রাজনৈতিক ছোটগল্প
আপন বলয়ের অন্ধকার
Advertisement
মারুফ কামাল খান
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১৪ পিএম
সাংবাদিক ও বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেসসচিব মারুফ কামাল খান। ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সৈয়দ আলম জানালার পাশে বসে ছিলেন। বাইরে সন্ধ্যা নামছে। আকাশে মেঘ। দূরে কোথাও মিছিলের শব্দ। টেবিলের ওপর ছড়ানো কয়েকটি সংবাদপত্র। সব কটির শিরোনাম প্রায় এক। ফরহাদ জাহিদের জনপ্রিয়তায় ধস। আলম খবরটি পড়লেন। তারপর পত্রিকাটি ভাঁজ করে রাখলেন। একসময় এই ফরহাদ জাহিদকে নিয়েই তিনি লিখেছিলেন। কত রাত জেগে! কত ঝুঁকি নিয়ে! কত গালাগাল সয়ে! আজ সেই ফরহাদই তার ফোন ধরেন না।
আলমের মনে পড়ল বহু বছর আগের কথা। সালিম জাহিদ ছিলেন দেশের জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি। মানুষ তাকে ভালোবাসত। বিরোধীরাও তার সততা নিয়ে খুব বেশি প্রশ্ন তুলতে পারত না। কিন্তু সততা অনেক সময় দুর্গতিরও কারণ হয়। রাষ্ট্রপতি মারা যাওয়ার সময় ফরহাদ কিশোর। পরিবারে তেমন সম্পদ নেই। রাজনীতির ক্ষমতা আছে, কিন্তু সেই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সম্পদ গড়ার মানুষ সালিম জাহিদ ছিলেন না। ফরহাদের মা সংসার সামলালেন। সন্তানদের মানুষ করলেন। অভাবের সঙ্গে লড়লেন। ফরহাদ তার বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করতে পারেননি। সংসারের দায় তাকে ব্যবসায় নামিয়ে দিল।
বন্ধুরা বলত, ‘তুমি চাইলে অনেক কিছু করতে পারো। তোমার বাবা এই দেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন।’
ফরহাদ হাসতেন। ‘বাবার নাম বিক্রি করে ব্যবসা করতে চাই না।’
‘সরকার তোমার নিজের দলের। একটু সুযোগ নিলে ক্ষতি কী?’
‘সরকার আমার দলের হতে পারে। কিন্তু সরকারি সম্পদ আমার নয়।’
বন্ধুরা হাসত। কেউ প্রশংসা করত। কেউ মনে মনে তাঁকে বোকা ভাবত।
ফরহাদ বুঝতে পারেননি, তার এই সরলতাই একদিন তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হয়ে উঠবে। ফরহাদের চারপাশে বন্ধুদের ভিড় বাড়তে লাগল। কেউ ব্যবসার অংশীদার হলো। কেউ সরকারি দপ্তরে তদবির শুরু করল। কেউ তার নাম ব্যবহার করে কাজ বাগিয়ে নিল।
‘ফরহাদ ভাইয়ের লোক।’ এই পরিচয়টুকুই যথেষ্ট ছিল। কেউ সুবিধা পেল। কেউ কমিশন খেল। কেউ রাতারাতি বড়লোক হয়ে গেল। ফরহাদ কিছুই জানতেন না। কিংবা সব খবর তার কাছে পৌঁছাত না। কিন্তু রাজনীতিতে সত্যের চেয়ে অপপ্রচারের গতি ও ক্ষমতা অনেক সময় প্রবল হয়।
বিরোধী দল জনতা সংঘের নেতারা সুযোগটি লুফে নিলেন। তাদের সমর্থক সংবাদপত্রগুলো একের পর এক প্রতিবেদন ছাপতে শুরু করল। কোনোটিতে সত্য ছিল। কোনোটিতে অর্ধসত্য। কোনোটিতে কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের এমন মিশেল, সত্য-মিথ্যা আলাদা করাই কঠিন।
শিরোনামগুলো ছিল আরও চটকদার।
সাবেক রাষ্ট্রপতিপুত্রের দুর্নীতির সাম্রাজ্য!
ক্ষমতার আড়ালে ফরহাদের কোটি কোটি টাকার কারবার!
সততার মুখোশের আড়ালে আসল চেহারা!
