ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত ও মেরামতের জোর দাবি
বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা মোকাবিলায় প্রস্তুতি কম
Advertisement
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সামান্য ব্যবধানে পরপর দুদিন ঢাকায় মৃদু ও কাঁপুনি দিয়ে ভূমিকম্প জানান দিয়ে যায় সামনে এরকম আরও খারাপ কিছু হয়তো অপেক্ষা করছে। ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় মৃদু থেকে মধ্যম মাত্রার ভূমিকম্প প্রায়ই হচ্ছে। এতে করে সবার মাঝে শক্তিশালী ভূমিকম্পের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিক মাত্রা ও তীব্র ভূমিকম্প হওয়া অমূলক নয়। ৬-৭ মাত্রার একটি তীব্র ভূমিকম্প হলে রাজধানীর অসংখ্য ভবন ধসে পড়তে পারে। ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটবে তাতে। আর্থিকভাবে এই ক্ষতির পরিমাণ হবে কয়েক বিলিয়ন ডলার।
আর এই ক্ষয়ক্ষতির মূল কারণ হিসাবে তারা রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাত্রাতিরিক্ত দুর্বল ভবন তৈরি এবং সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন। প্রকৌশল বিদ্যায় একটি কথা আছে, ‘ভূমিকম্প মানুষ মারে না, দুর্বল ভবনই মানুষকে মারে।’
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৫টি ভূমিকম্প ঘটে। কম্প্রিহেনসিভ আর্থকোয়াক ক্যাটালগের (কমক্যাট) ক্যাটালগ ও অন্যান্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর গড়ে ৭ বা তার অধিক মাত্রার ১৫-১৬টি বড় ভূমিকম্প ঘটে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূমিকম্পের মাত্রা (ম্যাগনিটিউড) এবং তীব্রতা (ইনটেনসিটি) দুটো ভিন্ন হলেও সহযোগী বিষয়। মাত্রা ও তীব্রতা দুটোই যদি বেশি হয় তাহলে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হয়। যেমনটি হয়েছে ভেনিজুয়েলায়।
ভূতাত্ত্বিক বিশ্লষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে যে কোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। দেশে ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের একটি চক্র বা ‘রিটার্ন পিরিয়ড’ রয়েছে, যা সাধারণত ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর পরপর আসে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ১৭৬২ সালে আরাকানে ৮ বা এর কাছাকাছি মাত্রার এবং ১৮৯৭ সালে ডাউকি ফল্টে ৮.১ মাত্রার প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প হয়েছিল। সে হিসাবে ৮ মাত্রার ভূমিকম্প এখনই আঘাত হানবে এমনটিও নয়। আবার কখন সেটি ঘটবে তাও বলা মুশকিল।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ মেহেদী আহমেদ আনসারী যুগান্তরকে বলেন, দেশে ৭ বা ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প যে কোনো সময় আঘাত হানতে পারে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৮৬৯ সালে আসামের কাছাড়ে ৭.৫, ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল আর্থকোয়েক ৭.১ (যে ফল্টের ওপর ভিত্তি করে যমুনা সেতুর ডিজাইন করা হয়েছে), ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭.৬ এবং ১৯৩০ সালে ধুবড়িতে ৭.১ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৫০-২০০ বছরের চক্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে একটি ৭ মাত্রার ভূমিকম্প এখন যে কোনো সময় ঘটতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আশপাশে বেশ কয়েকটি সক্রিয় চ্যুতি বা ফল্ট লাইন রয়েছে। ময়মনসিংহ থেকে সিলেট হয়ে ইন্ডিয়া বর্ডার পর্যন্ত প্রায় ৭২ কিলোমিটার লম্বা ডাউকি ফল্ট অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া প্লেট বাউন্ডারি-১ (আরাকান ফল্ট), প্লেট বাউন্ডারি-২ (নোয়াখালী থেকে সিলেট) এবং প্লেট বাউন্ডারি-৩ (সিলেট থেকে কাছাড়) একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হয়ে আছে।
মেহেদী আহমেদ আনসারী আরও বলেন, এরকম একটি বিপর্যয় হলে তার জন্য আমাদের প্রস্তুতি আসলে কতটুকু তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। জাইকা এবং সিডিএমপির একটি জরিপে উঠে এসেছে, ঢাকায় ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। কিন্তু এই ৭২ হাজার ভবন কোনগুলো তা নির্দিষ্ট করা নেই।
