সাংবাদিক বাবলুকে অপহরণ, জিম্মি করে টাকা লুটের অভিযোগ
Advertisement
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪০ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সামাজিক মাধ্যমে ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে রাজধানীর পোস্তগোলা থেকে এক সাংবাদিককে ডেকে নিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে গভীর জঙ্গলে আটকে রাখা, তার ব্যাংক ও মোবাইল ফোনের আর্থিক সেবা থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের নাম কামরুজ্জামান বাবলু। তিনি দৈনিক এদিন পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই ছাত্র নিউ নেশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে কাজ করেছেন।
মঙ্গলবার ঢাকার সিএমএম আদালতে অপহরণের মামলা করেছেন তিনি।
এদিকে, সাংবাদিক বাবলুকে অপহরণ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ (ডিআরইউ) বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছন নেতৃবৃন্দ।
মামলার অভিযোগ ও ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে ‘মামুন শেখ’ নামে একটি আইডির সঙ্গে কামরুজ্জামান বাবলুর পরিচয় হয়। প্রথমে সাধারণ কথাবার্তা হলেও একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের উৎস হিসেবে পরিচয় দেন। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর তিনি বিটকয়েনসহ বিভিন্ন বিষয়ে ‘চাঞ্চল্যকর তথ্য’ দেওয়ার কথা বলেন।
ভুক্তভোগী বলেন, গত ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় আসার কথা জানিয়ে মামুন শেখ সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলুকে দেখা করার প্রস্তাব দেন। সাংবাদিক তাকে অফিসে আসতে বললেও মামুন জানান, তিনি জুরাইনে আত্মীয়ের বাসায় রয়েছেন। পরে জুরাইনে এসে দেখা করার অনুরোধ করলে কামরুজ্জামান বাবলু সেখানে যান।
অভিযোগ অনুযায়ী, দুপুর আড়াইটার দিকে পোস্তগোলা ব্রিজসংলগ্ন আলম মার্কেটের সামনে তাদের দেখা হয়। এ সময় মামুন তার বন্ধু ‘অনিক’ নামে একজনের সঙ্গে সাংবাদিককে পরিচয় করিয়ে দেন। পরে নিরিবিলি পরিবেশে কথা বলার কথা বলে তাকে একটি মাইক্রোবাসের কাছে নেওয়া হয়। প্রথমে গাড়িতে উঠতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও তাদের পীড়াপীড়িতে তিনি গাড়িতে ওঠেন।
কামরুজ্জামানের ভাষ্য, গাড়ির ভেতরে আগে থেকেই আরও তিনজন অবস্থান করছিলেন। তিনি গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রের মুখে তাকে চুপ থাকতে বলা হয়। পরে তার হাত ও চোখ বেঁধে ফেলা হয়। তাকে হত্যার হুমকি দিয়ে গাড়িটি নিয়ে অজ্ঞাত স্থানের উদ্দেশে রওনা হয় অপহরণকারীরা।
কামরুজ্জামানের অভিযোগ, প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা গাড়িতে রাখার পর তাকে একটি গভীর জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন মাগরিবের আজান হচ্ছিল। চারপাশে অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা পাহারা দিচ্ছিলেন। সেখানে তাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও গালিগালাজ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, তাকে বলা হয় তিনি সরকারের বিরুদ্ধে এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফেসবুকে লেখালেখি করেন। একই সঙ্গে তার কাছে বিভিন্ন তথ্য চাওয়ার বিষয় নিয়েও অপহরণকারীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তাকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার কথা উল্লেখ করে ভয় দেখানো হয় এবং হত্যার পর তার লাশের মাংস মাছকে খাওয়ানোর হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলু।
এ সময় তার মোবাইল ফোন, ব্যাংকের কার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র নিয়ে নেয় অপহরণকারীরা। তার সঙ্গে বাইরের কারও যোগাযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, রাত ৯টার দিকে তার স্ত্রী ফোন করলে অপহরণকারীরা তাকে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে বাধ্য করে। তবে কথাবার্তার মধ্যেই তার স্ত্রী পরিস্থিতি আঁচ করতে পারেন। পরে তিনি কামরুজ্জামানের বড় ভাইদের বিষয়টি জানান। স্বজনরা পল্টন থানায় গিয়ে বিষয়টি জানালে থানার এসআই তুষার দেবনাথ সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন।
কামরুজ্জামানের ভাষ্য, রাত সাড়ে ৯টা থেকে ১০টার দিকে পুলিশ তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও অপহরণকারীরা তাকে ফোন ধরতে দেয়নি। পরে রাত আড়াইটার দিকে তাদের উপস্থিতিতেই তিনি স্ত্রীর সঙ্গে এবং পুলিশের ওই কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন।
এ ঘটনায় নিজের ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, বিকাশের লেনদেনের তথ্য, টাকা উত্তোলনের তথ্য, ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর এবং মোবাইল ফোনের আইএমইআই নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য আদালতে দাখিল করেছেন বলে জানিয়েছেন কামরুজ্জামান।
ঘটনার বিষয়ে সাংবাদিক কামরুজ্জামান বাবলু বলেন, ‘ফেসবুকে পরিচয়ের পর সাংবাদিক হিসেবে আমাকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেওয়ার কথা বলে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। পরে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে চোখ ও হাত বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আমাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় এবং আমার ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মাধ্যমে টাকা নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত সুযোগ পেয়ে আমি পালিয়ে জীবন রক্ষা করি।’
পল্টন থানার এসআই তুষার দেবনাথ বলেন, অপহরণ ও জিম্মি করে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করতে থানায় এসেছিলেন। তাকে নানা পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
এক বার্তায় ডিআরইউ কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষে সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, একজন সাংবাদিককে পরিকল্পিতভাবে ফাঁদে ফেলে অপহরণ, অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া এবং তার অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর ও উদ্বেগজনক। এ ধরনের ঘটনা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের হুমকি। এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতার এবং তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
পৃথক এক বিবৃতিতে রিলিজিয়াস রিপোর্টার্স ফোরামের (আরআরএফ) সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ ভূঁইয়া ও সাধারণ সম্পাদক খালিদ সাইফুল্লাহ প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ব্যাংকিং লেনদেন, এটিএম বুথের সিসিটিভি ফুটেজ, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, সংশ্লিষ্ট মোবাইল নম্বর ও আইএমইআই (ওগঊও) নম্বর আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে ট্র্যাকিং করে দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আহ্বান জানান।
