বাড়ছে অতি নির্ভরশীলতা
চীনা সহায়তায় উন্নয়নে গতি, শঙ্কাও কম নয়
চীন অর্থনৈতিক বন্ধু বটে, তবে ঋণের শৃঙ্খল পরিয়ে তারা এ অঞ্চলে মূলত ‘বিআরআই’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়-মন্তব্য বিশ্লেষকদের * রাজনৈতিক কারণে চীনের সমালোচনা করা হয়-ইমতিয়াজ আহমেদ, নিরাপত্তা বিশ্লেষক * কোনো কিছুতেই অতি নির্ভরতা ভালো নয়, কাঁচামাল উৎপাদনে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে-মহিউদ্দিন রুবেল, বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক
Advertisement
আরমান হেকিম
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চীনের অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তায় একের পর এক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে বাংলাদেশ, গতি এসেছে অবকাঠামো উন্নয়নে। তবে একই সময়ে বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা, বিস্তৃত হচ্ছে বাণিজ্য ঘাটতি, আর ঋণের শর্ত ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে উঠছে প্রশ্ন। ফলে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এখন শুধু উন্নয়নের গল্প নয়, বরং অর্থনীতির ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির সমান্তরাল বাস্তবতাও মনে করা হচ্ছে। এমনটি বলছেন বিশ্লেষকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বিশ্লেষক যুগান্তরকে বলেন, চীন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের পরীক্ষিত অর্থনৈতিক বন্ধু। কারণ, দেশটির ঋণ সহায়তা নিয়ে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। আবার কয়েকটি অদূরদর্শী মেগা প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে। তবে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সব সময় জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং একই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি গ্রহণ করাও সময়ের দাবি। তিনি মনে করেন, চীন গণতন্ত্র ও রাজনীতিকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। তারা মূলত ঋণের শৃঙ্খল পরিয়ে নিজেদের স্বার্থে এ অঞ্চলে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনেশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চায়। এজন্য বাংলাদেশকে কৌশলী হতে হবে। বিদ্যমান বাস্তবতায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি ঢাকাকে সামরিকভাবেও শক্তিশালী হতে হবে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইমতিয়াজ আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের মোট ঋণের ১০ শতাংশেরও কম চীনের ঋণ, যা জাপানের প্রায় সমান। অথচ চীনের ঋণ নিয়ে যতটা সমালোচনা করা হয়, জাপানের ক্ষেত্রে তা হয় না। এটি মূলত রাজনৈতিক কারণে বলা হয়। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা অনেক বেশি-এসব বিষয়ে কেউ কথা বলে না। এখন যারা চীনের সমালোচনা করছেন, খোঁজ নিলে দেখা যাবে তাদের অনেকেরই ওইসব দেশে বিশেষ স্বার্থ রয়েছে।
সূত্রমতে, বাংলাদেশের শিল্প ও উৎপাদন খাত এখন অনেকাংশেই চীনা আমদানির ওপর নির্ভরশীল। প্রতিবছর প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আসে দেশটি থেকে। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি এখনো এক বিলিয়ন ডলারের কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে আমদানি হয়েছে ১৮ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার, যা মোট আমদানির প্রায় ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ দেশের প্রতি চার ডলারের আমদানির এক ডলারই আসছে এককভাবে চীন থেকে। আগের অর্থবছরে ছিল ১৬ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম দুই প্রান্তিকেই আমদানি ৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা নির্ভরতার ধারাবাহিকতা আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
এই আমদানির বড় অংশই যন্ত্রপাতি, শিল্প সরঞ্জাম ও কাঁচামাল-এগুলো ছাড়া দেশের উৎপাদন কার্যত থেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে পোশাকশিল্প আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিযোগিতামূলক দাম, শক্তিশালী সরবরাহব্যবস্থা এবং কম লিড-টাইমের কারণে চীনের বিকল্প খুঁজে পাওয়া কার্যত অসম্ভব। তাদের মতে, অন্যান্য উৎসের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ কম দামে চীনা পণ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ এই নির্ভরতা শুধু পছন্দের নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক ও ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে চীননির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। তাদের বিকল্প প্রায় নেই বললেই চলে। এ ব্যবসায় তারা আধিপত্য বিস্তার করেছে। সব ধরনের কাঁচামাল তাদের ওখানে হয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করতে এই খাতে তারা নিজেদের শক্তিশালী করেছে। এখন তারা পোশাক রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোয় কাঁচামাল রপ্তানি করে থাকে।
