চিলমারীতে বাঁধ কেটে বালুর ব্যবসা
বড় প্রকল্পের তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন
Advertisement
চিলমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন ঠেকাতে নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ কেটে অবৈধ বালুর ব্যবসায়ের রাস্তা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের কালিরকুড়া টি-বাঁধ, জকরিটারী ও সরকারপাড়া এলাকাসমূহে অন্তত ৯টি জায়গায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রাস্তা কেটে নদের তীর পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। এসব রাস্তা টেকসই করতে নদে ডাম্পিংকৃত সিসি ব্লক উত্তোলন করে বসানো হয়েছে। এতে ঝুঁকির মুখে পড়েছে সরকারের শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ব্রহ্মপুত্র নদের ডানতীর রক্ষা প্রকল্প।
নতুন করে ভাঙন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ। প্রকল্পের তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, ব্রহ্মপুত্র নদের কড়াল গ্রাস থেকে চিলমারীকে রক্ষার জন্য ৪৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ডানতীর রক্ষা প্রকল্পের মাধ্যমে নদের ডানতীর ব্লক ডাম্পিং ও পিচিং এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ রাস্তাটি নির্মাণ করা হয়।
প্রকল্পের আওতায় উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের ফকিরেরহাট এলাকা থেকে রমনা ইউনিয়নের জোড়গাছহাট বাজারের ভাটি পর্যন্ত এলাকার কাজ কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করা হয়। ওই প্রকল্পে কয়েক দফায় ভাঙন দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে তা মেরামত করা হয়। পরে ওই এলাকাসমূহে প্রভাবশালীরা অবৈধ ড্রেজারের মাধ্যমে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছিল। বালু ব্যবসার জন্য অন্তত ৯টি স্থানে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ কেটে নদের তীর পর্যন্ত বালুবাহী ড্রাম্প ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহণ চলাচলের জন্য ডাম্পিংকৃত ব্লক তুলে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। ওইসব বালুবাহী ভারী যানবাহন চলায় রাস্তাটিতে অসংখ্য গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ওই রাস্তাটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এত বড় একটি প্রকল্পের তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
সরেজমিন উপজেলার কাঁচকোলবাজার এলাকা থেকে ফকিরের হাট পর্যন্ত ডানতীর রক্ষা বাঁধ ঘুরে দেখা যায়, ওই এলাকায় অন্তত ৯টি স্থানে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ কেটে বালুবাহী ড্রাম্প ট্রাকসহ বিভিন্ন পরিবহণ চলাচলের জন্য নদে ডাম্পিংকৃত ব্লক তুলে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। একইভাবে কালিরকুড়া টি-বাঁধ থেকে ফকিরেরহাট বাঁধের মোড় পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার অংশেই ৭টি স্থানে বাঁধ কেটে নদী পর্যন্ত সংযোগ রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। এসব রাস্তা টেকসই করতে ব্যবহার করা হয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডানতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের পিচিং ব্লক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এসব পথ দিয়ে ভেজা বালুভর্তি ড্রাম্প ট্রাক চলাচল করায় বাঁধের বিভিন্ন অংশ নিচু হয়ে ইতোমধ্যে অন্তত ৩৩টি স্থানে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। স্থানীয়রা জানান, বিগত সরকারের সময় কাঁচকোল থেকে ফকিরেরহাট পর্যন্ত মাত্র দুটি বালু উত্তোলনের পয়েন্ট সক্রিয় ছিল। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের কিছু নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অবৈধ বালু ব্যবসাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। গত দুই বছরে বাঁধ কেটে ও সংরক্ষণকৃত ব্লক অপসারণ করে অন্তত ১৩টি নতুন বালু উত্তোলন পয়েন্ট চালু করে তারা।
স্থানীয় জনতার আন্দোলনের মুখে বর্তমানে অবৈধ বালুর পয়েন্টগুলোর কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এসব পয়েন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধের দাবি জানান তারা। রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের ময়নার খামার এলাকার আননাত মিয়া বলেন, সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বাঁধ নির্মাণ করেছে। কিন্তু সেই বাঁধ কেটে বালু পরিবহণের জন্য রাস্তা করা হয়েছে। এতে বাঁধের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে নদীর স্রোত ও ভাঙন বৃদ্ধি পেলে নদীপাড়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েক বছর ধরে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। এর প্রভাবে কাঁচকোল থেকে ফকিরেরহাট পর্যন্ত ডানতীর রক্ষা বাঁধে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে অন্তত সাতটি স্থানে ভাঙন দেখা দেয়।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাহমুদুল হাসান বলেন, বাঁধ রাস্তা কেটে বালু পরিবহণের জন্য নির্মিত অবৈধ সড়কগুলোর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এসব সড়ক অপসারণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আশা করছি। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিবুল হাসান বলেন, বাঁধ কেটে নির্মিত অবৈধ সড়কগুলো অপসারণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