ফরহাদ প্রতিবাদ করলেন। কিন্তু তার প্রতিবাদের ভাষা ছিল দুর্বল। তিনি মানুষকে চিনতেন, কিন্তু প্রচারযুদ্ধ বুঝতেন না। বন্ধুদের বিশ্বাস করতেন, কিন্তু সেই বিশ্বাসের মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা বুঝতেন না। একদিন এক সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার নাম ব্যবহার করে অনেকে সরকারি সুবিধা নিচ্ছে। আপনি জানেন?’
ফরহাদ থমকে গেলেন।
‘আমি কাউকে অনুমতি দিইনি।’
‘কিন্তু তারা তো আপনার ঘনিষ্ঠ।’
‘ঘনিষ্ঠ হলেই কি তাদের সব কাজের দায় আমার?’
সাংবাদিক মুচকি হাসলেন।
‘রাজনীতিতে মানুষ ঠিক এই প্রশ্নটাই করে না, ফরহাদ সাহেব। তারা জানতে চায়, আপনি তাদের থামিয়েছেন কিনা।’
ফরহাদ কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।
সেই নীরবতাই পরদিন আরেকটি শিরোনাম হয়ে গেল।
এক সময় দেশে এলো সাধারণ নির্বাচন। তার আগেই অপপ্রচারের একতরফা লড়াইয়ে ফরহাদ ও তার সমর্থক দলকে ধরাশায়ী করে ফেলা হয়। নির্বাচনে বিরোধী দল জনতা সংঘ জয়ী হলো। ফরহাদের দলের পতন ঘটল। এরপর শুরু হলো মামলা। একটির পর একটি। ব্যবসায়িক অনিয়ম। অর্থ আত্মসাৎ। ক্ষমতার অপব্যবহার। ষড়যন্ত্র। কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা—সেটি বিচার করার আগেই ফরহাদ বুঝলেন, দেশে থাকলে তাকে বাঁচতে দেওয়া হবে না। এক রাতে তিনি দেশ ছাড়লেন। আমেরিকায় পৌঁছে প্রথম যে জিনিসটি শিখলেন, তা হলো বেঁচে থাকার জন্য পরিচয়ের চেয়ে কাজের দাম বেশি। কখনো রেস্তোরাঁয়, কখনো দোকানে, কখনো অন্যের প্রতিষ্ঠানে ছোটখাটো কাজ করতেন। দিনের শেষে ক্লান্ত শরীরে ফিরে এসে বাবার ছবি দেখতেন।
মাঝেমধ্যে মাকে ফোন করতেন। মা জিজ্ঞেস করতেন, ‘কেমন আছিস?’
‘ভালো আছি।’
‘কষ্ট হয় না?’
ফরহাদ একটু চুপ করে থাকতেন।
‘হয়। তবে কষ্টের চেয়ে মিথ্যে অপবাদের অপমান বেশি লাগে, মা।’
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন।
‘মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিলি। আবার পাবি। কিন্তু একটা কথা মনে রাখিস—মানুষের ভালোবাসা আর মানুষের বিশ্বাস এক জিনিস নয়।’
তখন কথাটির অর্থ ফরহাদ বুঝতেন না।
এদিকে স্বদেশে জনতা সংঘের শাসন ক্রমে কঠোর হয়ে উঠল। প্রথমে বিরোধীদের কণ্ঠ রোধ করা হলো। পরে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত হলো। তারপর মানুষের ভোটাধিকারও কেড়ে নেওয়া হলো। সংঘের নেত্রী শামিমা বেগের সরকার রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইল। প্রতিবেশী শক্তিশালী দেশের মদতে তিনি দুর্দমনীয় হয়ে উঠলেন।
মানুষ ভয়ে চুপ করে থাকত। কিন্তু নীরবতা সব সময় সম্মতির নাম নয়। কখনো কখনো নীরবতা জমে জমে বিস্ফোরক হয়ে ওঠে। একসময় মানুষ রাস্তায় নামল। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী—সবাই। যে মানুষটি এত দিন দরজা বন্ধ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন, তিনিও একদিন মিছিলে দাঁড়ালেন। যে তরুণটি ভোট দিতে পারেনি, সেও স্লোগান দিল। যে সাংবাদিক এত দিন সেন্সরের ভয়ে কলম থামিয়ে রেখেছিলেন, তিনিও লিখলেন।
জনতা সংঘের পতন হলো। শামিমা বেগ পালিয়ে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিলেন। দেশ আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। ফরহাদ জাহিদের দেশে ফেরার দিন বিমানবন্দরে মানুষের ঢল নামল। কেউ ফুল দিল। কেউ স্লোগান তুলল। কেউ কাঁদল। ফরহাদ কাঁদলেন না। শুধু দুহাত তুলে বললেন, ‘আমি আপনাদের কাছে ফিরে এসেছি। এবার আমরা দেশটাকে গড়ব।’
মানুষ বিশ্বাস করল। কারণ মানুষ তখন একজন মানুষকে নয়, একটি সম্ভাবনাকে স্বাগত জানাচ্ছিল। লেখক-সাংবাদিক সৈয়দ আলম সেদিন সশরীরে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন না। কিন্তু তার পত্রিকার প্রথম পাতায় তিনি লিখেছিলেন— একজন মানুষের দেশে ফেরা নয়, একটি হারানো সম্ভাবনার প্রত্যাবর্তন। এই লেখাটি দেশজুড়ে আলোচিত হয়েছিল।