তিনি জানান, ঢাকায় মোট বাসযোগ্য স্থাপনা রয়েছে প্রায় ২১ লাখ। এর মধ্যে ১৫ লাখই ছোট বিল্ডিং, টিনশেড বা বস্তি। যা ভেঙে পড়লে ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা কম। কিন্তু মূল বিপদের কারণ হলো অবশিষ্ট ৬ লাখ বহুতল পাকা ভবন, যেগুলো ৪ তলার ওপরে। এর মধ্যে আমাদের প্রাথমিক ধারণায় অন্তত ৪০ শতাংশ ভবন চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
যদি ঢাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে আমাদের প্রাক্কলন অনুযায়ী অন্তত ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানি হতে পারে। এর সঙ্গে আহতদের চিকিৎসা, পরিবারগুলোর পথে বসা এবং কয়েক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দেওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের অর্থনীতির নেই। তাই সরকারকে এ বিষয়ে এখন থেকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
গত বছরের ২১ নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। এটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প। তারপর থেকে প্রায়শই ভূমিকম্পে কেঁপে উঠছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়-২০২৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত তারা দেশে ৫২টি ভূমিকম্পের ঘটনা রেকর্ড করেছে। তার মধ্যে সর্বোচ্চ ৫.৭ এবং সর্বনিম্ন ২.৫ মাত্রার ভূমিকম্পের রেকর্ড আছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও গবেষণাকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও রুবাইয়াত কবির যুগান্তরকে বলেন, প্রথমত ভূমিকম্পের কোনো পূর্বাভাস নেই। কোন এলাকায় কখন কোন মাত্রায় ভূমিকম্প হবে তা বলার সুযোগ নেই। তবে ১০০-২০০ বছর আগের ভূমিকম্পের ডাটা দেখে ভূমিকম্প হতে পারে বলে ধারণা দেওয়া হয়। এখানে আরেকটি বিষয় দেখা হয়, তা হলো সে অঞ্চলটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে কিনা। বাংলাদেশের সীমান্তে বড় বড় ভূমিকম্পের ইতিহাস আছে। গত ১০০ বছরে না থাকলেও তার আগে আছে।
রুবাইয়াত কবির বলেন, গত ৩০০-৪০০ বছরে রাজধানী ঢাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হয়েছে এমন রেকর্ড নেই। বড় বড় যত ভূমিকম্প হয়েছে তার সবই ফল্টগুলোতে। তবে মিয়ানমারে বা অন্য ফল্টগুলোতেও যদি বড় ভূমিকম্প হয় তার প্রভাব ঢাকায়ও পড়বে। কারণ ঢাকার অনেকে ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। তাই বড় ভূমিকম্প অনেক দূরে হলেও আমাদের বিশাল ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা আছে।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দেশে ভূমিকম্পের প্রস্তুতি বলতে সরকার মূলত ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি বা উদ্ধারকারী যন্ত্রপাতি কেনাকেই প্রাধান্য দেয়। কিন্তু মূল প্রস্তুতি হওয়া উচিত ভবন নির্মাণে। একটি বহুতল আবাসিক ভবনকে (৫ কাঠা) রেট্রোফিটিং বা মজবুত করতে খরচ হয় আনুমানিক ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা। একটি ভবনে যদি ১০টি ফ্ল্যাট থাকে এবং মালিকরা প্রত্যেকে ৫-৬ লাখ টাকা করে বিনিয়োগ করেন, তবে ওই ভবনের ৫০ জন মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন-স্থপতি, প্রকৗশলী ও পরিকল্পনাবিদদের জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সদ্য স্নাতক পাশ করা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারদের ‘ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড’র ওপর ৩ মাসের নিবিড় প্রশিক্ষণ এবং পেশাজীবী ইঞ্জিনিয়ারদের ১-২ সপ্তাহের রিফ্রেশার কোর্স করাতে হবে।
কারণ প্রকৌশলীদের মধ্যেও ভূমিকম্প সহনশীল নকশা সম্পর্কে ব্যবহারিক জ্ঞানের অভাব রয়েছে। এ ছাড়া রাজউকের আওতাধীন ১৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে ৮টি জোনে ভাগ করে জোনভিত্তিক ভবনের অবস্থা যাচাইয়ের কাজ অবিলম্বে শুরু করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, নতুন ভবন নির্মাণ এবং বিদ্যমান ভবনের মূল্যায়নের জন্য ‘থার্ড পার্টি ভেরিফিকেশন’ বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যাচাই ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এই নিরপেক্ষ পরামর্শক সংস্থা ছাড়পত্র দিলেই কেবল রাজউক বা সিটি করপোরেশনগুলো ‘অকুপেন্সি সার্টিফিকেট’ (ব্যবহারের সনদ) প্রদান করবে। ভবন সঠিকভাবে তৈরি করা গেলে অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষের অমূল্য জীবন রক্ষা করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।

