ঢাকাই সিনেমায় ব্যবহৃত জনপ্রিয় শিশুতোষ গান
Advertisement
‘ছুটির ঘণ্টা’ ছবির একটি দৃশ্য।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশে শিশুতোষ সিনেমার সংখ্যা আঙুলে গোনার মতো। সেসবের কোনো কোনোটিতে শিশুদের জন্য কোনো গানই সংযোজন করা হয়নি। আবার শিশুতোষ নয়, এমন সিনেমায়ও শিশুদের উপযোগী গান বেশ শ্রোতাপ্রিয় হয়েছে। সিনেমায় ব্যবহৃত শিশুতোষ জনপ্রিয় গানগুলোর অধিকাংশই পাওয়া গেছে ৮০ ও ৯০ দশকজুড়ে। বাংলাদেশ বেতারে প্রচারের সুবাদে গানগুলো বিশেষভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল।
সত্তর দশকের শেষদিকে ১৯৭৮ সালে পরিচালক আজিজুর রহমান নির্মাণ করেছিলেন গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবননির্ভর সিনেমা ‘অশিক্ষিত’। রাজ্জাক-অঞ্জনা জুটি অভিনীত এ সিনেমায় মাস্টার সুমনের কাছে নাম দস্তখত শিখতে এসেছিলেন গ্রামের চৌকিদার রাজ্জাক। তখন তার ঠোঁটে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কথায় ও সত্য সাহার সুরে খন্দকার ফারুক আহমেদ গেয়েছেন-‘মাস্টার সাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই’। গানটি সেসময় দারুণভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল। একই বছর মুক্তি পেয়েছিল সুভাষ দত্ত পরিচালিত আরেকটি চমৎকার শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘ডুমুরের ফুল’। আশরাফ সিদ্দিকীর ‘গলির ধারের ছেলেটি’ গল্প অবলম্বনে নির্মিত এ সিনেমার সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন আজাদ রহমান, আর গান লিছেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। এ সিনেমার উল্লেখযোগ্য গান হচ্ছে- ‘এক শিয়ালে রাঁধে বাড়ে দুই শিয়ালে খায়’, ‘আপায় কইছে আমারে বাল্যশিক্ষা কিন্না দিছে’, ‘করো মনে মনে ভক্তি মায়ের থাকতে হাতে দিন’।
১৯৭৯ সালে খান আতাউর রহমান নির্মাণ করেছিলেন ফারুক-কবরী জুটির ‘দিন যায় কথা থাকে’ সিনেমাটি। নিজের কথা ও সুরে কন্যা শিশুশিল্পী রুমানা খানকে তিনি গাওয়ালেন ‘মায়ের মতো আপন কেহ নাই রে’। এ গানটিও বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল।
আশির দশকে এসে সিনেমা থেকে বেশকিছু শ্রোতাপ্রিয় গান পেয়েছেন দর্শক-শ্রোতারা। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, ১৯৮০ সালে আজিজুর রহমান পরিচালিত সত্য ঘটনা অবলম্বনে রাজ্জাক-শাবানা-সুজাতা অভিনীত ‘ছুটির ঘণ্টা’। এ সিনেমায় সত্য সাহার সুরে সাবিনা ইয়াসমিন ও তার সহশিল্পীরা গেয়েছেন চমৎকার দুটি শিশুতোষ গান-‘একদিন ছুটি হবে অনেক দূরে যাব’ এবং ‘আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী সাথী মোদের ফুলপরী’। দুটি গানই লিখেছেন মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান। একই বছর মুক্তি পেয়েছে খান আতাউর রহমান পরিচালিত দুর্দান্ত শিশুতোষ সিনেমা ‘ডানপিটে ছেলে’। মাস্টার শাকিলের ঠোঁটে এ সিনেমায় জনপ্রিয় হয়েছে খান আতাউর রহমান রচিত ও সুরারোপিত একটি দেশাত্মবোধক গান ‘হায়রে আমার মন মাতানো দেশ হায়রে আমার সোনা ফলা মাটি’। ১৯৮০ সালেই পরিচালক বাদল রহমান নির্মাণ করেন নিখাদ শিশুতোষ সিনেমা ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’। জার্মান লেখক এরিখ কাস্টনার-এর কিশোর গোয়েন্দা উপন্যাস ‘এমিল অ্যান্ড দ্য ডিটেকটিভ্স’ অবলম্বনে নির্মিত এ সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসাবে অভিনয় করেছিলেন মাস্টার পার্থ, শিপলু, টিপটিপ প্রমুখ। তাদের সম্মিলিত দৃশ্যায়নে জনপ্রিয় হয়েছে আলম খান সুরারোপিত ও বাদল রহমান রচিত চমৎকার দুটি গান-‘আমরা যাব অভিযানে সঙ্গে যাবে কে’ এবং ‘চোর চোর চোর ধরব আমরা মিলে সবাই’। এ সিনেমায় আরও অভিনয় করেছিলেন-গোলাম মুস্তাফা, সারা জাকের, এটিএম শামসুজ্জামান, শর্মিলী আহমেদ প্রমুখ।
১৯৮১ সালে মুক্তি পায় ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’ সিনেমাটি। বুলবুল আহমেদ-ববিতা জুটি অভিনীত আমজাদ হোসেন পরিচালিত সিনেমাটি বাণিজ্যিক ঘরানার হলেও এতে ব্যবহৃত একটি গান শিশুতোষ হিসাবে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে। আলাউদ্দিন আলীর সুর ও সংগীতে আমজাদ হোসেনের লেখা ‘বাবা বলে গেল আর কোনোদিন গান কোরো না’ গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন শামীমা ইয়াসমিন দীবা। সিবি জামান পরিচালিত শিশুতোষ ঘরানার সিনেমা ‘পুরস্কার’ মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮৩ সালে। এ সিনেমার গানগুলো লিখেছেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। সুরকার ও সংগীত পরিচালক ছিলেন সত্য সাহা। সিনেমার দুটি জনপ্রিয় গান ‘হারজিত চিরদিন থাকবেই তবুও এগিয়ে যেতে হবে’ এবং ‘আজ কোনো কাজ নেই আজ আমাদের ছুটি’। দুটি গানই সংযোজিত হয়েছে সিনেমার পার্শ্ব অভিনেতা শিশুশিল্প মাস্টার শাকিলকে কেন্দ্র করে। গান দুটি গেয়েছেন-আবিদা সুলতানা, খন্দকার ফারুক আহমেদ ও সহশিল্পীরা। এ সিনেমায় আরও অভিনয় করেছেন-বুলবুল আহমেদ, জয়শ্রী কবীর, এটিএম শামসুজ্জামান, সাইফুদ্দিন প্রমুখ।
পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম ১৯৯৬ সালে শিশুতোষ সিনেমা ‘দীপু নম্বর টু’ নির্মাণ করেছিলেন। মুহাম্মদ জাফর ইকবালের কিশোর উপন্যাস অবলম্বনে অনুদানের আওতায় নির্মিত সিনেমাটির কেন্দ্রে ছিলেন দীপু নামের এক কিশোরকে কেন্দ্র করে। সিনেমার সংগীত পরিচালক সত্য সাহা হলেও এতে কোনো গান ব্যবহৃত হয়নি। এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন-বুলবুল আহমেদ, ববিতা, আবুল খায়ের, গোলাম মুস্তাফা প্রমুখ। একইভাবে এ পরিচালক নির্মাণ করেছিলেন ‘আমার বন্ধু রাশেদ’। ২০১১ সালে নির্মিত এ সিনেমায়ও কোনো গান ব্যবহার করেননি মোরশেদুল ইসলাম। এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন- রাইসুল ইসলাম আসাদ, ওয়াহিদা মল্লিক জলি, পীযুষ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। ২০২৩ সালে ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে নির্মিত হয় ‘অ্যাডভেঞ্চার অব সুন্দরবন’ সিনেমাটি। মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ‘রাতুলের রাত রাতুলের দিন’ অবলম্বনে নির্মিত শিশুতোষ সিনেমাটির শ্রেষ্ঠাংশে ছিলেন সিয়াম আহমেদ, পরীমণি প্রমুখ। এ সিনেমায় ব্যবহৃত শফি মন্ডলের গাওয়া ‘সারেং ছাড়া জাহাজ চলে কার ইশারায় কিসের বলে’ গানটি দারুণ জনপ্রিয় হয়।