আলম ফরহাদের পক্ষে লিখেছিলেন শুধু আবেগ থেকে নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই মানুষটি অন্তত জনতা সংঘের মতো হবে না। তার মধ্যে সততার স্মৃতি আছে। নির্বাসনের অভিজ্ঞতা আছে। অপমানের দাগ আছে। যে মানুষ অপমানিত হয়েছে, সে অন্যের অপমান বুঝবে—আলম এমনটাই ভেবেছিলেন।
দেশে ফিরে ফরহাদ একের পর এক কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। কর্মসংস্থান। শিক্ষা সংস্কার। স্বাস্থ্যসেবা। দুর্নীতি দমন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। প্রশাসনের জবাবদিহি। জনগণ উচ্ছ্বসিত হলো। নির্বাচনে ফরহাদ বিপুল ভোটে রাষ্ট্রপতি হলেন।
আলম তার পত্রিকায় সম্পাদকীয় লিখলেন— ফরহাদ জাহিদের সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিরোধীদের পরাজিত করা নয়। নিজের চারপাশের মানুষদের জবাবদিহির মধ্যে রাখা।
লেখাটি পড়ে ফরহাদ ফোন করেছিলেন।
‘আলম ভাই, আপনি আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন?’
আলম হেসেছিলেন।
‘ভয় দেখাচ্ছি না। পুরোনো ভুলের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি।’
‘এবার ভুল করব না।’
‘সেই কথাটাই যেন ভুলে না যান।’
ফরহাদ বলেছিলেন, ‘আপনি পাশে থাকবেন।’
আলম উত্তর দিয়েছিলেন, ‘আপনি দেশের পাশে থাকলে আমি আপনার পাশেই থাকব।’
তখন দুজনেই কথাটির গভীরতা বুঝেছিলেন।
কিন্তু কেউই জানতেন না, একদিন এই কথাই তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করবে।
ক্ষমতার প্রথম কয়েক মাস ভালোই কাটল।
তারপর ধীরে ধীরে ফরহাদের চারপাশে একটি নতুন বলয় তৈরি হলো। তারা তার পুরোনো বন্ধু। কেউ ব্যবসায়ী। কেউ অল্পশিক্ষিত রাজনৈতিক কর্মী। কেউ এমন মানুষ, যার সবচেয়ে বড় যোগ্যতা হলো—ফরহাদের প্রতিটি কথায় মাথা নাড়তে পারা।
তারা বলত, ‘স্যার, আপনার মতো জনপ্রিয় নেতা এ দেশে আর আসেনি।’
‘দেশ যা চায় আপনি তার চেয়েও বেশি দেওয়ার কথা ভাবছেন।’
‘বিরোধীরা আপনার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত।’
‘সমালোচকদের কথায় কান দিলে চলবে না।’
ফরহাদ প্রথমে আপত্তি করতেন। বলতেন, 'সরকারের সমালোচনা তো দরকার।’
একজন বলত, ‘গঠনমূলক সমালোচনা দরকার, স্যার। শত্রুর অপপ্রচার নয়।’
আরেকজন যোগ করত, ‘কিছু মানুষ নিজেদের গুরুত্ব বাড়াতে আপনার বিরুদ্ধে লেখে।’
ফরহাদ চুপ হয়ে যেতেন।
এভাবেই সত্য আর অপপ্রচারের মাঝখানে একটি অদৃশ্য দেয়াল উঠতে লাগল।
যারা তাকে সত্যি কথা বলত, তারা ধীরে ধীরে দূরে সরে গেল। যারা তার পছন্দের কথা বলত, তারা আরও কাছে এল।
ফরহাদ হয়তো ভাবতেন, তার চারপাশে বিশ্বস্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে।
আসলে বাড়ছিল তার একাকিত্ব।
সৈয়দ আলম প্রথম বিপদের আভাস পেলেন একটি সরকারি প্রকল্পের খবর করতে গিয়ে। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ভালো। বরাদ্দও বড়। কিন্তু কাজের দায়িত্ব পেয়েছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার সঙ্গে ফরহাদের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সম্পর্ক রয়েছে।
আলম অনুসন্ধান করলেন। নথি সংগ্রহ করলেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললেন। প্রকল্পের ব্যয়ের সঙ্গে বাস্তব কাজের অসংগতি খুঁজে পেলেন।
প্রতিবেদন প্রকাশের আগে তিনি ফরহাদকে ফোন করলেন।
‘একটা বিষয় জানানো দরকার।’
‘বলুন, আলম ভাই।’
‘আপনার ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ পেয়েছি। নথিপত্রও আছে।’
ফরহাদ কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন।
‘আপনি নিশ্চিত?’
