নিরাপদ সড়ক দিবস আজ
বাবার স্বপ্ন পূরণে পুলিশ কর্তা হতে চায় আশামণি
অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়েকে পড়াচ্ছেন মা
Advertisement
হোসেন চিশতী সিপলু, সিদ্ধিরগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ)
প্রকাশ: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
শিরিন বেগম-আশামণি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
তিন সদস্যের ছোট্ট পরিবারে আনন্দের কমতি ছিল না। একটি দুর্ঘটনা সেই আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। মাত্র চার বছর বয়সেই বাবাকে হারিয়েছে আশামণি। বাবা স্বপ্ন দেখতেন মেয়েকে বড় পুলিশ কর্মকর্তা বানাবেন। স্বপ্ন পূরণের আগেই পরপারে চলে যেতে হয়েছে তাকে। ২০১৫ সালের ৩০ জানুয়ারি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মারা যান আয়নাল হক। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে থমকে যায় পরিবার। অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসারের হাল ধরেন মা। টানাটুনির সংসারেও পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছেন আশামণি। বাবার সঙ্গে কাটানো আনন্দের মুহূর্তগুলো এখন তার কেবল স্মৃতি। বাবার সেই আদর, বাবার স্বপ্ন বুকে আগলে রেখেছে আশামণি। ‘তোমাকে পুলিশ অফিসার বানাব মা’-বাবার সেই কণ্ঠ আজও স্মৃতিতে বাজে।
বাবা নেই ১২ বছর। কিন্তু তার সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারেনি আশামণি। তার বয়স এখন ১৫ বছর ১০ মাস। এই কিশোরীর এখন একটাই স্বপ্ন-পড়াশোনা করে পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার। বাবার সেই স্বপ্ন পূরণ করতে অভাবের সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন, পরিশ্রম করছেন। কখনো খাবারের অভাব, কখনো পড়াশোনার খরচ জোগানোর দুশ্চিন্তা-সবকিছুর মধ্যেও হার মানতে চায় না আশামণি।
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের নাসিক ২ নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুল আলী পুল এলাকার বাসিন্দা আয়নাল হক পেশায় ছিলেন রিকশাচালক। প্রতিদিনের মতো ২০১৫ সালের ৩০ জানুয়ারিও ভাড়ায়চালিত রিকশা নিয়ে বের হয়েছিলেন তিনি। দিনভর রিকশা চালিয়ে রাত ১০টার দিকে দুই যাত্রী নিয়ে ঢাকার শনির আখড়া থেকে মৌচাক এলাকার দিকে যাচ্ছিলেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সাদ্দাম মার্কেট এলাকায় পৌঁছলে একটি দূরপাল্লার নাইট কোচ রিকশাটিকে ধাক্কা দেয়। এতে সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন আয়নাল হক। আহত হন দুই যাত্রীও। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিন দিন পর তার মৃত্যু হয়। স্বামীকে হারিয়ে স্ত্রী শিরিন বেগমের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।
ঋণগ্রস্ত থাকায় শেষ পর্যন্ত শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তিও বিক্রি করে দেন শ্বশুর। উপায় না পেয়ে বাড়ির পাশের একটি ভাড়া বাসায় আশ্রয় নেন মা-মেয়ে। এখন সিদ্ধিরগঞ্জের আব্দুল আলী পুল এলাকায় থাকেন তারা। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন শিরিন। সেই আয়ে ঘরভাড়া, খাবার এবং মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পশ্চিমপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ছে আশামণি। বাবার স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ে আশামণি। ‘বাবা আমাকে বলতেন, তোমাকে পুলিশ অফিসার বানাব মা। বাবা আমাকে দোকানে নিয়ে গিয়ে চকলেট, চিপস, বিস্কুট কিনে দিতেন। সেই দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো আমাদের এত কষ্ট করতে হতো না।’ কান্নার ফাঁকে ফাঁকে কথাগুলো বলছিলেন আশামণি।
মা শিরিন বেগম বলেন, বাবার কথা মনে পড়লে আশামণি একা একা কাঁদে। বাবার ছবি নিয়ে শুয়ে থাকে। সেই ছোট্ট বয়সে বাবাকে হারানোর কষ্ট সে আজও ভুলতে পারেনি, ভুলতে পারছে না।
