মুনীর চৌধুরীর পোস্ট
দুদকের জালে সার্ভেয়ার, রুই-কাতলা ধরা পড়বে এরপর?
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:২৩ পিএম
ঘুস নেওয়ার সময় লালবাগ ভুমি অফিসের সার্ভেয়ার আসাদুল ইসলামকে হাতেনাতে আটক করেছে দুদক। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী সম্প্রতি এক সার্ভেয়ারের ঘুসসহ গ্রেফতার নিয়ে কথা বলেছেন।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে এ ঘটনা নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেন তিনি।
মুনীর চৌধুরী লিখেছেন, লাখ টাকা ঘুস নেওয়ার সময় রাজধানীর লালবাগ সার্কেলের সার্ভেয়ারকে গ্রেফতার করেছে দুদক। যদিও অভিযোগে ঘুসের দাবি ছিলো ৮০ লাখ টাকা। দুদক আইনি প্রক্রিয়ায় অভিযোগের সত্যতা পেয়েই তাকে আটক করেছে। জানি, অনেক শক্তিশালী তদবীর হবে, দুদকের উপর ঝড় বয়ে যাবে, দুদক যেনো এ ঝড়ে নুয়ে না পড়ে। দীর্ঘ চাকরি জীবনের বেদনাময় অভিজ্ঞতায় দেখেছি, দুদকের জাল থেকে রক্ষা পেয়েছে রাঘব বোয়ালরা, ধরা পড়েছে কেবল চুনোপুটিরা। এমন ভারসাম্যহীনতা দূর করতে আমাদের সময়ে কাস্টমস কর্মকর্তা, ডিসি-এডিসি, প্রধান প্রকৌশলী, পরিচালক, বিসিএস ক্যাডার অফিসার এমনকি সামরিক কর্মকর্তাও আটক হয়েছিল।
প্রশাসনের তরুণ কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, এসিল্যান্ড পদে দায়িত্ব পেয়েই তড়িৎ চুম্বকীয় আবেশের মত এক শ্রেণীর তরুণ কর্মকর্তা দুর্নীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়। এ সেক্টরে দুর্নীতিলব্ধ অর্থের একটি Circular Life-cycle আছে, যার একটি অংশ নিজের ভোগে ব্যয় ও গোপনে সঞ্চিতকরন, অপর অংশ দুর্নীতিগ্রস্থ ঊর্ধ্বতনের জন্য কমিশন প্রদান এবং বিভিন্ন পর্যায়ে উপঢৌকন ও আপ্যায়নের আয়োজন, এ এক অখণ্ড চেইন ফাংশন।
দুর্নীতি বন্ধে বোরকা পড়ে ভূমি অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন নেই মন্তব্য করে সাবেক এ দুদক মহাপরিচালক বলেন, সচিব বা ঊর্ধ্বতন অনেকেই এ চেইন ভাঙতে চায়নি কিংবা ভাঙতে পারেনি। ভূমি অফিসের দুর্নীতি বন্ধের জন্য বোরকা পড়ে গোপনে গ্রাহক সেজে ডিসিকে তার অধীনস্থ অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শক্ত শাসন দণ্ড।
তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মুনীর চৌধুরী লেখেন, তদানীন্তন ভূমিমন্ত্রী আমাকে অনুরোধ করেছিলেন ভূমি মন্ত্রণালয়ে যোগদান করে শুদ্ধি অভিযান চালানোর। কিন্তু সাড়া দেইনি কারণ এক মোবাইল কোর্ট অভিযানে তার প্রতিষ্ঠানকে ১৮ লাখ টাকা জরিমানা করায় তার প্রতি শ্রদ্ধা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
তিনি বলেন, যে ভূমি মালিকরা তাদের ভূমিকে জীবন জীবিকার অবলম্বন, আবাসন নির্মাণ, বিনিয়োগ বা কর্মসংস্থানের মাধ্যম হিসেবে সদ্ব্যবহার করতে চান, তাদের রক্ত শোষণ করে গড়ে উঠে অবৈধ প্লট –ফ্ল্যাট- ব্যাংক ব্যালেন্স। ঘুসের যাঁতাকলে পড়ে মানুষের অন্তর্ভেদী মর্মযাতনা কি অনুভব করেছেন কোনো ভূমি সচিব বা ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলরা? দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য,কোনো কোনো আমলার জেলা বা মফস্বল ভ্রমণের আপ্যায়ন-উপঢৌকনের ব্যয় মেটাতে বাধ্য করা হয়েছে এসিল্যান্ড অফিসকে। ফলে অনেক কর্মকর্তা তাদের অন্তর্নিহিত সততার স্ফূরণ ঘটাতে পারেনি। এক শ্রেণী চাকরির ভয়ে বাধ্য হয়েছে, আরেক শ্রেণী প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে অর্থ উপার্জন করেছে। এমন অসংখ্য ঘটনার সাক্ষী আমরা। এসিল্যান্ড পদে আমাদের চাকরি জীবনে এমন বহু অন্যায় আবদার সাহস নিয়ে উপেক্ষা করেছি।
মুনীর চৌধুরী বলেন, এসিল্যান্ডদের আহ্বান জানাই, এ জীবন ক্ষণভঙ্গুর। একদিন সৃষ্টির অসীম শূন্যতায় ধুলা হয়ে মিশে যাবে। কিন্তু তোমার পাপের বোঝা নিয়ে (অসৎ হলে) কিংবা মানুষের অশ্রুঝরা দোয়া নিয়ে (সৎ হলে) মহান আল্লাহর আদালতে উপস্থিত হতে হবে। এসিল্যান্ডদের প্রশিক্ষণে শেখানো হয় আইন ও বিধি-বিধান, কিন্তু জীবনের মানবিক মূল্য, আদর্শিক মূল্য, আধ্যাত্মিক মূল্য সম্পর্কে অনুপ্রেরণার বিষয়টি থাকে উপেক্ষিত।
পোস্টের শেষ দিকে তিনি বলেন, দুদকের চেয়ারম্যানকে বিনীত অনুরোধ জানাই, দুর্নীতির কঠিন শৃঙ্খলটি ছিন্ন করুন। আপনি একজন বিচারপতি, বিচারিক নীতি আপনার আয়ত্তে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর ঐশী নির্দেশনা অনুযায়ী সমতা, ন্যায্যতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করুন। প্রত্যেক দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিতরা তাদের দায়িত্ব পালন সম্পর্কে আল্লাহর কাছে নিশ্চিতভাবে জিজ্ঞাসিত হবেন। কোনো বিশেষ ক্যাডার বা শক্তিমান কাউকে রক্ষার জন্য দুদক সৃষ্টি হয়নি। সুতরাং এ অভিযানের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে লালবাগের গ্রেফতার সার্ভেয়ারের পরবর্তী উচ্চতর ধাপে জড়িত রুই-কাতলাদের দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ায় আটক করুন, আমরা অপেক্ষায় রইলাম।