‘নিশ্চিত বলেই আপনাকে জানাচ্ছি।’
‘আমাকে একটু সময় দিন। আমি খোঁজ নিচ্ছি।’
আলম বললেন, ‘সময় নিন। কিন্তু বিষয়টি চাপা দেবেন না।’
‘আপনি কি মনে করেন, আমি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেব?’
আলম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
‘আমি মনে করি, আপনি তা চান না। কিন্তু আপনি কী চান, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আপনার চারপাশে কী ঘটছে।’
ফরহাদ বললেন, ‘আমি দেখছি।’
কথা শেষ হলো।
আলম অপেক্ষা করলেন।
এক দিন। দুই দিন। এক সপ্তাহ।
কোনো উত্তর এল না।
অবশেষে তিনি প্রতিবেদন প্রকাশ করলেন।
পরদিন সকালেই তোলপাড় শুরু হলো।
সরকারি দলের নেতারা বললেন, এটি সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।
একজন উপদেষ্টা বললেন, ‘আলম সাহেব ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে লিখেছেন।’
একজন মুখপাত্র বললেন, ‘তিনি রাষ্ট্রপতির জনপ্রিয়তা নষ্ট করতে চান।’
ফরহাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা তাকে বোঝাল, আলম আসলে নিজের প্রভাব বাড়াতে চাইছেন।
‘স্যার, এত দিন আপনাকে সমর্থন করেছেন। এখন তার প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে আপনার বিরুদ্ধে নেমেছেন।’
‘কী প্রত্যাশা?’
‘পদ। ক্ষমতা। বিশেষ সুবিধা। কে জানে!’
ফরহাদ রেগে গেলেন।
‘আলমকে আমি চিনি।’
এক বন্ধু বলল, ‘আপনি তাকে চেনেন। কিন্তু তিনি আপনাকে কতটা চেনেন, সেটা ভেবে দেখেছেন?’
প্রশ্নটি ফরহাদের মনে গেঁথে গেল।
কয়েক দিন পর আলমকে ডাকা হলো। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে তাদের দেখা হলো বহুদিন পর।
ফরহাদ বললেন, ‘আপনি আমাকে একটু জানাতে পারতেন।’
আলম শান্ত স্বরে বললেন, ‘জানিয়েছিলাম।’
‘প্রতিবেদন প্রকাশের আগে আরও সময় নিতে পারতেন।’
‘আপনাকে খতিয়ে দেখার সময় দিয়েছিলাম।’
‘আপনি কি মনে করেন, আমার বন্ধুরা দুর্নীতিবাজ?’
আলম বললেন, ‘আমি মনে করি, দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত হওয়া উচিত। বন্ধুত্ব তদন্তের বিকল্প হতে পারে না।’
ফরহাদ বিরক্ত হলেন।
‘সবকিছু এত সরল নয়, আলম ভাই।’
‘ঠিক বলেছেন। সবকিছু সরল নয়। তাই তো আপনার সাহায্য চেয়েছিলাম।’
‘আপনি এখন আমার সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছেন।’
আলম কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
‘আমি আপনার বিরুদ্ধে লিখিনি। আমি আপনার সরকারের একটি কাজ নিয়ে লিখেছি।’
‘দুটোর মধ্যে পার্থক্য কোথায়?’
