বিদ্যুৎ-গ্যাস ছাড়াই সূর্যের আলোয় রান্না হবে এই চুলায়
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৫ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিদ্যুৎ নেই, গ্যাসের সংকট কিংবা রান্নার খরচ কমানোর চিন্তা—এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প হতে পারে সৌরশক্তিচালিত রান্নার যন্ত্র। ১২ ও ২৪ ভোল্টের চুলা, কুকার ও রাইস কুকারের মতো পণ্য নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। তবে এসব যন্ত্র কীভাবে কাজ করে, সাধারণ সোলার প্যানেল দিয়ে চালানো যায় কি না এবং বাংলাদেশে কোথায় পাওয়া যায়, তা জেনে কেনা জরুরি।
প্রথমেই মনে রাখতে হবে, ১২ বা ২৪ ভোল্ট লেখা থাকলেই কোনো যন্ত্র সরাসরি সোলার প্যানেলে যুক্ত করে রান্না করা যাবে, এমন নয়। রান্নার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, প্যানেলের ক্ষমতা, ব্যাটারি এবং চার্জ কন্ট্রোলারের সামঞ্জস্য বিবেচনা করতে হয়।
দুই ধরনের সোলার কুকার
সৌরশক্তিচালিত রান্নার যন্ত্র মূলত দুই ধরনের হতে পারে।
১. সৌরবিদ্যুতে চলা ইলেকট্রিক কুকার
এ ধরনের কুকারে সোলার প্যানেল থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ সরাসরি অথবা ব্যাটারিতে জমা করে ব্যবহার করা হয়। ১২ বা ২৪ ভোল্ট হলো ডিসি বিদ্যুতের ভোল্টেজ। এই বিদ্যুৎ দিয়ে বিশেষভাবে তৈরি রাইস কুকার বা হিটিং পট চালানো যায়। তবে যন্ত্রটির বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষমতা বা ওয়াট অনুযায়ী সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি নির্বাচন করতে হয়।
২. সূর্যের তাপে রান্নার কুকার
এ ধরনের কুকারে বিদ্যুৎ ছাড়াই সূর্যের আলো ও তাপ ব্যবহার করে খাবার রান্না করা হয়। কিছু মডেলে প্রতিফলক আয়না বা বিশেষ সৌর টিউবের সাহায্যে সূর্যের তাপ নির্দিষ্ট একটি পাত্রে কেন্দ্রীভূত করা হয়। এতে ব্যাটারি বা বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না। তবে রান্নার জন্য পর্যাপ্ত রোদ থাকতে হয়।
বাংলাদেশে এই দুই প্রযুক্তির পার্থক্য বুঝে কেনাকাটা করা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ‘সোলার কুকার’ নাম দেখে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না যে সেটি বিদ্যুৎ ছাড়াই সব ধরনের রান্না করতে পারবে। আবার সব মডেল সূর্যের আলো ব্যবহার করে সরাসরি রান্না করে না।
বাংলাদেশে কোথায় পাওয়া যায়, দাম কত?
বাংলাদেশে এ ধরনের পণ্য একেবারে নতুন নয়। তবে ১২ বা ২৪ ভোল্টের ডিসি কুকার এবং সরাসরি সূর্যের তাপে রান্নার কুকারের বাজার ও বিক্রির জায়গা আলাদা। দেশীয় অনলাইন শপ এবং দারাজের মতো ই-কমার্স সাইটে এসব চুলা ও মাল্টি কুকার পাওয়া যাচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শুধু চুলার দাম ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে হতে পারে। প্যাকেজভেদে দাম দেখানো হয়েছে ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে প্যাকেজের মধ্যে শুধু চুলা, নাকি ব্যাটারি ও উপযোগী হাঁড়ি-পাতিলসহ অন্যান্য সরঞ্জাম রয়েছে, তা বিক্রেতার কাছ থেকে নিশ্চিত হতে হবে। কেনার আগে পণ্যের মজুত, ওয়ারেন্টি ও ভোল্টেজ সম্পর্কেও জেনে নেওয়া জরুরি।
যেভাবে কাজ করে সোলার রাইস কুকার
সোলার রাইস কুকার ব্যবহার করতে প্রথমে সোলার প্যানেলকে এমপিপিটি চার্জ কন্ট্রোলারের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। এরপর কন্ট্রোলারের মাধ্যমে ব্যাটারি চার্জ হয়। ব্যাটারি থেকে নির্দিষ্ট ভোল্টেজের ডিসি বিদ্যুৎ কুকারে সরবরাহ করা হয়।
এরপর রাইস কুকারে চাল ও পানি দিয়ে সাধারণ নিয়মেই ভাত রান্না করা যায়। কিছু মডেলে স্যুপ, সবজি সিদ্ধ করা কিংবা খাবার গরম করার সুবিধাও থাকে।
অন্যদিকে, সূর্যের তাপে রান্নার কুকারে খাবারের পাত্র নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়ে সূর্যের আলো প্রতিফলিত বা কেন্দ্রীভূত করতে হয়। রোদ যত ভালো থাকবে, রান্নার জন্য পর্যাপ্ত তাপ পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বেশি। মেঘলা আবহাওয়ায় রান্না ধীর হতে পারে।
কেনার আগে যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন
১২ ও ২৪ ভোল্টের কুকারের বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষমতা এক নয়। তাই শুধু ভোল্টেজ দেখে পণ্য কেনা ঠিক হবে না। কত ওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন, কতক্ষণ চালানো যাবে এবং ব্যাটারির ধারণক্ষমতা কত—এসব বিষয় জেনে নিতে হবে।
বিশেষ করে ১২ ভোল্টের কুকার চালাতে বেশি কারেন্টের প্রয়োজন হতে পারে। তাই উপযুক্ত তার ও মানসম্মত সংযোগ ব্যবহার করা জরুরি। নিম্নমানের সংযোগ বা প্রয়োজনের তুলনায় পাতলা তার ব্যবহার করলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সৌরবিদ্যুৎচালিত কুকার নিয়ে গবেষণা বাংলাদেশেও
বাংলাদেশে সোলার কুকিং প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনার্জির গবেষকেরা ২০২৩ সালে সৌরবিদ্যুৎচালিত ডিসি ইন্ডাকশন কুকারের নকশা ও কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।
এস এম এন শামস, এফ সুলতানা, এ সাহা এবং এম এ হক ‘পাওয়ার পয়েন্ট ট্র্যাকার মাউন্টেড সোলার পাওয়ার্ড ডিসি ইন্ডাকশন কুকার’ শিরোনামে গবেষণাটি করেন। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চে (বিজেএসআইআর) এটি প্রকাশিত হয়। গবেষণায় সোলার প্যানেল, এমপিপিটি চার্জ কন্ট্রোলার ও ব্যাটারির সমন্বয়ে রান্নার ব্যবস্থা তুলে ধরা হয়েছে।
লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ-সংকটের সময় সোলার কুকার বিকল্প হতে পারে। তবে এটি কিনলেই বিনা খরচে রান্না করা যাবে, এমন নয়। সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও কুকার কেনার জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। পরিবারের দৈনিক রান্নার চাহিদা অনুযায়ী সঠিক ক্ষমতার ব্যবস্থা বেছে নিতে পারলে এই প্রযুক্তি কাজে আসতে পারে।
