জুলাই গণ-অভ্যুত্থান
হৃদয়ের লাশ আজও পায়নি পরিবার
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
‘হৃদয়কে যেদিন গুলি করে, সেদিন আমিও তার পাশেই ছিলাম। আমাকে লক্ষ্য করেও কয়েকটি গুলি করেছিল। আল্লাহই সেদিন আমাকে বাঁচিয়েছেন, অল্পের জন্য আমার গায়ে গুলি লাগেনি। আমার ভাইডাকে কীভাবে যে নিষ্ঠুরভাবে গুলি কইরা মারছে-হেইডা ভিডিও দেখলেই বুঝবেন। মারার পর আবার দুইডা হাত-পাও ধইরা হেঁচড়াইয়া নিয়া গেছে। এহন পর্যন্ত ভাইডার লাগ (সন্ধান) পাইলাম না। নিজের হাতে তার লাশ মাটি দিতে পারলেও শান্তি পাইতাম।’ কথাগুলো বলেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় গুলিতে নিহত শিক্ষার্থী মো. হৃদয়ের (২১) ফুপাতো ভাই ও মামলার বাদী মো. ইব্রাহীম। নিহত হৃদয় টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার আলমনগর গ্রামের লাল মিয়ার ছেলে। হেমনগর ডিগ্রি কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী হৃদয় পড়ালেখার পাশাপাশি কোনাবাড়ীতে অটোরিকশা চালাতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি নিখোঁজ হন। এখন পর্যন্ত তার লাশ খুঁজে পায়নি পরিবার। গত বছরের ২৬ আগস্ট কোনাবাড়ী থানায় ৫৭ জনের নাম উল্লেখ করে ইব্রাহীম হত্যা মামলা করেছেন। ইব্রাহীম বলেন, আপনারা আমাদের পাশে দাঁড়ান। আমাদের সহযোগিতা করেন। আমার ভাইয়ের লাশটা চাই। যারা তাকে হত্যা করেছে, তাদের বিচার চাই। তিনি জানান, হৃদয়ের মা-বাবা এখন ছেলের জন্য শুধু কান্নাকাটি করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, ঘটনার দিন কোনাবাড়ী এলাকায় বিভিন্ন দাবিতে হৃদয় স্লোগান দেন। এ সময় পুলিশ সদস্যদের দেখে তিনি রাস্তার পাশে অবস্থান নেন। কিন্তু তাকে ধরে পাশের গলিতে নিয়ে যান পুলিশের ছয় সদস্য। এরপর চারদিক দিয়ে তারা তাকে ঘিরে ফেলে। এর মধ্য থেকে এক পুলিশ সদস্য হৃদয়ের মুখে চড়থাপ্পড় মারেন। একপর্যায়ে পুলিশ কনস্টেবল আকরাম অতি উৎসাহী হয়ে তার পেটে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে। এতে তাৎক্ষণিক তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং আশপাশে রক্তে ছেয়ে যায়। সেখানে কিছু সময় লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, হৃদয়ের হত্যাকাণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল ট্রুথ জাস্টিস প্রজেক্ট’ ও ‘টেক গ্লোবাল ইনস্টিটিউট’ প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছে। এতে হৃদয়কে গুলি করার দৃশ্য উঠে এসেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ সরাসরি গুলি করে তাকে হত্যা করেছে। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ সদস্য আকরাম হোসেনসহ দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হত্যার পর হৃদয়ের লাশ তুরাগ নদে ফেলেছে বলে তারা স্বীকারোক্তি দেন। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ২৪ জুন গাজীপুরের কড্ডায় তুরাগ নদে হৃদয়ের লাশ খোঁজা হয়। তবে এখন পর্যন্ত হৃদয়ের লাশ পাওয়া যায়নি।
মামলার পর কোনাবাড়ী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কেএম আশরাফ উদ্দিন, গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল আকরাম হোসেন, ফাহিম হাসান ও মাহমুদুল হাসান সজীবকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের একাধিকবার ট্রাইব্যুনালেও হাজির করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পরিদর্শক মাসুদ পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রয়েছে।