আলমের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
তিনি ধীরে ধীরে বললেন, ‘এই পার্থক্যটাই যদি আপনি ভুলে যান, তাহলে আমার আর কিছু বলার নেই।’
ফরহাদ মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
‘আপাতত আমাদের যোগাযোগ কিছুদিন বন্ধ থাকুক।’
আলম উঠে দাঁড়ালেন।
‘আপনার ইচ্ছা।’
দরজার কাছে গিয়ে একবার ফিরে তাকালেন।
‘একটা কথা বলি, ফরহাদ? আপনার বাবা আপনার জন্য সম্পদ রেখে যেতে পারেননি। কিন্তু একটি জিনিস রেখে গিয়েছিলেন—মানুষের বিশ্বাস। সেটি যেন হারিয়ে না ফেলেন।’
ফরহাদ কোনো উত্তর দিলেন না।
আলম বেরিয়ে গেলেন।
তারপর থেকে আলমের দিনগুলো কঠিন হয়ে উঠল। সরকারি বিজ্ঞাপন কমে গেল। তার পত্রিকার ওপর চাপ বাড়ল। টেলিভিশনের আলোচনায় তাকে আর ডাকা হয় না। পরিচিত মানুষেরা ফোন ধরতে দেরি করেন। কেউ সরাসরি শত্রুতা কিংবা হুমকি না দিলেও চারপাশের দরজাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে গেলো। আলমের স্ত্রী এক রাতে বললেন, ‘তুমি কি একটু থামতে পারো না?’
আলম চুপ করে রইলেন।
‘সব সময় তোমাকেই কেন লড়তে হবে?’
‘কারণ অন্যরা চুপ করে আছে।’
‘তাহলে অন্যদের চুপ থাকার মূল্য কি শুধু তোমাকেই দিতে হবে?’
আলম উত্তর দিতে পারলেন না।
স্ত্রী আবার বললেন, ‘তুমি কি ফরহাদকে বিশ্বাস করো?’
‘করতাম।’
‘এখন?’
আলম জানালার বাইরে তাকালেন।
‘এখনও করতে চাই।’
‘তাহলে?’
‘কিন্তু বিশ্বাস করতে চাওয়া আর বিশ্বাস করার মতো কারণ পাওয়া এক কথা নয়।’
স্ত্রী আর কিছু বললেন না।
সেই রাতে আলমের ঘুম হলো না।
এদিকে জনতা সংঘ আবার সংগঠিত হতে শুরু করেছে। তাদের নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন, ফরহাদ ব্যর্থ। তার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি ভুয়া। তাঁর সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত। দেশের অর্থনীতি বিপর্যস্ত। তাদের কিছু অভিযোগ সত্য। কিছু অতিরঞ্জিত। কিছু পুরোনো মিথ্যার নতুন সংস্করণ। কিন্তু মানুষ এখন আর সব অভিযোগ যাচাই করে না। বিদ্যুতের বিল বেড়েছে। বাজারে দ্রব্যমূল্য বেশি। চাকরির অভাব। সরকারি দপ্তরে হয়রানি। মানুষ প্রশ্ন করছে।
‘এই জন্যই কি আমরা সরকার বদলেছিলাম?’
‘ফরহাদ কি সত্যিই আলাদা?’
‘আগের সরকার তবে কী এমন বেশি খারাপ ছিল?’
আলম জানেন, মানুষ কেন এসব বলছে। মানুষের ক্ষোভকে শুধু অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু তিনি এটাও জানেন, জনতা সংঘের শাসন কেমন ছিল। মানুষ কীভাবে ভোটাধিকার হারিয়েছিল। কীভাবে ভয়ে কথা বলা বন্ধ করেছিল। কীভাবে সংবাদপত্রের কণ্ঠ রোধ করা হয়েছিল। সেই স্মৃতি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে আসছে।
আলমের মনে হয়, মানুষ যেন পুরোনো অত্যাচারের কথা ভুলে গিয়ে নতুন হতাশাকে আঁকড়ে ধরছে।
একদিন তার তরুণ সহকর্মী রাশেদ এসে বলল, ‘স্যার, মানুষ আবার জনতা সংঘের পক্ষে কথা বলছে।’
আলম বললেন, ‘মানুষ সব সময় অতীতকে মনে রাখে না।’
‘তাহলে কি তারা আবার তাদের ফিরিয়ে আনবে?’
‘জানি না।’
‘আপনি কিছু বলছেন না কেন?’
আলম তাকালেন।
‘কী বলব?’
