ে বিরোধ থাকলে সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এ ছাড়া ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা, নামজারি খতিয়ান ও দখলসংক্রান্ত অন্যান্য কাগজপত্র মালিকানার দাবির পক্ষে সহায়ক প্রমাণ হতে পারে। তবে এসব নথির কোনো একটিকেই এককভাবে চূড়ান্ত মালিকানার প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক নয়।
