দেড় টাকা পুঁজি দিয়ে শুরু
ফকিরহাটের কাঠের কলম যাচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকা
Advertisement
আবুল আহসান টিটু, ফকিরহাট (বাগেরহাট)
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বাগেরহাটের ফকিরহাটে কাঠের কলম তৈরি করছেন অরুন পাল -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মাত্র দেড় টাকা পুঁজি আর একটি দা-এই সামান্য সম্বল দিয়েই প্রায় তিন দশক আগে যাত্রা শুরু হয়েছিল ফকিরহাট উপজেলার ধনপোতা গ্রামের এক পরিবারের। সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগ আজ রূপ নিয়েছে ‘মিথুন কুটির শিল্প’-এ, যা কাঠের কলম উৎপাদনের মাধ্যমে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশেও সম্ভাবনার জানান দিচ্ছে। ৩০ বছর আগে হাতের শৈল্পিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে শুরু করা কাঠের কলম এখন প্রযুক্তি ও শিল্পীর রুচিতে ইউরোপ-আমেরিকায় চাহিদা তৈরি করেছে। সরু ও মসৃণ এ কলম দিয়ে লেখাও স্বাচ্ছন্দ্যদায়ক বলে জানান ব্যবহারকারীরা। অনেকে শখ করে সংগ্রহেও রাখেন।
সরেজমিন দেখা যায়, উপজেলার ধনপোতা গ্রামে মেহগনি কাঠ ব্যবহার করে নান্দনিক ও টেকসই কলম তৈরি করছেন কয়েকজন কারিগর। শুরুতে বাঁশ দিয়ে কলম তৈরি করলেও বর্তমানে তারা কাঠের কলম তৈরি করছেন। দুই ভাই অসিত পাল, অরুণ পাল ও তাদের পরিবারের সদস্যদের হাতেই পরিচালিত হচ্ছে এ কুটির শিল্প।
বর্তমানে তাদের দুটি কারখানায় মাসে গড়ে প্রায় ৬ হাজার কলম উৎপাদন হয়। পরিবারের ৭ থেকে ৮ জন সদস্য এ কাজে যুক্ত। প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ১৮ ঘণ্টা পরিশ্রম করে তারা উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছেন। উৎপাদন প্রক্রিয়ায় একটি কলম তৈরি করতে প্রায় ৩৬টি ধাপ অতিক্রম করতে হয় বলে জানান কারিগররা। তবে এ উৎপাদনের পথ সহজ নয়। অরুণ পাল বলেন, প্রতি ১ হাজার কলমে প্রায় ২০০টি উৎপাদনজনিত ত্রুটির কারণে বাতিল হয়ে যায়। ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে এবং লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। তার মতে, কারিগরি উন্নত প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তা পেলে এ ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
মিথুন কুটির শিল্পে বিভিন্ন ধরনের কাঠের কলম তৈরি হয়। উৎপাদনের ধরন অনুযায়ী প্রতিটি কলম পাইকারি পর্যায়ে ১৬ থেকে শুরু করে ৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা হয়। তবে খুচরা বাজারে এসব কলম আরও বেশি দামে বিক্রি হয় বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। উৎপাদকদের অভিযোগ, তারা ন্যায্যমূল্য না পেলেও মধ্যস্বত্বভোগীরা এসব পণ্য ব্র্যান্ড ও শোরুমে পৌঁছে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করছে।
অশোক পাল বলেন, ‘বাজারে আমাদের কলমের ভালো চাহিদা রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেশি হওয়া সত্ত্বেও পাইকারদের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হয়। আমরা সরাসরি বাজারে পৌঁছাতে না পারায় মধ্যস্বত্বভোগীরাই বেশি লাভ করছে।’
তিনি আরও বলেন, বিদেশে কুটির শিল্প ও হাতের কাজকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়, দেশে সেই তুলনায় পৃষ্ঠপোষকতা কম। ব্যক্তি উদ্যোগে তাদের তৈরি কলম যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে পৌঁছেছে এবং সেখানে ভালো প্রতিক্রিয়াও পাওয়া গেছে। তবে বিদেশে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা আছে। বিশেষ করে শীতপ্রধান দেশে কিছু ধরনের শিষের কালি জমে যাওয়ার সমস্যা দেখা দেয়, যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত মানের কালি ও শিষ আমদানির জন্য বহু চেষ্টা করেও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা পাননি বলে জানান অশোক পাল। অরুন পাল বলেন, তাদের কাঠের কলম ভারতের কলকাতার বিভিন্ন বিপণন, যাদবপুর ও বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রচুর চাহিদা রয়েছে। আগে সেখানে প্রচুর কলম বিক্রি হতো। বর্তমানে বর্ডারে আটকে যাচ্ছে এসব কলম।
ফকিরহাট কাজি আজহার আলি কলেজের শিক্ষক আবু সাঈদ মল্লিক বলেন, ‘মিথুন কুটির শিল্প’র উৎপাদিত কলমগুলো প্লাস্টিকের বদলে কাঠ দিয়ে তৈরি যা পরিবেশবান্ধব। কলমগুলো সুন্দর এবং লিখেও স্বাচ্ছন্দ্য লাগে। তারা প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ফকিরহাটের ধনপোতার এ কাঠের কলম একদিন আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পরিচিতি আরও বাড়াতে সক্ষম হবে।’
ফকিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রোকনুজ জামান বলেন, ‘কাঠের কলম একটি ব্যতিক্রমধর্মী কুটির শিল্প। আমি তাদের সমস্যাগুলো সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করব। বিশেষ করে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলব।’