‘আপনি তো একসময় ফরহাদের জন্য লড়েছিলেন। এবারও লড়ুন।’
আলম তিক্ত হেসে বললেন, ‘কার জন্য লড়ব, রাশেদ? ফরহাদের জন্য? নাকি সেই স্বপ্নের জন্য, যার নাম দিয়েছিলাম ফরহাদ?’
রাশেদ চুপ করে গেল।
আলম বললেন, ‘একজন মানুষের ভুল ঢাকতে গিয়ে যদি দেশের ক্ষতি হয়, তবে সেই মানুষকে সমর্থন করা আর দেশকে সমর্থন করা এক কথা নয়।’
‘তাহলে আপনি কি ফরহাদের বিরুদ্ধে?’
‘আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে।’
‘কিন্তু মানুষ তো এই পার্থক্য বোঝে না।’
আলম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
‘সেই জন্যই তো সাংবাদিকতা।’
সেদিন রাতে আলম পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটছিলেন।
একটি ফাইলের মধ্যে ফরহাদের দেশে ফেরার দিনের সংবাদ সম্মেলনের ছবি পেলেন। ছবিতে ফরহাদের মুখে আশাবাদ। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন নেতা। পেছনে মানুষের ভিড়। ছবিটির নিচে আলম নিজের হাতে লিখেছিলেন— ইতিহাস কখনো কখনো মানুষকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়।
তিনি বাক্যটির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
দ্বিতীয় সুযোগ কি মানুষকে বদলে দেয়?
নাকি মানুষ সুযোগ পেয়ে আবার নিজের পুরোনো স্বভাবেই ফিরে যায়?
ফরহাদ কি বদলে গেছেন? নাকি তিনি বরাবরই এমন ছিলেন, শুধু আলম দেখতে পাননি?
বন্ধুবৎসল হওয়া কি দোষ? মানুষকে আপন করে নেওয়া কি অপরাধ?
না, অপরাধ নয়। কিন্তু সবাইকে আপন ভাবতে গিয়ে যোগ্যতা ও সততার বিচার ভুলে যাওয়া কি বিপজ্জনক নয়?
আলম বুঝতে পারলেন, ফরহাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার শত্রুরা নয়। তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সেই বন্ধুবলয়, যাদের কাছে তিনি নিজের বিবেকের চেয়ে বেশি নিরাপদ বোধ করেন। আরও বড় দুর্বলতা হলো, তিনি হয়তো এখনও বিশ্বাস করেন—তাকে ভালোবাসে যারা, তারা তার ক্ষতি করতে পারে না।
আলম জানতেন, ইতিহাসে বহু পতনের শুরু এই বিশ্বাস থেকেই। পরদিন সকালে বিদেশে থাকা এক পুরোনো বন্ধুর ফোন এল।
‘আলম, তোমার জন্য একটা ব্যবস্থা করতে পারি। এখানে চলে এসো। কিছুদিন বিশ্রাম নাও। নতুন করে শুরু করবে।’
আলম চুপ করে শুনলেন।
বন্ধু বললেন, ‘দেশের জন্য তুমি অনেক করেছ। এখন নিজের কথা ভাবো।’
‘দেশ ছেড়ে চলে গেলে কি সব শেষ হয়ে যাবে?’
‘সব তো আর তোমার হাতে নেই।’
‘তা ঠিক।’
‘তাহলে?’
আলম উত্তর দিলেন না।
ফোন রাখার পর তিনি দীর্ঘক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।
দেশ ছেড়ে যাওয়া কি কাপুরুষতা? সব সময় নয়। কখনো বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে সরে যেতে হয়। কখনো দূরে গিয়ে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। আবার থেকে যাওয়াও সব সময় সাহসিকতা নয়। কখনো তা নিছক জেদ। কখনো আত্মবিনাশ।
তাহলে তার নিজের ক্ষেত্রে কোনটি সত্য?
তিনি কি লড়াই চালিয়ে যাবেন? কিন্তু কার বিরুদ্ধে? ফরহাদের বিরুদ্ধে? জনতা সংঘের বিরুদ্ধে? নাকি সেই অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে, যা মানুষকে ক্ষমতায় গেলে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়?
তিনি কি ফরহাদকে আবার বোঝানোর চেষ্টা করবেন?
যে মানুষ তার কথা শুনতে চান না, তাকে বোঝাতে গিয়ে আর কতবার নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দেবেন?
আর যদি চলে যান, তাহলে যাদের জন্য এত দিন লিখেছেন, তাদের কাছে কি তিনি দায়মুক্ত হতে পারবেন?