তিনি বলেন, চীনের কাঁচামালে একদিকে দাম কম, নানা ভ্যারিয়েন্টে পাওয়া যায়। পাশাপাশি মানও অন্যদের তুলনায় অনেক ভালো। তবে কোনো কিছুতেই অতি নির্ভরতা ভালো নয়। এক্ষেত্রেও চীননির্ভরতা ভবিষ্যতে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। তবে চীনের বিকল্প অন্য দেশ হতে পারে না। বিকল্প হতে পারে বাংলাদেশই। এজন্য দেশে কাঁচামাল উৎপাদনের সব ধরনের সহযোগিতা দেওয়া দরকার।
প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রেও একই চিত্র। চীনা প্রযুক্তিবিদদের দিয়ে যন্ত্রপাতি মেরামতে দৈনিক ৬০ থেকে ১০০ ডলার খরচ হয়, যেখানে ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে তা ৬০০ থেকে ৮০০ ডলার হতে পারে। ফলে উৎপাদন ব্যয় কম রাখতে শিল্প খাত চীনা প্রযুক্তির দিকেই ঝুঁকে থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তিগত নির্ভরতাও তৈরি করছে।
তবে আমদানি যতটা বাড়ছে, রপ্তানি ততটা বাড়ছে না। চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো এক বিলিয়ন ডলারের নিচে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে রপ্তানি হয়েছে ৭৪২ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ডলার। আগের দুই অর্থবছরেও ৭০০ মিলিয়ন ডলারের আশপাশে ছিল। অর্থাৎ শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো চীনের বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।
এ বৈষম্যের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাণিজ্য ঘাটতিতে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সংসদে জানিয়েছেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্য ঘাটতি ২ হাজার ৪১৬ কোটি ৮০ লাখ ডলার। এর মধ্যে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি ১ হাজার ৭৮৬ কোটি ৮০ লাখ ডলারে, যা এককভাবে সর্বোচ্চ।
সহজভাবে বললে, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে বাংলাদেশ যত আয় করছে, তার বহুগুণ বেশি অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছে আমদানির মাধ্যমে।
বিনিয়োগ ও ঋণের ক্ষেত্রেও চীনের উপস্থিতি বাড়ছে। বর্তমানে প্রায় দুই হাজার চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যার মোট বিনিয়োগ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে ২৬ বছরে চীন বিভিন্ন প্রকল্পে ৭৩৯ কোটি ডলার ঋণ ছাড় করেছে এবং মোট প্রতিশ্রুত অর্থায়ন এক হাজার কোটি ডলারের বেশি। অর্থাৎ শুধু বাণিজ্য নয়, অবকাঠামো ও বিনিয়োগ-সব ক্ষেত্রেই চীনের সম্পৃক্ততা গভীর হচ্ছে।
চীনা ঋণে বাস্তবায়িত বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ ও কর্ণফুলী টানেল। পদ্মা রেল প্রকল্পে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা চীনা ঋণ রয়েছে। কর্ণফুলী টানেলে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকার প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা। এসব প্রকল্প উন্নয়নে গতি আনলেও প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক ফল না পেলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে, এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে রয়েছে।
ঋণের ধরনেও রয়েছে ভিন্নতা। বাংলাদেশে চীন সাধারণত দুই ধরনের ঋণ দিয়ে থাকে। একটি হলো গভর্নমেন্ট কনসেশনাল লোন (জিসিএল) এবং প্রেফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি)। জিসিএল ঋণ তুলনামূলক স্বল্পসুদে প্রায় ২ শতাংশে দেওয়া হয়, যেখানে ৫-৭ বছর গ্রেস পিরিয়ড এবং ২০ বছর পর্যন্ত পরিশোধকাল থাকে। অন্যদিকে পিবিসি ঋণে সুদ ২ থেকে ৩ শতাংশ হলেও এতে অতিরিক্ত ফি যুক্ত থাকে এবং চীনা ঠিকাদার ও সরঞ্জাম ব্যবহারের শর্ত থাকে। অর্থাৎ ঋণের অর্থের একটি অংশ আবার চীনা অর্থনীতিতেই ফিরে যায়।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) বিষয়টিও সামনে আসছে। এলডিসি উত্তরণের পর শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতে এটি কার্যকর হতে পারে। তবে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী উৎপাদন অর্থনীতির সঙ্গে প্রস্তুতি ছাড়া চুক্তি হলে দেশীয় শিল্প প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে কি না, সে প্রশ্নও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে চীনা ঋণ নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। শ্রীলংকা, পাকিস্তান, লাওস ও জাম্বিয়ার উদাহরণ প্রায়ই আলোচনায় আসে। এসব দেশ চীন থেকে ঋণ নিয়ে নানা ধরনের সমস্যায় পড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এসব ক্ষেত্রে ঋণের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও প্রকল্প ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাববিস্তার নিয়ে ভারত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে, আর যুক্তরাষ্ট্রও ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসাবে সক্রিয়। ফলে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক যত গভীর হচ্ছে, ততই কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন সামনে আসছে। যেখানে উন্নয়ন, নির্ভরতা ও কূটনীতি একই সমীকরণের অংশ হয়ে উঠছে।