বিকালে আলম পত্রিকা অফিসে গেলেন।
কয়েকজন কর্মী বসে আছে। টেবিলে পরদিনের পত্রিকার খসড়া। প্রথম পাতায় একটি বড় খবর—সরকারের নতুন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক।
রাশেদ বলল, ‘স্যার, প্রতিবেদনটা ছাপব?’
আলম কাগজটি হাতে নিলেন।
‘নথিপত্র যাচাই হয়েছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘সরকারের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে?’
‘চেষ্টা করেছি। তারা উত্তর দেয়নি।’
আলম কিছুক্ষণ ভাবলেন।
‘যা আছে, সব ছাপবে। কিন্তু কোনো অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য বলে লিখবে না। যেটুকু জানি, সেটুকুই বলব। যেটুকু জানি না, সেটুকু জানি না বলব।’
রাশেদ বলল, ‘চাপ আসবে, স্যার।’
‘আসুক।’
‘পত্রিকা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
আলম ছেলেটির দিকে তাকালেন।
‘পত্রিকা বাঁচিয়ে রাখার জন্য যদি সত্যকে মেরে ফেলি, তাহলে পত্রিকাটি বেঁচে থাকবে কেন?’
কথাটি বলে তিনি নিজের কাছেই থমকে গেলেন।
এ কি তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত?
নাকি নিজের মনকে শক্ত করার চেষ্টা?
তিনি জানেন না।
সন্ধ্যায় অফিস থেকে বেরিয়ে আলম হাঁটতে শুরু করলেন। রাস্তার মোড়ে একটি চায়ের দোকান। কয়েকজন মানুষ রাজনীতি নিয়ে তর্ক করছে।
একজন বলছে, ‘ফরহাদ ভালো মানুষ। ওর আশপাশের লোকগুলো খারাপ।’
আরেকজন বলছে, ‘ভালো মানুষ হলে খারাপ লোকদের সরাতে পারে না কেন?’
তৃতীয়জন হেসে বলল, ‘সবাই একই। সুযোগ পেলে সবাই খায়।’
আলম থেমে গেলেন।
কথাগুলো খুব সাধারণ। কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি দেশের ভবিষ্যৎ।
যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সবাই একই রকম, তখন সৎ মানুষের জন্যও আর কোনো জায়গা থাকে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার আগ্রহ হারিয়ে যায়। আর সেই শূন্যস্থানেই পুরোনো অত্যাচারীরা নতুন মুখোশ পরে ফিরে আসে।
আলম আবার হাঁটতে শুরু করলেন।
হঠাৎ তার মনে হলো, তিনি এত দিন ফরহাদকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হয়তো তার কাজ ফরহাদকে বাঁচানো নয়। তার কাজ সেই সম্ভাবনাটুকুকে বাঁচিয়ে রাখা, যার জন্য মানুষ একদিন রাস্তায় নেমেছিল।
এই উপলব্ধি তাকে স্বস্তি দিল না। বরং আরও একা করে দিল।
কারণ একজন মানুষকে ভালোবাসা সহজ। একটি আদর্শের পাশে দাঁড়ানোও সহজ, যতক্ষণ সেই আদর্শের প্রতিনিধি আপনার বন্ধু থাকে। কিন্তু বন্ধুর বিরুদ্ধে গিয়েও আদর্শের পাশে দাঁড়ানো?
সেটিই সবচেয়ে কঠিন।
রাতে বাড়ি ফিরে আলম লেখার টেবিলে বসলেন।
সামনে সাদা কাগজ।
তিনি লিখলেন— ফরহাদ জাহিদ ব্যর্থ হলে শুধু একজন রাষ্ট্রপতি ব্যর্থ হবেন না। ব্যর্থ হবে মানুষের দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়ার স্বপ্নও। কিছুক্ষণ পর বাক্যটি কেটে দিলেন। এভাবে লিখলে ফরহাদের ব্যর্থতার দায়ও যেন জনগণের ঘাড়ে চাপানো হয়। অথচ ক্ষমতার দায় ক্ষমতাবানেরই।
তিনি আবার লিখলেন— কোনো শাসকের জনপ্রিয়তা তার সততার প্রমাণ নয়। আবার তার অজনপ্রিয়তা তার বিরোধীদের সততার প্রমাণও নয়। একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে, ক্ষমতাবান কতটা সমালোচনা সহ্য করতে পারেন এবং বিরোধীরা কতটা সত্যের প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন তার ওপর।
এবার তিনি থামলেন।
বাইরে বৃষ্টি পড়ছে।
ফোনের পর্দায় ফরহাদের নাম ভেসে উঠল।
আলম তাকিয়ে রইলেন।
ফোনটি বেজে গেল। তিনি ধরলেন না।
কিছুক্ষণ পর একটি বার্তা এল।
আলম ভাই, আপনার সঙ্গে কথা বলা দরকার। সময় হলে ফোন করবেন।
আলম বার্তাটি পড়লেন। কোনো উত্তর দিলেন না।
তিনি জানেন না, ফরহাদ সত্যিই অনুতপ্ত কিনা। হয়তো তিনি একাকিত্ব অনুভব করছেন। হয়তো বন্ধুবলয়ের কারও বিশ্বাসঘাতকতা তাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। আবার হয়তো রাজনৈতিক সংকট সামলাতে পুরোনো বিশ্বস্ত মানুষটিকে ফিরিয়ে আনতে চাইছেন।
কোনটি সত্য, তা জানার উপায় নেই।
আলম ফোনটি নামিয়ে রাখলেন।
তিনি কি ফোন করবেন?
হয়তো করবেন।
কিন্তু এবার তিনি বন্ধুর মতো নয়, নাগরিকের মতো কথা বলবেন। কোনো ব্যক্তির জনপ্রিয়তা রক্ষার জন্য নয়, মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য।
আর যদি ফরহাদ সেই কথা শুনতে না চান?
তাহলে?
আলম জানেন না।
তিনি শুধু জানেন, নীরব থাকলে তার ভেতরের মানুষটি ধীরে ধীরে মরে যাবে। আর দেশ ছেড়ে চলে গেলে হয়তো বেঁচে থাকবেন, কিন্তু কিছু প্রশ্ন তাকে ছাড়বে না।
তিনি আবার কলম হাতে নিলেন।
বৃষ্টির শব্দের মধ্যে লিখতে শুরু করলেন।
এবার কোনো ব্যক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। কোনো দলের জন্য নয়। কোনো বন্ধুর অনুগ্রহ পাওয়ার আশায়ও নয়।
তিনি লিখতে লাগলেন মানুষের কথা। ভোটের কথা। জবাবদিহির কথা। ক্ষমতার অন্ধত্বের কথা। আর সেই ভয়ংকর মুহূর্তের কথা, যখন মানুষ পুরোনো অত্যাচারীকে ভুলে গিয়ে নতুন হতাশার মধ্যে তার প্রত্যাবর্তনের পথ তৈরি করে।
লেখার শেষ বাক্যটি লিখে আলম কলম নামিয়ে রাখলেন।
স্বৈরাচার কেবল ক্ষমতার জোরে ফিরে আসে না। কখনো ফিরে আসে মানুষের হতাশায়, কখনো সৎ মানুষের নীরবতায়, আর কখনো ফিরে আসে সেই বন্ধুর হাত ধরে—যাকে একদিন আমরা নিজের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করেছিলাম।
জানালার বাইরে তখনও বৃষ্টি।
আলম জানেন না, তার লেখা আগামীকাল ছাপা হবে কি না। পাঠক পড়বে কি না। ফরহাদ বুঝবেন কি না। জনতা সংঘ থামবে কি না।
তিনি এটাও জানেন না, এই লড়াই তাঁকে কোথায় নিয়ে যাবে।
তবু তিনি লিখলেন।
কারণ কিছু লড়াই জেতার নিশ্চয়তা নিয়ে শুরু হয় না।
কিছু লড়াই শুরু হয় শুধু এই কারণে যে, হেরে যাওয়ার আগেই মানুষ নিজের কাছে হারতে চায় না।
আলম বাতি নিভিয়ে দিলেন।
অন্ধকারে বসে তার মনে হলো, তিনি যেন আবার সেই পুরোনো দ্বিধার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
একদিকে বন্ধু। অন্যদিকে সত্য।
একদিকে দেশ ছেড়ে বেঁচে থাকা। অন্যদিকে দেশে থেকে নিজের বিবেককে বাঁচিয়ে রাখা।
কোন পথটি সঠিক, তিনি জানেন না।
শুধু জানেন, আগামীকাল সকালেও তাঁকে একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
আর ইতিহাস কারও সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করে না।
ইতিহাস অপেক্ষা করে না। সে শুধু দেখে—সংকটের মুহূর্তে কে নিজের বিবেকের পাশে দাঁড়াল, আর কে বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে নীরব হয়ে গেল।
লেখক: সাংবাদিক ও বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেসসচিব
